মৃণালকান্তি দাস: বাংলাদেশ জামাতে ইসলামির আমিরের সাক্ষাৎকার নিয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যের সংবাদসংস্থা আল–জাজিরা। মুসলিম দুনিয়ার সেই সংবাদসংস্থার কাছে নিজের মুখ আর লুকিয়ে রাখেননি। মুখোশ খুলে ফেলে শফিকুর রহমান বলেছিলেন, কখনো একজন মহিলা তাঁর দলের প্রধান হতে পারবেন না। কেন? কারণ, নারী ও পুরুষ সমান নন। তাঁদের যাঁর যাঁর ভূমিকা আলাদা। নারীরা সন্তানের জন্ম দেন, পুরুষরা তা পারেন না। সৃষ্টিকর্তাই এই নিয়ম বেঁধে দিয়েছেন। এর অর্থ— পুরুষ হবেন দলের, দেশের নেতা। আর মহিলারা সবচেয়ে ভালো পারেন সন্তানের জন্ম ও তাদের লালন-পালন করতে। অতএব তাঁদের ঘরে আটকে রাখো। বাংলাদেশে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে জামাতসহ অন্তত ৩০টি দল যে ৩০০ আসনের ১টিতেও একজন মহিলা প্রার্থী দেয়নি, তা থেকেই স্পষ্ট— তাদের চোখে নারী-পুরুষের ফারাক কতটা গভীর!
এখানেই শেষ নয়! সম্প্রতি জামাতে ইসলামির আমিরের এক্স আইডি থেকে প্রকাশিত ‘নারীবিদ্বেষী’ পোস্ট ছড়িয়ে পড়েছে। সেই পোস্টে শফিকুর রহমান যা লিখেছেন ইংরেজিতে, সেটির বাংলা করলে বোঝা যায়, ‘মহিলারা যদি পেশাগত কাজে ঘরের বাইরে আসে, তাহলে সেটা বেশ্যাবৃত্তির মতো।’ অনেকেই আন্দাজ করেছিলেন, এই মন্তব্যের বিরোধিতা শুরু হলে একটু পর এই পোস্টটি তার অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে ছড়ানো হয়েছে বলে জামাতে ইসলামি থেকে জানানো হবে। হয়েছেও তাই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনরোষের শিকার হয়ে বলেছেন, এই পোস্ট তিনি করেননি। তাঁর অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে ‘অন্য’ কেউ ছড়িয়েছে। তবে এই কথাটা বলার জন্য নয় ঘণ্টার মতো সময় লেগেছে। এই সেই জামাতে ইসলামি, যারা এর আগেও একাধিকবার বলেছে, কোনো মহিলাকে সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তারা সমর্থন করে না। শফিকুর রহমান শুধু জামাতের আমির নন, তিনি এই প্রথম বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রধান ‘প্রতিদ্বন্দ্বী নেতা’ হয়ে উঠেছেন। তাঁর এখন দেশ-বিদেশে গুরুত্ব অনেক। তাঁর কাছে ছুটে যাচ্ছেন আমেরিকা, ব্রিটেনের কূটনীতিকরাও। হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন বন্ধুত্বের! প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, আমেরিকা, ব্রিটেনের কূটনীতিকরা জানেন, শফিকুর রহমানের রাজনৈতিক আদর্শ কী বার্তা দেয়?
জামাত এবং তার জোট সঙ্গীদের ‘নারীবিদ্বেষী কথাবার্তা’ তো নতুন কিছু নয়। বরং মহিলাদের নিয়ে এটিই তাদের রাজনৈতিক অবস্থান। কয়েকদিন এক নির্বাচনি জনসভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদকে ‘মাদকের আড্ডাখানা ও বেশ্যাখানা’ বলে মন্তব্য করেছেন বরগুনা জেলা জামাতে ইসলামির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল শামিম আহসান। চাপের মুখে জামাত তাঁকে পদ থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। কিন্তু এ কথা অস্বীকার করবে কী করে, জামাতে ইসলামির প্রয়াত নেতা দেলাওয়ার হোসেন সাঈদি একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেই ‘বেশ্যাবিদ্যালয়’ বলতেন। শুধু তাই-ই নয়, তথাকথিত জুলাই আন্দোলনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বেগম রোকেয়ার ছবিতে ওই নোংরা শব্দ লিখে দিয়েছিল জামাত-এনসিপির সমর্থকরাই। নারীদের বিরুদ্ধে এই শব্দের ব্যবহার জনপরিসরে বারবার উচ্চারিত হয়েছে ইসলামবাদী দল থেকেই। রোকেয়ার ভাস্কর্য ভাঙতে চেয়েছিল ওরাই। আসলে কট্টরপন্থী ইসলামিক নেতাদের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন বেগম রোকেয়া। ‘সুলতানার স্বপ্ন’ গ্রন্থে তিনি গল্পচ্ছলে দেখিয়েছেন, নারীদের যে নেতৃত্ব থেকে বাদ দেওয়া হয়, তার কারণ ধর্মীয় অনুশাসন বা নারীর জৈবিক প্রকৃতি নয়, স্রেফ নিজের সুবিধার জন্য পুরুষের বানানো নিয়মকানুন।
বাংলাদেশের ইতিহাসের একটা বড়ো সময় যেখানে ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকেছেন দু’টি দলের প্রধান দুই নারী, সেখানে নারী দলীয় প্রধান বা সরকারপ্রধান হতে পারবেন না, এ কথা শুধু হাস্যকরই নয়— মধ্যযুগীয়, সেকেলে, বর্বর ভাবনা। এই দুই নারী প্রধান শুধু দাপিয়ে দেশ শাসন করেছেন, তা–ই নয়, অনেক পুরুষ সহকর্মী তাঁদের সঙ্গে কথা বলার আগে ‘স্যার’ যোগ করে সম্ভাষণ করতেন। এসবই বদলে দিতে চায় জামাত নেতারা আর তার ‘লেজ’ এনসিপির ছাত্রনেতারা। তারা বাংলাদেশে ‘তালিবানি’ শাসন ব্যবস্থা জারি করতে চায়। যেখানে ফতোয়া জারি করে সংকুচিত হবে নারীদের অধিকারের সীমানা। যেখানে নারীদের প্রকাশ্যে কথা বলাও নিষেধ। জামাত শিবির চায়, মহিলাদের নিজেদের মুখ এবং কণ্ঠস্বর লুকিয়ে রাখতে। কোনোভাবেই অপরিচিত পুরুষদের দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারবেন না প্রাপ্তবয়স্ক মহিলারা।
৫৫ বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামাতে ইসলামি নারীবিদ্বেষী প্রচার চালিয়েছে। এখন তাদের কথায় স্পষ্ট, আগে নারীর আদল ঠিক করা জরুরি, তারপর নারীর রাজনীতি নিয়ে ভাবা যাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা জোবাইদা নাসরিনের কথায়, ‘‘একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান এমন নারীবিদ্বেষী মন্তব্যের পর পৃথিবীর ‘সভ্য’ কোনো দেশে রাজনীতি করার অধিকার পেতেন না, পাওয়া উচিত নয়। কিন্তু মহম্মদ ইউনুসের ‘সভ্যতা’য় পা দেওয়া দেশে নারীর বিরুদ্ধে অসভ্যতা চলছেই।’’ গত ১৮ মাসের ঘটনাপ্রবাহ থেকে এটা পরিষ্কার যে রাজনীতি এখন দারিদ্র্য, বেকারত্ব, জিনিসপত্রের দাম, জ্বালানিসংকট, শিক্ষা, চিকিৎসার ব্যয়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জননিরাপত্তা—বাস্তব জীবনের এসব সংকট থেকে অনেক বেশি ‘সাংস্কৃতিক যুদ্ধের’ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্রিকেট থেকে ইলিশ, নারীর পোশাক থেকে রবীন্দ্রসংগীত—সবকিছুই এই যুদ্ধের হাতিয়ার। ফ্যাসিস্টের দোসর, ভারতের দালাল, ধর্মবিদ্বেষী তকমা দিয়ে যে কারো বিরুদ্ধেই হিংসা উসকে দেওয়া চলছে। আর এর কারিগর জামাত ও এনসিপি।
সমস্যা ধর্মে নয়, ধর্মের নামে রাজনীতিতে। আজকের বাংলাদেশে ক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষ্যে ধর্মের ব্যবহার তীব্রতর হয়ে উঠছে। একাধিক দল রয়েছে, যাদের নামের সঙ্গে ধর্মের নাম জুড়ে রয়েছে, যাতে কারো কোনো সন্দেহ না থাকে তারা আসলে কে। ধর্মকে আশ্রয় করে যাঁরা রাজনীতি করেন, তাঁদের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা গেলে সবার আগে কঠোর অভিঘাত নেমে আসে সংখ্যালঘুদের উপর। তবে বাংলাদেশের নির্বাচনে সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয় হল, জামাত নেতারা এক অদ্ভূত মুখোশের আড়ালে নিজেদের মুখ ঢেকে রাখছে। জামাতে ইসলামির নেতারা বলা শুরু করেছে—‘আমরা কবে কোথায় বলেছি জিতলে আমরা বাংলাদেশে শরিয়াহ আইন আনব!’ যে দলটি এই কথা বলছে, তাদের গঠনতন্ত্র পড়লে যে কেউ অবাক হতে বাধ্য। এটি কোনো রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্র মনে হওয়ার কোনো কারণ নেই, মনে হবে সম্পূর্ণ ধর্মীয় সংগঠন। তাদের যাবতীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় আল্লার নামে। জামাত আমিরের কাজ শুধু আল্লার নির্দেশ পালন করা!
জামাত এমন একটি রাজনৈতিক দল, যার কেন্দ্রীয় সদস্য হওয়ার জন্য আপনাকে মুসলিম হতেই হবে। জামাত যখন প্রয়োজনমতো কোথাও কোথাও বার্তা দিতে চাইছে যে, ক্ষমতায় এলে তারা শরিয়াহ কায়েম করবে না, তখন জামাতের নেতারা টিভি টক শোতে প্রকাশ্যে শরিয়াহ কায়েম করার কথা বলছেন। শুধু তা–ই নয়, প্রচারের ক্ষেত্রে মধ্য থেকে নিম্নপর্যায়ের নেতা-কর্মীরা শরিয়াহ কায়েমের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেওয়াকে ইমানি দায়িত্ব হিসেবে বলছেন। আবার কেউ কেউ এই ভোট দেওয়াকে ‘বেহেশতের টিকিট’ হিসেবে তুলে ধরছেন। রাজনৈতিকভাবে জামাতে ইসলামি আসলেই এক বড়ো সংকটে পড়েছে। দলটির নামের সঙ্গে যেহেতু ‘ইসলাম’ শব্দটা আছে, এবং যেহেতু দীর্ঘদিন দলটি তার স্লোগানে ‘আল্লার আইন চাই’ বলে এসেছে, তাই তার আদি সমর্থকদের একটা অংশ জামাতকে ভোট দিতে চায় ইসলামি শরিয়াহ কায়েমের জন্য। আর এটাই প্রকাশ্যে চলে আসছে বারবার। ধর্মীয় পরিভাষায় একে বলে ‘মোনাফেকি’। দ্বিচারিতা।
লক্ষ্য করুন, আজকের বাংলাদেশে যখন নির্বাচনের প্রচার চলছে, তখন কিছু দল প্রকাশ্যেই বলছে, তাদের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া মানে আল্লার শাসনের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া। আগেও আমরা দেখেছি, রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা হারালেই প্রতিপক্ষকে ধর্মবিরোধী আখ্যা দেওয়া হয়েছে। ধর্মের নামেই সংগীতশিক্ষা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। মাজারে হামলা হচ্ছে। নাট্যচর্চা হুমকির মুখে পড়ছে। পাঠ্যপুস্তকে ইচ্ছেমতো পরিবর্তন আনা হচ্ছে। মত ও পথের অমিল হলেই ধর্মের আবরণ চাপিয়ে দমনমূলক আচরণকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। জামাত-এনসিপিকেই এই দায় নিতে হবে।
পরিস্থিতি ভিন্ন হয়ে যায়, যখন ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলি সেকুলার আদর্শ ধারণের মুখোশ পরে নির্বাচনি মাঠে নামে। দীর্ঘদিন ধরে যারা নিজেদের ধর্মীয় মূল্যবোধের রক্ষক, নৈতিকতার ধারক এবং ধর্মভিত্তিক সামাজিক শৃঙ্খলার প্রবক্তা হিসেবে তুলে ধরেছে, তারাই যখন হঠাৎ করে সেকুলারিজম, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র এবং সকল নাগরিকের সমান অধিকারের কথা বলতে শুরু করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে। এটা কি সত্যিকারের আদর্শগত বিবর্তন, নাকি নির্বাচনি বাস্তবতায় টিকে থাকার কৌশল? ভোটের ময়দানে জামাতের নেতাদের দেখলে তেমন প্রশ্নই উঠে আসে। একদিকে ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলি বৃহত্তর ভোটারগোষ্ঠীর কাছে গ্রহণযোগ্য হতে চায়। তারা জানে, একটি বহুত্ববাদী সমাজে কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে রাজনীতি করলে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। অন্যদিকে, তারা তাদের মূল সমর্থকদেরও হারাতে চায় না, যারা তাদের কাছ থেকে ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতিফলন প্রত্যাশা করে। মসনদ দখলের স্বপ্নে জামাতে নেতারা ভুলেই গিয়েছেন, কোনো কট্টর ধর্মীয় রাজনৈতিক দল যখন সেকুলার ভাষা ব্যবহার করে, তখন নাগরিকরা শুধু ভাষার পরিবর্তন দেখেন না, তাঁরা সেই দলের অতীত অবস্থান, বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বর্তমান দাবির তুলনা করেন।
বাংলাদেশের সমাজ বুঝতে চাইছে, কে আসলে কোন আদর্শ ধারণ করে এবং কার ভাষা কেবল সময়ের প্রয়োজনে বদলানো মুখোশ মাত্র! তবে এই মুহূর্তে শেখ হাসিনার একটি কথা অক্ষরে অক্ষরে মিলে গিয়েছে। জুলাই আন্দোলনের সময় তিনি বলেছিলেন, ছাত্রনেতাদের ইন্ধন দিচ্ছে জামাত নেতারা। আজ বিপ্লবের মুখোশ খুলে ফেলে নাহিদ, সারজিস, হাসনাতরা জামাতে ইসলামির ‘তৃতীয় ছাগলছানা’!