ভূস্বর্গে নারকীয় তাণ্ডব। পহেলগাঁওয়ে জঙ্গিদের এলোপাতাড়ি গুলিতে নিহত হয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের তিনজন বাসিন্দাসহ মোট ২৭ জন এবং জখম হয়েছেন ২০ জনেরও বেশি পর্যটক। মৃতের তালিকায় রয়েছেন নৌসেনার এক অফিসার, দু’জন বিদেশি নাগরিক এবং দু’জন স্থানীয় বাসিন্দাও। হামলার শিকার পরিবারগুলির অভিযোগ, পর্যটকদের ধর্মীয় পরিচয় জেনে নিয়ে চিহ্নিত ব্যক্তিদেরকেই হত্যা করা হয়েছে। ‘টার্গেট কিলিং’-এর শিকার মূলত পুরুষরা। পরিবারের মহিলা এবং শিশুদের সামনেই হত্যালীলা চলে। এই জঘন্য হামলার দায় স্বীকার করেছে পাকিস্তানি জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তোইবার স্থানীয় সংগঠন দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট (টিআরএফ)। ঘটনার পর চারজন সন্দেহভাজনের ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু তাদের ধরা যায়নি। দাবি করা হচ্ছে, জঙ্গিরা পাকিস্তানে পালিয়ে গিয়েছে। এমনিতেই হামলা ঠেকানো গেল না। রুখে দেওয়া গেল না তাদের পলায়নও। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠে গিয়েছে, তাহলে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা কী? স্বাধীনতার পর থেকে কাশ্মীর ঘিরে অশান্তির শেষ নেই। অতীতে আমাদের উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে পাকিস্তান। তাতে গোহারা হওয়ার পর থেকে ছায়াযুদ্ধই জারি রেখেছে তারা। এছাড়া কাশ্মীর দখলের জিগির তুলে ভারতের নানা জায়গায় অসংখ্যবার কাপুরুষোচিত হামলা করেছে পাক মদতপুষ্ট জঙ্গিরা। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় হামলাটি হয়েছিল ২০০৮ সালে মুম্বইয়ে (২৬/১১)। মুম্বই হামলার তদন্তে পরিষ্কার হয় যে, সেটির পরিকল্পনা পাকিস্তানের মাটিতে বসেই হয়েছিল। ওই হামলার মাস্টার মাইন্ডসহ সকল জঙ্গিই ছিল পাকিস্তানের লোক। প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের হাতে বেআইনি আগ্নেয়াস্ত্র তুলে দিয়েছিল পাকিস্তানের সেনা বিভাগ। এছাড়া সার্বিক পরিকল্পনা করে দিয়েছিল পাকিস্তানের কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই।
তার আগে পরেও বহু নষ্টামি পাকিস্তান করেছে। রাষ্ট্রসঙ্ঘ, রাশিয়া এবং মার্কিন প্রশাসনসহ সমস্ত আন্তর্জাতিক মহল পাকিস্তানের দুর্বৃত্তি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। তবু পাকিস্তানকে আজও থামানো যায়নি। কাশ্মীর অশান্তির যাবতীয় দায় বিজেপি বরাবর কংগ্রেসের ঘাড়ে চাপিয়ে থাকে। নেহরু থেকে ইন্দিরা, রাজীব, মনমোহন কাউকেই ছেড়ে কথা বলে না তারা। গেরুয়া শিবিরের বক্তব্য, কংগ্রেসের ‘দুর্বল’ নেতৃত্বই কাশ্মীর সমস্যার নেপথ্যে। এজন্য কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদাকে তারা বারবার কাঠগড়ায় তুলেছে। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপির এজেন্ডা তামাম ভারতে ‘এক দেশ এক আইন’ বলবৎ করা। সেটি রূপায়ণের অঙ্গ হিসেবে ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট মোদি সরকার সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করে। অর্থাৎ কেড়ে নেওয়া হয় জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা। এমনকী, রাজ্যের মর্যাদা বিলোপ করে জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ নামে দুটি পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল গঠন করা হয়। অনুচ্ছেদ ৩৭০ বাতিলের পর থেকেই দাবি করা হচ্ছে, জঙ্গি কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণে। কাশ্মীরে জঙ্গি কার্যকলাপ এবং দেশের নানা অঞ্চলে নকশাল বাহিনীর তাণ্ডব নির্মূল হওয়া কেবল সময়ের অপেক্ষা। সরকারের এমন লম্বা-চওড়া দাবিতে ভরসা করেই অসংখ্য পর্যটক কাশ্মীরমুখী হয়েছিলেন। বস্তুত এখন পর্যটনের ভরা মরশুম। তাই দেশের নানা প্রান্তের ভ্রমণবিলাসীরা তো বটেই, বিদেশ থেকেও বহু মানুষ কাশ্মীরে ভিড় জমিয়েছেন। আরও অনেক মানুষের সেখানে বেড়াতে যাওয়ার প্ল্যান ছিল। কিন্তু যাঁরা পৌঁছে গিয়েছেন সেখানে, তাঁরা মঙ্গলবার বীভৎস এক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলেন।
টার্গেট করে পর্যটকদের উপর এমন হামলা সাম্প্রতিক অতীতে সেখানে হয়নি। এই ঘটনায় হতচকিত স্থানীয় মানুষজনও। তাঁরাও স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদে সরব হয়েছেন। হামলা যখন হয়েছে তখন প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফরে এবং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভান্স এসেছেন ভারতে। জঙ্গি হামলার খবর পাওয়ামাত্রই প্রধানমন্ত্রী তাঁর বিদেশ সফরে ইতি টেনে দ্রুত দেশে ফিরে এসেছেন। তাঁর নির্দেশে মঙ্গলবারই ঘটনাস্থলে পৌঁছন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় শ্রীনগরে পৌঁছেই শাহ বলেন, ‘হামলায় জড়িতদের কাউকেই রেয়াত করা হবে না।’ বুধবার প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরেই দিল্লিতে গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। বেশকিছু জরুরি এবং গোপন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। শোক এবং সমবেদনা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু, ভান্স, বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ বিশিষ্ট নেতৃবৃন্দ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু-সহ বহু আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব পহেলগাঁও হামলার কড়া নিন্দা করেছেন। এই সঙ্কটে তাঁরা সকলেই ভারতের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন। শত্রু যখন চিহ্নিত, তখন দেশবাসী তাকে ক্ষমা করার জায়গায় আর নেই। দোষারোপের তরজা আপাতত তোলা থাক। এই মুহূর্তে মোক্ষম জবাবই চায় সকলে। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করার আগে সর্বদল বৈঠক হওয়াও জরুরি।