Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

পরিবেশ

পরিবেশ
  • ১৬ মার্চ, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

বহুনি মে ব্যতীতানি জন্মানি তব চার্জ্জুন।

Advertisement

তান্যহং বেদ সর্ব্বাণি ন ত্বং বেত্থ পরন্তপ।।
অর্থাৎ হে পরন্তপ অর্জুন, আমার এবং তোমার বহু জন্ম অতীত হয়েছে। আমি তৎসমুদায় জানি, কিন্তু তুমি তা জান না। 
এই স্থিরপ্রাণরূপ ঈশ্বরের সাধনা করতে হলে সংসার পরিত্যাগ করার প্রয়োজন নেই। সংসারকে ত্যাগ করাও যায় না। এই পৃথিবীতে কোটি কোটি মাতা-পিতা ও গৃহ আছে। কেউ আপন পছন্দমত বা নির্বাচিত মাতা-পিতার কোলে বা গৃহে জন্মগ্রহণ করে না। উহা ঈশ্বর নির্দিষ্ট বা নির্বাচিত জায়গা অথবা তার অতীত জন্মের কর্মফলের ঘনীভূত অবস্থা। যাই হোক উহা যখন ঈশ্বর নির্দিষ্ট জায়গা বা পরিবেশ তখন উহাই সাধন ক্ষেত্রের অনুকূল পরিবেশ। সেই ঈশ্বর প্রদত্ত পরিবেশকে ছেড়ে যদি মানুষ নিজের পছন্দমত পরিবেশে, স্বনির্বাচিত জায়গায় অর্থাৎ কোন মঠ, মিশন বা পর্বত গুহায় যায় তবে উহা সাধন ক্ষেত্রের প্রতিকূল পরিবেশই হবে, পরিণামে বিষবৎ হবে। কারণ ঈশ্বর অপেক্ষা মানুষের বুদ্ধি বেশী নয়। সংসার মানব জীবনের জন্মের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। মনোবলহীন ও পলাতক সৈনিকের দ্বারায় যেমন যুদ্ধ হয় না, তেমনি সংসাররূপ রণক্ষেত্র হতে পরাজিত, পলাতক ও ভীরু ব্যক্তি সাধন সমরে জয়ী হতে পারে না। যিনি বীর তিনি যুদ্ধ করতে করতে হয় শত্রুকে পরাজিত করেন, না হয় মৃত্যু বরণ করেন, কিন্তু কোন ক্রমেই স্থান ত্যাগ করেন না। তেমনি যিনি বীর সাধক তিনি কখনই সংসার ত্যাগ করেন না। তিনি জানেন যে বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে যদি তিনি ত্যাগ করে যান তবে তিনি প্রথমেই ধর্মচ্যুত হবেন। কারণ বৃদ্ধ পিতা-মাতা বা স্ত্রী-পুত্রের ভরণ পোষণ করা কর্তব্য। শাস্ত্র এই শিক্ষাই দেয় যে বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে পালন করবে এবং ‘সস্ত্রীকো ধর্মমাচরেৎ’ অর্থাৎ সস্ত্রীক হয়ে ধর্ম আচরণ করবে। পুরাকালে ঋষিরা তাই করেছেন। ব্যাসদেব, শুকদেব, অষ্টাবক্র, কশ্যপ, ভরদ্বাজ, শাণ্ডিল্য, গৌতম, বশিষ্ঠ, নারদ, জনক প্রভৃতি ঋষিগণ সকলেই স্ত্রী গ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তীকালেও দেখা যায় গুরু নানক, গুরু কবীর, রামপ্রসাদ সেন, মহাপ্রভু গৌরাঙ্গদেব, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ, যোগিরাজ শ্যামাচরণ লাহিড়ী প্রভৃতি ইহারাও দার পরিগ্রহ করেছিলেন। শ্রীরামচন্দ্র, যোগেশ্বর মহাদেব এবং ভগবান্‌ শ্রীকৃষ্ণ যাঁদের আমরা শ্রেষ্ঠ দেবতা বলে স্বীকার করি তাঁরা কেহই স্ত্রীবর্জিত বা সংসার ত্যাগী ছিলেন না। হিন্দু ধর্মের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ গীতা, তার দুই প্রধান নায়ক অর্থাৎ গুরুরূপী কৃষ্ণ এবং শিষ্যরূপী অর্জুন উভয়েরই স্ত্রী ছিল, কেউ সন্ন্যাসী ছিলেন না। বিষয় এবং স্ত্রী এই দুটি ধর্ম পথের বাধা নয়। স্ত্রী এবং পুরুষ উভয়েই ঈশ্বর সৃষ্ট। স্ত্রীলোক যদি পুরুষদের প্রতি ঈশ্বর সাধনার বাধাস্বরূপ হয় তাহলে পুরুষরাও স্ত্রীলোকদের প্রতি বাধাস্বরূপ বলতে হবে। উপরন্তু স্ত্রীজাতিকে বাধাস্বরূপ বললে মাতৃস্বরূপা সমস্ত স্ত্রীজাতির নিন্দা করা হয়। এমন কি নিজ মাতাকেও নিন্দা করা হয়। বিষয়ও ধর্মপথের বাধা নয়, কারণ বিষয় সর্বত্র আছে। বিষয়ের প্রতি আসক্তিই বাধা। যিনি অনাসক্ত এবং বীর সাধক তাঁর কাছে সংসার ক্ষেত্রই সাধন পথের উপযুক্ত স্থান। 
                                                                                                       অশোক কুমার চট্টোপাধ্যায়ের ‘প্রাণময়ং জগৎ’ থেকে

সম্পর্কিত সংবাদ