মানস সরকার: ভ্রু কুঁচকে গেল ঐশির। স্পষ্ট মনে আছে, শেরুকে রেখে এসেছিল নিজের ঘরের বিছানার উপর। সিঁড়ির মুখটায় আবার কে নিয়ে এল! রান্নাঘরে মা একমনে রান্না করছে। মায়ের সামনে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘শেরুকে কি তুমি সিঁড়ির কাছে রেখে এসেছিলে?’
মানস সরকার: ভ্রু কুঁচকে গেল ঐশির। স্পষ্ট মনে আছে, শেরুকে রেখে এসেছিল নিজের ঘরের বিছানার উপর। সিঁড়ির মুখটায় আবার কে নিয়ে এল! রান্নাঘরে মা একমনে রান্না করছে। মায়ের সামনে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘শেরুকে কি তুমি সিঁড়ির কাছে রেখে এসেছিলে?’
খুন্তি নাড়া থামিয়ে ওর দিকে ফিরে মা বলল, ‘সকাল থেকে কি আর কাজ নেই আমার, নাকি এসব করার বয়স আছে? ভোলাকাকু বাজার থেকে ফিরলে বরং একবার জিজ্ঞাসা করে নিও।’
ঐশি প্রতিবাদ করল, ‘কাকু আমার জিনিসে হাত দেয় না।’
‘তাহলে তুমিই কখন বেখেয়ালে নিজে রেখেছিলে। এখন মনে পড়ছে না।’
মায়ের কথায় চুপ করে যায় ঐশি। সে ক্লাস সেভেনে পড়ে। পড়াশোনায় ভালো। নিজের সেকশনের মনিটর। ক্লাস ও স্কুলের অনেক ছোটো-ছোটো দায়িত্ব সামলাতে হয়। ভুলভাল কাজ তো ও করে না।
কাল ছিল রবিবার। ধরিত্রী ওর ক্লাসের একই সেকশনের বন্ধু। জন্মদিনে নেমন্তন্ন করেছে বাড়িতে সামনের রবিবার। এই সপ্তাহটা পুরো স্কুল। তাই কাল সন্ধেবেলা বাবার কাছে বায়না জুড়েছিল ধরিত্রীর গিফটটা কিনতে যাওয়ার জন্য। পাণ্ডুয়া স্টেশন রোডে সিনেমা হলের কাছেই একটা গিফট আইটেম শপ করেছে নতুন। স্কুল থেকে ফেরত আসার পথে পুলকার থেকে নজরে পড়েছিল। বাবার বাইকে নিজেদের বাড়ি ক্ষীরকুণ্ডি থেকে মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই পৌঁছে গিয়েছিল। দোকানের ভেতরের জিনিস দেখে বেশ অবাক হয়ে গিয়েছিল ঐশি। লোভও লাগছিল। কত গিফট আইটেম। ধরিত্রীর জন্য মাঝারি সাইজের একটা ঘড়ি সমেত ফোটোস্ট্যান্ড নেওয়ার পর নজর পড়েছিল একটা পুতুলে। পুতুল মানে, একটা কুকুর। কুচকুচে কালো। আধহাত। একেবারে চকচক করছে। উজ্জ্বল চোখগুলো ঐশির দিকে তাকিয়ে।
আবদার করতে বাবাও রাজি। দুটো প্যাক নিয়ে বেরিয়ে এসেছিল দোকান থেকে।
বাড়ি এসে প্যাক খুলে নিজের পড়ার ঘরের টেবিলে বসিয়ে লক্ষ করেছিল। একেবারে যেন ছোটো সাইজের জ্যান্ত কুকুর। ফেরার পথে বাবা বলেছিল, ‘পুরো যেন ব্ল্যাক ল্যাব্রেডর।’
সন্ধেটা কাল ঠিকঠাক পড়া হল না ঐশির। পুতুলটার চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে কেমন ঘোর লেগে যাচ্ছিল। ‘কুকুর’ শব্দটা এই পুতুলটার সঙ্গে যাচ্ছিল না। একটু ভেবে ঐশি নামও দিয়ে ফেলেছিল, ‘শেরু।’
ফিসফিস করে বলেছিল ওর দিকে তাকিয়ে, ‘কী, পছন্দ?’
মাথায় একটা আঙুল ছোঁয়াতে কি শেরুর লেজ তখন নড়ে উঠেছিল? কে জানে!
দু’বেলা খাওয়ার পর একটা অভ্যাস আছে ঐশির। পাতে যে কাঁটা-হাড় পড়ে থাকে, সেগুলো আর একটু ভাত বা দুটো রুটি দিয়ে মেখে পাড়ার দুটো কুকুরকে বাড়ির দরজার সামনে খাওয়ায়। অভ্যেসটা বছরখানেকের। গেটের কাছে দাঁড়িয়ে একবার হাঁক পাড়লেই কুকুর দুটো যেখানেই থাক, হাজির হয়ে যায়। পথের কুকুরদের প্রতি ঐশির একটু টান আছে। বাবা-মা, এমনকি বাড়ির বিভিন্ন কাজের দায়িত্বে থাকা ভোলাকাকুও ব্যাপারটা বোঝে।
আজও পাড়ার কুকুর দুটোকে খাইয়ে বাথরুমে হাত ধুয়ে স্কুলের ব্যাগ আনার জন্য উপরে উঠতে গিয়ে পুতুলটা মানে শেরুকে দেখল সিঁড়ির বাঁকটার এক কোণে দাঁড়িয়ে।
সময় নেই এখন এতটা ভাবার। এখুনি স্কুলের পুলকার এসে যাবে। মায়ের সঙ্গে কথা না বাড়িয়ে উপরে নিজের ঘরে ঢুকে পুতুলটা বইয়ের সেলফে ইংলিশ ডিকশনারিটার উপর রেখে, ব্যাগ কাঁধে
নেমে এল।
স্কুলেও আজ ঠিক মন বসাতে পারল না ঐশি। ইচ্ছে ছিল, ধরিত্রীকে গিফটের কথাটা বলে জিজ্ঞাসা করে নেবে, ফোটোস্ট্যান্ড ওর পছন্দ কি না। কিন্তু করল না।
স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে বিকেলে সাধারণত ঐশির প্রাইভেট টিউটর আসেন। পাড়ারই একজন। আজ স্যার আসবেন না বলেছেন। নিজে পড়তে না বসে শুয়ে পড়েছিল, যাতে সন্ধেবেলাটা পুরো মন দিয়ে পড়া যায়।
নিজের পড়ার ঘরের সিঙ্গল খাটটাতেই ঘুমিয়ে পড়েছিল ঐশি। ঘুম ভাঙতে বুঝতে পারল অন্ধকার। মানে, সন্ধে হয়ে গিয়েছে। ঘরের পাখা চলছে না। লোডশেডিং। পাণ্ডুয়ায় কারেন্ট যখন-তখন যায়। ঘাম আর গরমে অস্থির হচ্ছিল। বাড়ির সামনে একটা কুকুরের ঘেউ-ঘেউ করে আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। উঠে বসে খাট থেকে নামার মুহূর্তে চোখ পড়েছিল বইয়ের তাকে। ডিকশনারির উপরে আবছা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শেরুর উপরে চোখ পড়তেই চমকে উঠল। চোখ দুটো সবুজ ছোটো টুনি বাল্বের মতো জ্বলছে। দু-তিন সেকেন্ডের বেশি ব্যাপারটা নিতে পারল না ঐশি। দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে মায়ের ঘরের সামনে দাঁড়াতেই কারেন্ট চলে এল। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল যেন। খাটে শুয়ে থাকা মায়ের পাশে ধপ করে বসে পড়ল ঐশি।
‘কী হল,’ শুয়ে থাকা অবস্থাতেই
মায়ের প্রশ্ন।
‘কিছু না। শেরুর চোখ দুটো অন্ধকারে জ্বলছিল।’
‘‘পুতুলটা কেনা পর্যন্ত ওটাকে নিয়ে বেশি ভাবছ। মুখে-চোখে জল দিয়ে পড়তে বস। পই-পই করে বলি, ‘কালভৈরব’-এর কমিকস পড়া বন্ধ কর।’’
নিজের ভুল। বুঝতে পারছে ঐশি।
সন্ধে থেকে রাত পর্যন্ত একমনে পড়াশোনা করেছে ঐশি। ভৌতবিজ্ঞান, ইংরেজি, অঙ্ক। স্কুলের টিচারদের দেওয়া হোমওয়ার্ক ছিল। ভৌতবিজ্ঞান আর ইংরেজি শেষ। মধ্যিখানে ভোলাকাকু এসে দিয়ে গিয়েছে গরম দুধ আর বিস্কুট। ধীরে-সুস্থে খেয়ে অঙ্ক করায় মন দিয়েছে। তাকিয়ে দেখেছে শেরুর দিকে। কিছু অস্বাভাবিক লাগেনি। বরং মুখে সুন্দর একটা শান্তভাব।
তিনটে অঙ্ক কিছুতেই মিলল না বইয়ের শেষে দেওয়া উত্তরের সঙ্গে। এদিকে রাতের খাওয়ার ডাক। খেয়ে এসে আবার বসতে হবে।
রাতে মা আজ চিকেন তৈরি করেছে। খাওয়ার পরে একটা মাংসের টুকরো, ঝোল বাঁচিয়ে সঙ্গে একটা রুটি মাখল। বাড়ির বাইরে দু’একবার কুকুরগুলোর নাম ডাকার পরও কেউ এল না। গেটের একপাশে রুটি-মাংস রেখে, বাথরুমে হাত ধুয়ে পড়ার ঘরে উঠে এল ঐশি। অঙ্কগুলো করতে হবে।
অনেকটা রাত হলেও খেয়াল ছিল না। একমনে অঙ্ক মেলানোর চেষ্টা করছিল ঐশি। প্রচণ্ড ঘেউ-ঘেউ চিৎকারে খেয়াল হল। কুকুর দুটো এতক্ষণে এসেছে। কিন্তু খেতে গিয়ে তো এরকম করে না। কী মনে করে, উপরের পড়ার ঘরের জানলা দিয়ে মুখ বাড়াল। রাস্তার আলো খুব জোরালো নয়। কিন্তু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। দেখেই পা দুটো কাঁপতে শুরু করেছিল ওর।
গেটের সামনে দুটো নয়, তিনটি কুকুর মারপিট করছে। আসলে একজনের সঙ্গে ঝামেলা চলছে দুটো চেনা কুকুরের। যে কুকুরটা নতুন, সে পুরো কালো, একটু বড়ো, চোখ দুটোয় যেন সবুজ আগুন। ঐশি নিজের বুক শেলফের দিকে তাকাল। শেরু নেই! আশপাশে তাকাল। কোথাও চোখে পড়ল না। মাথাটা ঝিমঝিম করছিল। পড়ে যাওয়ার আগে দেখল, বাবা ওকে ধরে নিল।
পরদিন সকালেই বাবার সঙ্গে প্যাকেটে মুড়ে পুতুল দোকানে ফেরত দিতে এল ঐশি। কালকের দৃশ্য এক ঝলক বাবাও দেখেছিল। কিন্তু আশ্চর্যের কথা, সকালবেলা পড়ার ঘরে ঢুকে দেখেছিল, পুতুল যথারীতি নিজের জায়গায়। বাবা, ওর দু’জনেরই মনে হচ্ছিল ভুল হচ্ছে। তবুও রিস্ক নিল না।
আজ দোকানে একজন বৃদ্ধ। বোধহয় আগের দিন যিনি ছিলেন, ওঁর বাবা। মৃদু হেসে বললেন, ‘আগেরজনও ফেরত নিয়ে এসেছিলেন।’
‘কীরকম,’ প্রশ্ন করল ঐশির বাবার।
‘বাড়িতে ভদ্রলোক একটা ব্ল্যাক লাব্রেডর পুষেছিলেন। তিন্নায় বাড়ি। রাস্তার দুটো কুকুরের সঙ্গে মারপিট করে তাদের কামড়ে জখম হয়ে ঘা বিষিয়ে মারা যায়। ভদ্রলোক আর কুকুর পোষেননি। বদলে এখানে আসা এই পুতুলটা বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন। শখ করে নিজের কুকুরের নামে ডাকতেন এই পুতুলকে।’
‘কী নাম দিয়েছিলেন পুতুলের?’ প্রশ্ন করেছিল ঐশি।
‘বাঘু। কিন্তু কেন ফেরত নিয়ে এসেছিলেন বলেননি। মনে পড়ছে, এই... এই পুতুলটাই।’
ফেরার পথে পাড়ায় কুকুর দুটোকে দেখতে পেয়েছিল ঐশি। গায়ে স্পষ্ট কামড়ানোর চিহ্ন!