Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

একালের ধৃতরাষ্ট্র

রবিবার কেন্দ্রীয় বাজেট পেশ করেন অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন।

একালের ধৃতরাষ্ট্র
  • ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

রবিবার কেন্দ্রীয় বাজেট পেশ করেন অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। তার প্রেক্ষিতে রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব দাবি করেন, বাংলায় রেলের প্রকল্পে ‘রেকর্ড’ অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে! কংগ্রেস আমলের ২০০৯-১৪ সাল পর্বে বাংলায় রেল প্রকল্পে বছরে গড়ে ৪,৩৮০ কোটি টাকা করে দেওয়া হত। এবারের বাজেটে বাংলার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে তার প্রায় তিনগুণ—টাকার অঙ্কে ১৪,২০৫ কোটি। সব মিলিয়ে বাংলাপ্রীতিতে কংগ্রেস জমানার থেকে বিজেপি জমানা, থুড়ি, মোদিযুগ কতটা এগিয়ে তা বোঝাতে চেয়েছেন রেলমন্ত্রী মহোদয়। কিন্তু এই বৃদ্ধি বাস্তবে কতটা? গত দেড় দশকে মুদ্রামান কি এক জায়গায় থেমে আছে? সেসময় এক ট্রাক সিমেন্ট বা ইস্পাতের কী দাম ছিল? তখন একজন শ্রমিককে মজুরি দিতে হত কত টাকা? এইসকল পণ্য ও পরিষেবার খরচ কিন্তু তিনগুণের অনেক বেশিই বেড়েছে। যেকোনো মাপের একটি সরকারি প্রকল্প নির্মাণের জন্য এই শতকের গোড়ায় প্রোজেক্ট কস্ট যা ধরা হত, সেই টাকায় ওই প্রকল্পের এক ভগ্নাংশ নির্মাণ করাও এখন শক্ত। সেদিনের জনসংখ্যাচিত্র এবং বাংলাসহ দেশের প্রয়োজন বৃদ্ধির কথাটিও ভুলে গেলে চলবে না। মাথায় রাখতে হবে ইত্যবসরে পৃথিবীর অগ্রগতি এবং দেশের জিডিপি বৃদ্ধির পরিসংখ্যানও। সব মিলিয়ে রেলে বরাদ্দ অর্থাঙ্কে কিছুটা বাড়লেও বাস্তবে যে অনেকখানি কমেই গিয়েছে তা সাদা চোখেই ধরা পড়ে।

Advertisement

বাজেট নথিতে দেখা যাচ্ছে, বিজেপি-শাসিত উত্তরপ্রদেশে রেল প্রকল্পে এবার ২০,০১২ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। মন্ত্রীমহোদয় মনমোহন সিংয়ের যে ইউপিএ জমানার কথা বলেছেন, তার নিরিখে এই বরাদ্দ বৃদ্ধির হার প্রায় ১৮ গুণ। আরেক বিজেপি-শাসিত রাজ্য উত্তরাখণ্ডে রেলের বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধির হার ২৬ গুণের কাছাকাছি। এবার চোখ রাখা যাক আরো একাধিক ‘ডবল ইঞ্জিন’ রাজ্যের দিকে। রাজস্থানে রেল বিকাশে মোদি সরকার বাজেট বরাদ্দ বাড়িয়েছে ১৫ গুণ। রেলে মহারাষ্ট্রের জন্য বরাদ্দের পরিমাণ ২৩,৯২৬ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার ২০ গুণের মতো। আর মধ্যপ্রদেশে রেল বিকাশের জন্য প্রায় ২৪ গুণ বাজেট বরাদ্দ বাড়িয়েছে কেন্দ্র। অশ্বিনী বৈষ্ণবের মন্ত্রক জানিয়েছে, ২০০৯-২০১৪ সাল পর্যন্ত বছরে গড়ে মধ্যপ্রদেশকে দেওয়া হত ৬৩২ কোটি টাকা করে। ২০২৬-২৭ সালের জন্য তা বাড়িয়ে করা হয়েছে ১৫,১৮৮ কোটি টাকা। এমনকি বিহারেও রেলের বরাদ্দ বেড়েছে প্রায় ৯ গুণ। সবশেষে নজর করুন প্রধানমন্ত্রীর রাজ্য গুজরাতের ছবিতে। জাস্ট ভিরমি খাবেন—সেখানে রেল বিকাশের জন্য বাজেট বৃদ্ধির হার প্রায় ২৯ গুণ। বলার অপেক্ষা থাকে না যে, দেশের মধ্যে এটাই সর্বোচ্চ বৃদ্ধি। পশ্চিমবঙ্গ একটি বিপুল জনসংখ্যার রাজ্য। সেই বাংলার প্রতি মোদি সরকারের এই দৃষ্টিভঙ্গির পাশে রাখুন ডবল ইঞ্জিন রাজ্যগুলির ছবিটি এবং আমাদের প্রতি দিল্লির ‘বদান্যতা’ সম্পর্কে অশ্বিনী বৈষ্ণবের দাবি। আপনি ‘নয়া জুমলা’ আখ্যা দিতে বাধ্য হবেন না কি? কোনো নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে এজন্য দুয়ো দেওয়া যাবে না।

আসলে কৃতকর্মের দায় এই সরকার কখনোই নিতে রাজি নয়। বঞ্চনা, বৈষম্য ও স্বজনপোষণে রেকর্ড করেছেন নরেন্দ্র মোদি। তাই বারেবারে শাক দিয়ে মাছ ঢাকতেই হচ্ছে। কালোকে সাদা বলে চালাতে গিয়ে একটা বালকের কাছেও ধরা পড়ে যাচ্ছে গেরুয়া সংস্কৃতি। কেন্দ্রীয় প্রশাসন পরিচালনায় তিনি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছেন, তাতে ইতিহাস তাঁকে জন্মান্ধ ধৃতরাষ্ট্রেরই পাশে রাখবে, রাজা রামচন্দ্রের পাশে তাঁর ঠাঁই কোনোদিনই হবে না। অযোধ্যায় রামমন্দির উদ্বোধন এবং রামলালার মূর্তিতে প্রাণপ্রতিষ্ঠা তাঁর বৃথাই গিয়েছে। মোদির রাজধর্ম পালনের সংকীর্ণ প্রকৃতি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে কয়েক দশক পিছিয়ে দেবে, ঐক্যবদ্ধ করার বদলে বৃদ্ধি করবে কলহ বিবাদের পরিসর।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ