আগামী শুক্রবার শিবরাম চক্রবর্তীর মৃত্যুদিন। কলকাতার মুক্তারামবাবু স্ট্রিটের মেসবাড়িতে কেটেছিল এই প্রথিতযশা সাহিত্যিকের জীবনের দীর্ঘ সময়। সেই মেসবাড়ি ঘিরে নানা মজার ঘটনা তুলে ধরলেন অরিন্দম ঘোষ।
আগামী শুক্রবার শিবরাম চক্রবর্তীর মৃত্যুদিন। কলকাতার মুক্তারামবাবু স্ট্রিটের মেসবাড়িতে কেটেছিল এই প্রথিতযশা সাহিত্যিকের জীবনের দীর্ঘ সময়। সেই মেসবাড়ি ঘিরে নানা মজার ঘটনা তুলে ধরলেন অরিন্দম ঘোষ।
শিবরাম চক্রবর্তী ছিলেন মালদহের চাঁচল রাজবংশের সন্তান। কিন্তু, ছোটো থেকেই তিনি ছিলেন একটু অন্যরকম। পৈতৃক বিষয়সম্পত্তির মায়া তাঁকে কোনোদিনই সেভাবে আবদ্ধ করতে পারেনি। সিদ্ধেশ্বরী ইনস্টিটিউশনে পড়ার সময়ই তিনি স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস অসহযোগ আন্দোলনের প্রচারে সভা করতে এলে তিনি তাঁর সঙ্গে কলকাতায় চলে আসেন। কলকাতায় আসার পর উত্তর কলকাতার ১৩৪ নম্বর মুক্তারামবাবু স্ট্রিটের মেসবাড়িতে ঠাঁই হয় তাঁর। এই ‘ক্ষেত্রকুঠি’- তেই তিনি বাকি জীবনটা কাটিয়েছিলেন। এই মেসবাড়িতেই জন্ম নিয়েছে তাঁর অসামান্য সমস্ত সাহিত্যসৃষ্টি। তিনি গর্ব করে বলতেন, ‘মুক্তারামের মেসে, তক্তারামে শুয়ে, শুক্তারাম খেয়ে আমি শিবরাম।’
‘ক্ষেত্রকুঠি’- র দোতলা একটা ঘর ছিল তাঁর বাসস্থান। এই মেসের বারান্দায় বসে রাস্তার লোক দেখতেন তিনি। রোজগার তেমন না থাকলেও বিলিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন উদারহস্ত। মেস থেকে যখন কোথাও বের হতেন, তখন কোনোদিনই তালা দিতেন না দরজায়। একদিন এক চোর ধূপকাঠি বিক্রেতা সেজে তাঁর ঘরে ঢুকে পড়ে সারা ঘর তন্ন তন্ন করে খুঁজে কোথাও কিছুই পেল না। সেই চোর হতাশ হয়ে ফিরে গেল। সন্ধ্যার সময় শিবরাম ফিরে এসে দেখলেন, ঘরের সবকিছু লণ্ডভণ্ড। তাঁর লেখার কাগজপত্র সব ছড়ানো-ছিটানো। হঠাৎ তিনি তক্তপোষের ওপর এক প্যাকেট ধূপ আর একটা চিরকুট খুলেই অবাক হলেন। চোর তাতে লিখে রেখে গিয়েছে যে, শিবরামের অবস্থা তার থেকেও খারাপ। তাই আর্থিকভাবে সাহায্য করার জন্য সে দশ টাকা রেখে যাচ্ছে। রেখে যাওয়া ধূপকাঠির প্যাকেট বিক্রি করে এবং দশ টাকা দিয়ে আরও কিছু ধূপকাঠির প্যাকেট কিনে বিক্রি করার পরামর্শ ওই চিরকুটে লিখে রেখে যায় সেই চুরি করতে আসা ব্যক্তি।
সারাদিনে তিনি একবার রাবড়ি খেতে বের হতেন এই মেসবাড়ি থেকে। এটাই ছিল তাঁর সবচেয়ে পছন্দের মিষ্টি। খুদে পাঠকরা ছিল শিবরামের একান্ত বন্ধু। তাঁর মন ছিল একেবারে শিশুর মতো সরল। ছোটোদের ভীষণ স্নেহ করতেন শিবরাম।
শোনা যায়, মাত্র দু’খানা জামাকাপড় দিয়ে নির্ঝঞ্ঝাটে কাটিয়ে দিয়েছেন তাঁর জীবন। ফতুয়া আর ধুতি এই ছিল তাঁর পরিধেয়। একটা পোশাক ধোপা বাড়িতে কাচতে দিতেন আর পরিধেয় বস্ত্র নোংরা হলে মেসবাড়ি থেকে বেরিয়ে সেখানে সেটা ছেড়ে কাচা জামাকাপড় পরে চলে আসতেন। মজা করে বলতেন, ‘দুটো সেট। কোনো ঝামেলা নেই। বাক্সপ্যাঁটরা নেই। বুঝলে একেই বলে আপনি আর কোপনি।’
মেসবাড়ির ঘরের কোনায় ছিল একটা আধভাঙা আলমারি, সেই আলমারিতে কিছুই ছিল না। তবু তাতে মস্ত একটা তালা লাগিয়ে রাখতেন তিনি। কেউ প্রশ্ন করলে উত্তর দিতেন যে, ‘এইভাবে রাখলে চোরও ঘাবড়ে যাবে। এটা হল চোরের ওপর বাটপাড়ি।’ ঘরের দেওয়ালে কখনো রং করতে দিতেন না তিনি। দেওয়াল জুড়ে নানারকম হিসাবপত্র আর ফোন নম্বর লেখা থাকত। খাতার পাতা হারিয়ে যেতে পারে, কিন্তু দেওয়াল তো কখনো হারাবে না! এই ছিল এই প্রখ্যাত সাহিত্যিকের অকাট্য যুক্তি। ঘরের ট্রাঙ্কে, তক্তপোষের নীচে ছিল ছারপোকার আঁতুড়ঘর। কখনো তিনি তাদের বিরক্ত করতেন না। ঘরের মধ্যে জমে থাকা ধুলো-বালিও পরিষ্কার করতেন না। তাঁর ধারণা ছিল যে, এতে অণুজীবরা সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।
বিছানার চাদর নোংরা হলে তার ওপর আর একটা চাদর বিছিয়ে দিতেন। বাইরে থেকে ঘুরে এসে ধুলো মাখা পা দুটো বিছানার চাদরে অক্লেশে মুছতে মুছতে বলতেন—
‘আমার ঘরে নেইকো পাপোষ
তাও করিনি আপস।’
মেসবাড়িতে লেখালেখির সঙ্গে এইভাবেই উদ্বেগহীন জীবন কাটাতেন তিনি। শেষদিকে শরীর খুব একটা ভালো যাচ্ছিল না। প্রায়ই তিনি বলতেন, ‘জিনিসপত্র সব বাঁধা হয়ে গেছে, এবার একটা ট্যাক্সি পেলেই চলে যাব।’ এই ঘটনার কিছুদিন পরই সামান্য জ্বরে কাবু হয়ে বাথরুমে পড়ে যান। সারারাত ওভাবেই পড়েছিলেন। সকালে জানাজানি হতে হাসপাতালে ভরতি করা হয়। ১৯৮০ সালের ২৮ আগস্টের সকাল। হাসপাতালের বেডে শুয়ে তিনি। চিকিৎসকরা ‘ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা’ গ্রন্থের স্রষ্টার কাছে জানতে চাইলেন, ‘এখন কেমন আছেন?’ জড়ানো কণ্ঠস্বরে লেখক উত্তর দিলেন, ‘ফার্স্টক্লাস।’ এর কিছুক্ষণ পরেই ট্যাক্সি চড়ে অচেনা জগতে পাড়ি জমালেন শিবরাম চক্রবর্তী। ‘ক্ষেত্রকুঠি’- তে না থাকলে শিশুসাহিত্যিক শিবরামের জগৎ যে অন্য ধারায় প্রবাহিত হত না, সে কথা কে বলতে পারে?