Bartaman Logo
২৩ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

বেঙ্গল কেমিক্যালস ১২৫

‘পরবর্তী স্টেশন বেঙ্গল কেমিক্যাল।’ শিয়ালদহ থেকে সেক্টর ফাইভের মেট্রোযাত্রায় এই ধারাভাষ্য চলতেই থাকে। ঠিক যেমন আজও আলমারি, শোকেসে দেখা মেলে মা-মাসি-মামীদের ভরসা বেঙ্গল কেমিক্যালসের ন্যাপথালিনের।

বেঙ্গল কেমিক্যালস ১২৫
  • ২৩ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সায়ন্তন মজুমদার: ‘পরবর্তী স্টেশন বেঙ্গল কেমিক্যাল।’ শিয়ালদহ থেকে সেক্টর ফাইভের মেট্রোযাত্রায় এই ধারাভাষ্য চলতেই থাকে। ঠিক যেমন আজও আলমারি, শোকেসে দেখা মেলে মা-মাসি-মামীদের ভরসা বেঙ্গল কেমিক্যালসের ন্যাপথালিনের। সংস্থাটির আরও একাধিক ওষুধ ও শিল্পজাত সামগ্রী—কত কী আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ! বিগত একশো পঁচিশ বছর যাবৎ মানুষের সেবায় অমলিন ভারতবর্ষের প্রথম ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি—‘বেঙ্গল কেমিক্যালস এণ্ড ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড’। প্রতিষ্ঠাতা স্বনামধন্য বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। 

Advertisement

বেঙ্গল কেমিক্যালস যেন অকৃতদার এই সাধক বিজ্ঞানীর মানসসন্তান। খাতায় কলমে প্রতিষ্ঠার বছর ১৯০১। কিন্তু ১৮৯২-৯৩ সালেই ৯১ নং আপার সার্কুলার রোডের ভাড়াবাড়িতে বেঙ্গল কেমিক্যালসের কারখানার জন্ম। রাস্তাটি বর্তমানে বিজ্ঞানীর নামে নামাঙ্কিত। তাঁর আত্মজীবনীর প্রথম খণ্ডের সপ্তম পরিচ্ছেদের নামও, ‘বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস—তাহার উৎপত্তি’। 
বিজ্ঞানী তখন প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক, কিন্তু বাণিজ্যবিমুখ নন। বরং বাঙালিদের ব্যবসার প্রতি উন্নাসিকতা দূরীকরণে উন্মুখ। ওষুধ ব্যবসায়ী ‘বটকৃষ্ণ পাল অ্যান্ড কোং’-এর ভূতনাথ পালের কাছ থেকে জানলেন ব্রিটিশ ফার্মাকোপিয়ার ওষুধ সম্পর্কে। সেগুলির দেশীয় বিকল্পের অনুসন্ধান চালালেন। এবং ভূতনাথবাবু তথ্য দিলেন, ভালো দেশীয় বস্তুর নিশ্চিত ক্রেতা রয়েছে। সামাজিক চাহিদা, আমদানি-রপ্তানি, বাজারদর, কাঁচামাল সমস্ত কিছু সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ ক্ষেত্রসমীক্ষাভিত্তিক গবেষণা করেছিলেন প্রফুল্লচন্দ্র।
জানলে আশ্চর্য হতে হয়, আজ যে পশুটি সবথেকে বেশি চর্চিত, বেঙ্গল কেমিক্যালসের পত্তনকালে সেই গোরুর হাড়ই ছিল দধীচির অস্থিস্বরূপ। প্রেসিডেন্সির ল্যাবরেটরিতে বসে ফসফেট অব সোডা ও সুপার ফসফেট অব লাইম বানানোর কথা ভাবেন আচার্যদেব। সঙ্গেসঙ্গে তাঁর মাথায় আসে, এর প্রাথমিক উপাদান ভারতে অতিসুলভ। তাও কেন বিদেশ থেকে সেটি আমদানি করতে হয়? ভাবামাত্র কাজ শুরু। রাজাবাজারের মুসলিম সম্প্রদায়ের থেকে ১০-১২ মন গোরুর হাড়গুঁড়ো সংগ্রহ করে বাড়ির ছাদে শুকোতে দিলেন। কিন্তু আচমকাই শীতকালে পনেরো দিনব্যাপী বৃষ্টিতে ঘটে যায় বিপত্তি। হাড়ে লাগা মাংস পচে দুর্গন্ধ ছড়ায়, পচা মাংসে পোকা ধরে যায়। মাংসলোভী কাকের দল ছোঁ মেরে হাড় তুলে এদিক ওদিক ফেলে-ছড়ায়। তিতিবিরক্ত প্রতিবেশীরা হাড় সরানোর অনুরোধের পাশাপাশি পুরসভায় খবর দেওয়ার আভাসও দেন। সেই বিপদ থেকে রক্ষা করেন বিজ্ঞানীর এক পরিচিতজন। তিনি যাবতীয় হাড়গোড় মানিকতলায় নিজের ইজারা নেওয়া জমিতে জমা রাখার আশ্বাস দেন। সেগুলি পাঠিয়ে দিয়ে এক রাতে তাতে আগুন ধরিয়ে দিলেন প্রফুল্লচন্দ্র। তাতে আর এক বিপদ হল। ‘ইহাঁ কেয়া লাশ জ্বলতা হ্যায়’—পুলিশ এসে দিল এক ধমক। শেষপর্যন্ত হাতেকলমে প্রমাণ দিয়ে তাঁর সন্দেহ দূর করা হল। সেই হাড়ের ছাইতে সালফিউরিক অ্যাসিড যোগ করে সুপার ফসফেট অব লাইম এবং তার সঙ্গে সোডার বিক্রিয়া করিয়ে ফসফেট অব সোডা উৎপাদন করলেন বিজ্ঞানী। দেশের মাটিতে দেশি উপাদানে দেশীয় পদ্ধতিতে, স্বদেশি বিজ্ঞানীর স্বপ্ন বাস্তবায়িত হল। আর সেই জমিই হল বেঙ্গল কেমিক্যালসের সূতিকাগার।
গোঁড়া সংস্কারাচ্ছন্নদের দল জিভ কাটতে পারেন। কিন্তু ল্যাবরেটরিতে ছাত্রদের সামনেই হাড়ভস্ম মুখে দেওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল প্রফুল্লচন্দ্রের। কারণ এটি স্নায়বিক শক্তিবর্ধক ওষুধের কাজ করত। ছাত্রজীবনের অধ্যয়ন, কর্মজীবনের অধ্যাপনার পুঁথিগত জ্ঞানকে বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগ ও তা থেকে ব্যবসায়িক সাফল্যপ্রাপ্তির পরাকাষ্ঠা তিনি। বুঝতে পেরেছিলেন, বিদেশ থেকে আমদানি করা কিছু রাসায়নিক জিনিসের এদেশেই উৎপাদন সম্ভব। বউবাজারের বিক্রেতাদের গুদাম পরীক্ষা করে পুরাতন শিশি-বোতল সংগ্রহ করতে শুরু করেন আচার্য স্বয়ং। ক্রমে ক্রমে ফেরি আয়োডিডি সিরাপ, লিকুয়র আরসেনিকালিস ইত্যাদি ওষুধ তৈরির আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে মনস্থ করেন, ওষুধ কারখানা খুলবেন। কারখানার নাম প্রসঙ্গে তাঁর অভিমতও প্রণিধানযোগ্য—‘নামটি একটু লম্বা, কিন্তু রাসায়নিক ও ভেষজ উভয় প্রকার পদার্থের পরিচয়ই নামের মধ্যে থাকা চাই, ইহাই আমার ইচ্ছা ছিল।’ সেজন্য ১৮৯৭ সালে রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ হওয়ার প্রস্তাবও নাকচ করে দেন প্রফুল্লচন্দ্র। এরপর তিনি বাজারে নামার বিষয়ে ভেবেছেন। একজনকে দালালির কাজে দক্ষও করে তোলেন। কাঁচামাল কেনা, ওষুধ বাজারে বিক্রি করার কাজ করতেন তিনি। পরে বাংলাদেশের রাড়ুলি গ্রাম থেকে একজনকে নিয়ে আসেন। তিনি ওষুধ বোতলে ভরে লেবেল সাঁটানো ও প্যাক করার কাজ করতেন। কিন্তু বিদেশি ওষুধের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় দেশি ওষুধের পেরে ওঠা নিয়ে লাভের শর্তপ্রত্যাশী বিক্রেতাদের মনে সংশয় ছিল। ফলে কঠোর সংগ্রাম করতে হয় প্রফুল্লচন্দ্রকে।
আচার্যদেব ওষুধ তৈরির সময় ফার্মাসিউটিক্যাল জার্নাল, কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট পত্রিকা থেকে সহায়তা পেতেন। সেই সময় বিদেশ থেকে একটি ওষুধ আসত, যেটির সবুজ রং অনেক দিন পরও বজায় থাকত। কিন্তু তাঁর বানানো সিরাপ হয়ে যেত হলুদ। একদিন সেই ফেরাস আইওডাইডে তিনি হাইপো ফসফরাস অ্যাসিড যোগ করলেন। দেখলেন, তাতে হালকা সবুজ রং আর চলে যাচ্ছে না। ক্রমে বঙ্গের ওষুধ বিপণীতেও বিজ্ঞানীর ওষুধ সাড়া জাগাতে শুরু করল। বেঙ্গল কেমিক্যালস প্রতিষ্ঠার আগেই তাঁর ওষুধ ডাঃ কানাইলাল দে’র সহযোগিতায় ইন্ডিয়ান মেডিকেল কংগ্রেসের অধিবেশনে সাহেবরা গ্রহণ করেছিলেন। তখন প্রফুল্লচন্দ্র আনন্দিত মনে কলেজের ল্যাবরেটরি থেকে ফিরে বিকাল চারটে থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত ফার্মেসির ল্যাবরেটরিতে পরিশ্রম করতেন।
শুধু প্রফুল্লচন্দ্র নন, তাঁর সহযোগীরাও  কম ছিলেন না। উনিশ শতকের সূচনালগ্নে বিজ্ঞানীর কর্মকাণ্ডে যোগ দিয়েছিলেন সহপাঠী চিকিৎসক অমূল্যচরণ বসু। তিনি স্বদেশানুরাগী ও বাঙালির বেকার সমস্যা নিয়ে ভাবিত ছিলেন। প্রফুল্লচন্দ্রের ল্যাবরেটরিতে একদিন এসে কিছু বস্তুর উৎপাদন দেখে পুলকিত হয়ে নাকি নাচতে শুরু করেন। অমূল্যবাবু কয়েকজন কবিরাজের পরামর্শে আয়ুর্বেদিক ওষুধ তৈরি করাতে লাগলেন। প্রচলিত টুলুর সিরাপের বদলে বেশি উপযোগী বাসকের সিরাপ তাঁর উদ্যোগেই বঙ্গসমাজ গ্রহণ করেছিল। স্বনামধন্য ডাঃ রাধাগোবিন্দ কর, ডাঃ নীলরতন সরকার, ডাঃ সুরেশপ্রসাদ সর্বাধিকারীও ছিলেন আচার্যের সহযোগী। 
ক্রমে ব্যবসা তথা কারখানা সম্প্রসারণের কথা আসে। কিন্তু তার জন্য মূলধন প্রয়োজন। বিজ্ঞানীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে তিন বছরের বেতন থেকে সঞ্চয়ের আটশো টাকা পড়েছিল। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেই তা খরচ হয়ে যায়। জনৈক যাদব মিত্র সোদপুরের অ্যাসিড কারখানা এক হাজার টাকায় তখন বিক্রি করবেন বলে জানান। আগামীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষকের পারিশ্রমিকরূপে প্রাপ্য ছ’শো টাকা দিয়ে বাকি চারশো টাকা কিস্তিতে শোধ করবেন ভেবে তাঁকে হ্যান্ডনোট লিখে দেন প্রফুল্লচন্দ্র। তারপরে তেরোশো টাকায় কারখানার দখল পান। ১৮৯৩ সালে এই কারখানা বিষয়ে চন্দ্রভূষণ এবং কুলভূষণ—এই ভাদুড়ী ভ্রাতৃদ্বয়ের সহযোগিতাও লাভ করেছিলেন তিনি। বেঙ্গল কেমিক্যালস প্রতিষ্ঠার পর ১৯০১ সালের ৫ মে বিকাল তিনটায় লগ্নিকারীদের সভা বসেছিল। আচার্য ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন চন্দ্রভূষণ ভাদুড়ী, ডাঃ কার্তিকচন্দ্র বসু, ভূতনাথ পাল, চারুচন্দ্র বসু, অমূল্যচরণ বসুর স্ত্রী নৃপেন্দ্রনন্দিনী দেবী। আহ্বান পেয়েও আসেননি অমূল্যকন্যা প্রমীলাসুন্দরী। প্রথম ম্যানেজিং ডিরেক্টর হন কার্তিকচন্দ্র, চিফ এজেন্ট ভূতনাথ, চন্দ্রভূষণ হন ইঞ্জিনিয়ারিং কেমিস্ট, ম্যানেজার হন চারুচন্দ্র, হিসাবরক্ষক জিতেন্দ্রনাথ বসু। সদর অফিস থেকে তিন মাইল দূরে শহরতলিতে কয়েক একর জমি কিনে কারখানা করা হয়। তা প্রতিষ্ঠার জন্য অর্থ দেন কবিরাজ উপেন্দ্রনাথ সেন। ১৯০১ সালে যে প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক বিক্রি ছিল ২৫ হাজার টাকার সামান্য বেশি। ১৯১৫ সালে তা পৌঁছে যায় সাড়ে পাঁচ লক্ষ টাকায়। বিশের দশকে পানিহাটিতে বহু একর জমি কিনে অ্যাসিড কারখানা গড়া হয়। এক বছরের মধ্যে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সের প্রথম ডিরেক্টর ডাঃ ট্রাভার্স কারখানা পরিদর্শন করে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে রিপোর্ট পাঠান। সেই রিপোর্টে প্রেসিডেন্সি কলেজের রসায়ন বিভাগের পরিচালনায় সালফিউরিক অ্যাসিড তৈরির সেই কর্মকাণ্ডকে তিনি সার্টিফিকেট দেন উন্নত গবেষণা, স্বদেশহিত ও গৌরবের বিষয় বলে।
পনেরো বছর আগে প্রফুল্লচন্দ্রের ভাড়াবাড়িতে তৈরি সেই প্রতিষ্ঠান ১৯০২ সালে দুই লক্ষ টাকা মূলধন নিয়ে লিমিটেড কোম্পানিতে পরিণত হয়। ১৯১৬ সালে প্রেসিডেন্সি থেকে আচার্যদেবের অবসর গ্রহণকালে প্রদত্ত মানপত্রে লেখা ছিল ‘ভারতীয় বিজ্ঞান ও শিল্প-প্রচেষ্টা বাহিরের সাহায্য নিরপেক্ষ হইয়াও কিরূপে সাফল্য লাভ করিতে পারে, বেঙ্গল কেমিক্যালস এণ্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস, তাহার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।’ পরের বছর ১৯১৭ সালে বেঙ্গল কেমিক্যালস সমবায় সমিতি গঠিত হয়। ১৯১৮ সালে রাড়ুলিতে এডুকেশন সোসাইটি স্থাপন করে দুঃস্থ ছাত্র ও বিধবাদের সাহায্যকল্পে নিজের ভাগ থেকে বেঙ্গল কেমিক্যালের দশ হাজার টাকার শেয়ার দান করেন প্রফুল্লচন্দ্র। বিজ্ঞানী জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ বলেছিলেন, ‘এই কারখানা হইতে প্রতিদান যাহা পাইয়াছেন তাহা হয় কারখানা শ্রমিকদের জন্য ব্যয়িত হইত, নয় অন্য এক তহবিলে জমা হইত, যাহা নিঃশেষে আর্তের সেবায় লাগিয়া যাইত।’
প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালে বেঙ্গল কেমিক্যালস থেকে সরকারকে প্রচুর নাইট্রিক অ্যাসিড সাহায্যার্থে দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানে নির্মিত অগ্নি নির্বাপক যন্ত্রের চাহিদা বাড়ে—ইরাকে মজুদ বারুদ ও বিস্ফোরকের গুদাম রক্ষার জন্য। থাইওসালফেট, চায়ের গুঁড়োর ক্যাফিন ইত্যাদিও সরবরাহ করা হয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গেও জড়িয়ে গিয়েছিল বেঙ্গল কেমিক্যালস। আচার্যের প্রিয় ছাত্র ছিলেন বঙ্গ তথা ভারতের আধুনিক চর্ম শিল্পের জনক বিরাজমোহন দাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে চামড়ার জন্য ব্যবহৃত সকল রাসায়নিক ব্রিটিশ কর্তৃক একচেটিয়া করা হলে বিরাজমোহন সেগুলি বানানোর ফর্মুলা বেঙ্গল কেমিক্যালসকে দেন। যুদ্ধকালীন ব্যস্ততায় তা প্রস্তুত করে প্রচুর মুনাফা করে বেঙ্গল কেমিক্যালস। তাতে পরোক্ষভাবে ইংরেজদের একচেটিয়া রাজও বন্ধ করা যায়। বিরাজকে চর্মবিদ্যা নিয়ে বিদেশে পাঠানোর অন্যতম হোতা ছিলেন প্রফুল্লচন্দ্র। বিদেশ যাওয়ার আগে ১৯০৮ সালে বেঙ্গল কেমিক্যালসেরই সালফিউরিক অ্যাসিড উৎপাদন বিভাগে চাকরি করতেন তিনি।
বেঙ্গল কেমিক্যালসের সঙ্গে যুক্ত আরও একজন মনীষী হলেন রাজশেখর বসু। তাঁর বেঙ্গল কেমিক্যালস পরিচালনার প্রশংসক ছিলেন স্বয়ং প্রফুল্লচন্দ্র। ১৯৩৭ সালে মানিকতলায় রাজশেখর ‘প্রফুল্ল ভবন’ গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, বেঙ্গল কেমিক্যালস পরিচালনায় ‘বিজ্ঞানের ব্যবহারিক আর ব্যাপারিক প্রয়োগে নিজের অদ্ভুত কৃতকারিতা দেখিয়েছেন প্রফুল্লচন্দ্রের দক্ষিণ হস্ত’ রাজশেখর। ১৯০৩ সালে বেঙ্গল কেমিক্যালসে কেমিস্ট পদে যোগদান করে এক বছরের মধ্যে ম্যানেজার হন তিনি। ১৯০৬ সালে কর্তৃত্ব পান। ১৯৩২ সালে অবসর গ্রহণ করেন। তার পরেও উপদেষ্টারূপে ছিলেন আজীবন। প্রতিষ্ঠানের কাজকর্মে বাংলা ভাষা ব্যবহার করা হত। পোকা মারার ওষুধের নাম তিনি রেখেছিলেন ‘মারকীট’। বিখ্যাত মানিকতলা বোমা মামলার বোমার ফর্মুলাই শুধুই নয়, মালমশলাও সংগ্রহ করে দিয়েছিলেন তিনি! বলা বাহুল্য বেঙ্গল কেমিক্যালস থেকেই তা সরবরাহ হয়েছিল।
বেঙ্গল কেমিক্যালসেই সাহিত্যচর্চার হাতেখড়ি রাজশেখর বসুর। লেখক মানুষ বলেই সেখান থেকে নিজের ফর্মুলায় এক ধরনের বেগুনি কালি তৈরি করেন। রাজশেখরের সূত্রে রবীন্দ্রনাথের লেখনীতেও উঠে এসেছিল বেঙ্গল কেমিক্যালসের নাম। রাজশেখরের প্রথম সাহিত্যসৃষ্টি ‘গড্ডলিকা’ গ্রন্থ রবীন্দ্রনাথকে পাঠিয়েছিলেন প্রফুল্লচন্দ্র। বিশ্বকবি তার প্রশংসা করলে ১৯২৫ সালে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় বিজ্ঞানীর মজার উত্তর ছিল, ‘এখন তাঁহার মাথা না বিগড়াইয়া যায়। তিনি আমারই হাতের তৈয়ারি একজন রাসায়নিক এবং আমার নির্দিষ্ট কোনো বিশেষ কার্যে অনেকদিন যাবৎ ব্যাপৃত।’ উত্তরে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন প্রফুল্লচন্দ্রকে, ‘আমি রস যাচায়ের নিকষে আঁচড় দিয়ে দেখলাম, আপনার বেঙ্গল কেমিক্যালের এই মানুষটি একেবারেই কেমিক্যাল গোলড নন, তিনি খাঁটি খনিজ সোনা।’
 এর প্রায় দশ বছর পরে বেঙ্গল কেমিক্যালসে একজনের চাকরির জন্য রাজশেখরকে অনুরোধ করেছিলেন স্বয়ং কবিগুরু। ১৯৩৫ সালে ২২ জুলাই রবির এক উমেদারী পত্র আসে শেখরসমীপে—‘শোনা গেল, বেঙ্গল কেমিক্যাল প্রচারপটু কর্মচারীর সন্ধান করছেন— পুলিনকে যদি এ কাজ দেওয়া হয়,তাহলে তোমরা ঠকবে না।’ সেই পুলিন হলেন রবিশিষ্য পুলিনবিহারী সেন।
১৯৪০ সালে বেঙ্গল কেমিক্যালসের পরিচালক মণ্ডলীর সঙ্গে মতবিরোধের ফলে সভাপতি পদ হতে ইস্তফা দেন প্রফুল্লচন্দ্র। প্রফুল্লচন্দ্রের প্রয়াণকালে বেঙ্গল কেমিক্যালসের কর্মীসংখ্যা ছিল ৩,৫০০-র অধিক, আর মূলধন ৫০ লক্ষ টাকা। বঙ্গদেশে চিরজীবী হোক বাঙালি বিজ্ঞানীর এই সংস্থা!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ