তিনি কতটা ‘বীর’ ছিলেন, তা জানে একমাত্র বিজেপি-আরএসএস। কিন্তু ভারতের দীর্ঘ স্বাধীনতার আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা যে বরাবরই ‘বিতর্কিত’ ছিল— তা নিয়ে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই। হিন্দুত্ববাদীদের প্রাণভোমরা ‘বিতর্কিত’ সেই নেতা বিনায়ক দামোদর সাভারকর এবার স্বাধীনতা দিবসের সরকারি পোস্টারেও জায়গা করে নিলেন! পোস্টারটি প্রকাশ করেছে কেন্দ্রের পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রক। ১৫ আগস্ট সকালে প্রকাশিত সেই পোস্টারে দেখা গেল, লালকেল্লার পটভূমিতে জাতীয় পতাকা। সামনে মহাত্মা গান্ধী, ভগৎ সিং ও নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ছবি। তাঁদের সবার উপরে বিরাজমান সাভারকরের ছবি। নীচে লেখা, ‘স্বাধীনতা ছিল এঁদের দেওয়া উপহার। ভবিষ্যৎ গড়াই আমাদের লক্ষ্য।’ সরকারি পোস্টারে এই ‘বিতর্কিত’ নেতার মুখের ছবিকে নিয়ে রাজনৈতিক মহল ও সমাজমাধ্যম ফের তোলপাড়। কী করে একটি সরকারি বিজ্ঞাপন-পোস্টারে জাতির জনক ও তাঁর হত্যাকাণ্ডের ঘটনার প্রেক্ষিতে ‘সন্দেহজনক অভিযুক্ত’ ব্যক্তির ছবি একসঙ্গে থাকতে পারে—সেই প্রশ্ন উঠেছে। কংগ্রেসের মুখপাত্রের মতে, ‘যেন গান্ধীকে হত্যা করাটা যথেষ্ট ছিল না, এখন ওঁরা (সরকার) গান্ধীর হত্যাকারীকে মহিমান্বিত করতে চান। ... নিহত ও হত্যাকারীকে এক করা, এটাই এখন স্বাধীনতা দিবসের চেতনা।’ কংগ্রেসের এই অভিযোগের সত্যাসত্য বিচারে না গেলেও একটা প্রশ্ন বা বিতর্ক কিন্তু বছরের পর বছর থেকে যাচ্ছে। এবং তা স্বাধীনতা সংগ্রামে সাভারকরের অবদান ও ভূমিকা নিয়ে। নিন্দুকেরা বলে, এই ‘বীর’ উপাধিটাও তাঁর নিজেরই দেওয়া। দ্বিজাতিতত্ত্ব ও দেশভাগের পক্ষে ছিলেন তিনি। বিজেপি অবশ্য নিন্দুকদের এসব কথায় আমল দিতে নারাজ। আর তাই দেশভাগের দায় সম্পূর্ণভাবে কংগ্রেসের ঘাড়ে চাপিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে সাভারকরের ‘মহান’ ভূমিকাকে তুলে ধরতে নতুন ইতিহাস গড়ার চেষ্টা করছে।
কারণ, জন্মলগ্ন থেকেই বিজেপি’র মতাদর্শের মূল ভিত্তি হল হিন্দুত্ব। এই ‘হিন্দুত্ব’ শব্দের প্রতিষ্ঠাতা সাভারকর। এদেশে বিজেপি’র শাসনকালে তাই প্রায় সর্বত্র সাভারকরের অদৃশ্য উপস্থিতি। হিন্দুত্বের জনক ও পুরোধা হিসাবে গেরুয়া শিবিরের চোখে তিনি ‘বীর’, আরাধ্য ও অনুসরণীয় এক ব্যক্তিত্ব। তাঁর দেখানো হিন্দুত্বের পথেই হিন্দুরাষ্ট্র গঠনের পথে হাঁটছে বিজেপি। সাভারকরের ‘বীরগাথা’ জায়গা করে নিয়েছে পাঠ্যসূচিতেও। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভাষণেও বারবার নেতাজি বা অন্যান্য স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সঙ্গে একনিঃশ্বাসে উচ্চারিত হয়েছে সাভারকরের নাম। বস্তুত বিরোধী-সহ দেশের একটা বড় অংশের মানুষের চোখে সাভারকরের স্বাধীনতা সংগ্রামে অবদান নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও হিন্দুত্ববাদীদের চোখে তিনি যেন স্বাধীনতা আন্দোলনের বিমূর্ত প্রতীক। তাই ‘বিতর্কিত’ হলেও সাভারকরকে নিয়ে মোদিবাহিনীর প্রচার বেপরোয়া। শুধু তুলনা নয়, বিজ্ঞাপনে একাসনে বসানো নয়, বছর দুয়েক আগে ২০২৩ সালের ২৮ মে নতুন সংসদ ভবনের উদ্বোধনও হয়েছে সাভারকরের ১৪০তম জন্মবার্ষিকীর দিন। গান্ধী-নেহরু-প্যাটেল-নেতাজি-আম্বেদকরকে বাদ দিয়ে কেন সাভারকরের জন্মদিনে সংসদ ভবনের উদ্বোধন হবে— সেদিনও এই প্রশ্ন ওঠে।
যাঁকে নিয়ে বিজেপি’র এত উন্মাদনা, বীরের সম্বোধন, ইতিহাস কিন্তু তাঁকে ব্রিটিশদের কাছে ‘আত্মসমর্পণকারী’ হিসাবে মনে করে। ঘটনা হল, আন্দামানের সেলুলার জেলে বন্দি থাকাকালীন বেশ কয়েকবার ব্রিটিশ সরকারের কাছে মুক্তি পেতে ক্ষমা চেয়ে চিঠি লিখেছিলেন এই ‘বীর’! তাঁকে মুক্তি দিলে সরকারকে ‘সাহায্য’ করার কথাও নাকি জানান সাভারকর। সে সময় কিছু শর্তের বিনিময়ে মুক্তিও পান তিনি। কিন্তু তাঁকে ঘিরে সবচেয়ে বিতর্কিত ঘটনাটি বোধহয় গান্ধী হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে। ১৯৪৮-এর ৩০ জানুয়ারি সাভারকর ঘনিষ্ঠ (মনে করা হয়) নাথুরাম গডসে গুলি করে হত্যা করে বাপুজিকে। এই ঘটনার পিছনে ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন হিন্দুত্ববাদী নেতা। মূল চক্রী হিসাবে তাঁকে সন্দেহ করা হয়। কিন্তু আদালতে উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে মুক্তি পেয়ে যান তিনি। ইতিহাস বলছে, প্রথম জীবনে তিনি ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী একজন বিপ্লবী। একটা সময় তাঁর মুখে শোনা যেত হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের কথা। কিন্তু আন্দামান জেল থেকে ‘মুচলেকা’ দিয়ে মুক্তি এবং ১৯২৩ সালে হিন্দুত্ব পুস্তিকার প্রকাশ যেন তাঁর জীবনের গতিধারা বদলে দেয়। জীবনের এই দ্বিতীয় অধ্যায়ে তাঁকে আর ‘জাতীয়তাবাদী’ বলা যাবে কি না সেই প্রশ্ন ওঠে। অনেকের মতে, তাঁর মধ্যে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ভূমিকাও অনুপস্থিত। তাঁর ধ্যান-জ্ঞান-স্বপ্ন তখন ‘হিন্দুদের’ ভারত। তাই তিনি দ্বিজাতি তত্ত্বেরও সমর্থক। ’৪২-এর ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনেও তিনি তাঁর হিন্দু দর্শনে অটল। তাই এই সাভারকরই এখন বর্তমান শাসকের আরাধ্য। তারই প্রতিফলন ঘটেছে সরকারি বিজ্ঞাপনে। যেখানে সর্বজনশ্রদ্ধেয় স্বাধীনতা সংগ্রামী, দেশপ্রেমিক মহাত্মা গান্ধী, ভগৎ সিং, নেতাজির ছবির পাশে স্থান পেয়েছে তাঁর ছবি! উদ্দেশ্য পরিষ্কার। সেই ‘হিন্দুত্বের’ প্রচার।