Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

যুগলবন্দির সেনাপতিরা প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি

জওহরলাল নেহরু প্রধানমন্ত্রী থাকলেও সর্বসাধারণের মধ্যে একটি বদ্ধমূল ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল যে, আসলে তো সরকারের স্তম্ভ হলেন লৌহমানব সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল।

যুগলবন্দির সেনাপতিরা প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি
  • ২৩ মে, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: জওহরলাল নেহরু প্রধানমন্ত্রী থাকলেও সর্বসাধারণের মধ্যে একটি বদ্ধমূল ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল যে, আসলে তো সরকারের স্তম্ভ হলেন লৌহমানব সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল। সরকারের নানাবিধ জটিল সমস্যা, সেটা দেশভাগের পর দাঙ্গাই হোক অথবা দেশীয় রাজ্যদের ভারতে অন্তর্ভুক্ত করা, সেই দায়িত্বগুলি পালন করতেন প্যাটেলই। নেহরু ছিলেন কংগ্রেস এবং সরকারের মুখ। কিন্তু চালিকাশক্তি তথা ইঞ্জিন ছিলেন প্যাটেল। ১৯৪৬ সালে যখন অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়, তখন প্যাটেলই সেই সরকারের প্রধান হবেন এরকমই একটি প্রত্যাশা ছিল কংগ্রেস নেতৃত্বের।  প্যাটেলও যে অরাজি ছিলেন এমন নয়। কিন্তু মহাত্মা গান্ধী মোক্ষম সময়ে স্পষ্ট করে দিলেন যে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান অর্থাৎ স্বাধীনতার পর দেশের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুই হবেন। প্যাটেল এবং নেহরু উভয়েই ছিলেন মহাত্মা গান্ধীর দুই হাতের মতো। তবু তিনি জানতেন জনসাধারণের মধ্যে, বিশেষত যুবসমাজের কাছে নেহরু বেশি জনপ্রিয়। নেহরু সরকারের প্রধান সেনাপতি বারংবার হয়েছেন বল্লভভাই প্যাটেল। কিন্তু তিনি কখনও প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন না। ১৯৫০ সালে অসুস্থ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। যাতে দেশের শুধু নয়, জওহরলাল নেহরুর পক্ষেও প্রভূত ক্ষতি হয়েছে। নতুন ভারতের পথ চলা শুরু হয়েছে একটি রাজনৈতিক যুগলবন্দির মাধ্যমে। পরবর্তীকালে দেখা গিয়েছে বারংবার ভারত সরকারের প্রশাসন পরিচালনায় উঠে এসেছে একটি করে রাজনৈতিক জুটি তথা যুগলবন্দি। অর্থাৎ একজন প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর ঠিক পাশেই এক সেনাপতি তথা সেকেন্ড ইন কমান্ড। 

Advertisement

এই প্রথার দ্বিতীয় প্রতিফলন দেখা যায় বিগত শতকের সাতের দশকে। আচমকা ইন্দিরা গান্ধীর পাশে উজ্জ্বলতম সহনক্ষত্র হিসেবে উপস্থিত হন তাঁরই পুত্র সঞ্জয় গান্ধী। ১৯৭৩  সালে যখন ধীরে ধীরে ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে দেশের কিছু প্রান্তে একটি বিরুদ্ধতার সূত্রপাত হচ্ছিল, গুজরাতের নবনির্মাণ সেনার মাধ্যমে ক্রমেই একটি আগুন ছড়িয়ে পড়ার আভাস দেখা যাচ্ছিল, তার ঠিক প্রাক্কালে সঞ্জয় গান্ধীর অতি সক্রিয় হয়ে ওঠা।  ইন্দিরা গান্ধী একটা সময় পুত্র ও তাঁর বশংবদ বন্ধুদের ছাড়া আর কাউকেই বিশ্বাস করতেন না। সুতরাং দেশজুড়ে ইন্দিরা হটাও আন্দোলন, জরুরি অবস্থা এবং তার জেরে দমনপীড়ন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইন্দিরা গান্ধীর প্রধান সেনাপতি সঞ্জয় গান্ধী। কংগ্রেসের অন্দরে তো বটেই, গোটা দেশের রাজনৈতিক চর্চায় কোনও সন্দেহ ছিল না যে, ইন্দিরা গান্ধী ধীরে ধীরে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী তৈরি করছেন। বড় ছেলে নির্বিবাদী এক এয়ারলাইন্স পাইলট। তিনি রাজনীতি থেকে শত হস্ত দূরে। অতএব জওহরলাল নেহরুর কন্যা ইন্দিরা গান্ধী কংগ্রেসকে প্রায় হা‌ইজ্যাক করে নিয়েছিলেন। এবার ইন্দিরা গান্ধীর পুত্র সঞ্জয় গান্ধী ভবিষ্যতে হবেন কংগ্রেসের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। এবং ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু সেই সম্ভাবনাও মুখ থুবড়ে পড়ল। ১৯৭৭ সালে কংগ্রেস, ইন্দিরা, সঞ্জয়, সকলেরই পরাজয় ঘটল সাধারণ নির্বাচনে। সবথেকে বেশি রাজনৈতিক মুখ পুড়ল সঞ্জয় গান্ধীরই। তিন বছর পর সঞ্জয় গান্ধীর দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যু। কিন্তু তখন আর তাঁর সেই দাপটও ছিল না।  সুতরাং ইন্দিরা গান্ধীর প্রধান সেনাপতি হলেও সঞ্জয় গান্ধীর প্রধানমন্ত্রী হওয়া হল না। কিন্তু নেহরু ও প্যাটেলের পর, অত্যন্ত স্বল্প সময়ের জন্য ঩দেখা গিয়েছিল ইন্দিরা সঞ্জয়ের যুগলবন্দির চিত্র। 
এরপর ভারতীয় রাজনীতিতে উত্থান ঘটল নতুন একটি রাজনৈতিক জুটি তথা যুগলবন্দির। অটলবিহারী বাজপেয়ি এবং লালকৃষ্ণ আদবানি। তাঁদের বন্ধুত্ব নতুন নয়। বহুকালের।  রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ, জনসঙ্ঘ, জনতা পার্টি। এই দুই রাজনৈতিক বন্ধু একে অন্যকে বুঝতেন। জানতেন। একে অন্যের শক্তি এবং দুর্বলতা সম্পর্কেও অবগত ছিলেন। জনসঙ্ঘকে জনতা পার্টির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে সেই সরকারের অঙ্গ হয়ে যাওয়ার প্ল্যান ছিল এই দুজনেরই। আবার মোক্ষম সময়ে জনতা সরকার থেকে দূরত্ব তৈরি করে ভারতীয় জনতা পার্টি নামক একটি নতুন দল গঠনের তুখোড় সিদ্ধান্তও এই দুজনের। লালকৃষ্ণ আদবানি ছিলেন অটলবিহারী বাজপেয়ির সেনাপতি।  যদিও বিজেপির অন্দরে স্ট্যাটাস ও মর্যাদায় দুজনেই সমান। এই দুই জুটির হাত ধরে মাত্র দুজন এমপির বিজেপি ১৯৮৯ সাল থেকে গোটা ভারতকে চমকে দিয়ে চমকপ্রদ এক জয়যাত্রা শুরু করেছিল। আদবানির উগ্র হিন্দুত্ব এবং বাজপেয়ির নরম হিন্দুত্বের  রসায়নে ক্রমেই  কংগ্রেস ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এবং আদবানির একটিমাত্র রথযাত্রা ভারতের ভাগ্যকেই বদলে দেয় চিরতরে। 
অবশেষে যা হওয়ার সেটাই বাস্তবায়িত হয়। অর্থাৎ বাজপেয়ি ও আদবানির জুটি তথা যুগলবন্দি সরকার গঠন করে ফেলল। ১৯৯৯ সালে প্রত্যাশিতভাবেই বাজপেয়ি হলেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু নিছক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নন, তিনি আদবানিকে উপ প্রধানমন্ত্রীও করলেন। দৃশ্যগতভাবে এবং শরীরী ভঙ্গি তথা ফিটনেসে বাজপেয়ির তুলনায় আদবানি ছিলেন অনেক শক্তপোক্ত। সুতরাং একটি আশা ও সম্ভাবনা ছিলই যে, বাজপেয়ি ২০০৪ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে আবার প্রধানমন্ত্রী হবেন। কিন্তু তারপর বিজেপির আদবানি যুগ শুরু হবে নিশ্চয়ই। অর্থাৎ ২০০৯ সালে আদবানিই হবেন প্রধানমন্ত্রী।
কিন্তু নিয়তি তথা অদৃষ্ট ছিল অন্যরকম। প্রত্যাশিত অভিমুখে ভারতের রাজনীতি অগ্রসর হয়নি। বরং সকলকে আশ্চর্য করে দিয়ে সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস একটি নতুন জোট গঠন করে ফেলল। এবং তৈরি হল ইউপিএ সরকার। প্রধানমন্ত্রী হলেন মনমোহন সিং। পাঁচ বছর পর ২০০৯ সালে আদবানি ধরেই নিয়েছিলেন যে এবার অন্তত বিজেপি আবার ক্ষমতাসীন হবেই। এবং সেবার তিনিই হবেন প্রধানমন্ত্রী। অথচ তাও হল না। আবার মনমোহন সিং। ২০১৪ সালের এক বছর আগে আদবানির স্বপ্ন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। গোয়ায় বিজেপির কর্মসমিতির বৈঠকে এবং কুম্ভমেলায় হিন্দু মহাসম্মেলনে ঘোষণা করা হয় বিজেপির নতুন মুখের নাম নরেন্দ্র মোদি। অর্থাৎ অটলবিহারী বাজপেয়ির প্রধান সেনাপতি তথা বাজপেয়ির দক্ষিণ হস্ত আদবানির আর প্রধানমন্ত্রী হওয়া হল না। তাঁর মুখের গ্রাস কেড়ে নিলেন নরেন্দ্র মোদি। 
ভারতের নবতম শক্তিশালী রাজনৈতিক জুটির নাম মোদি-শাহ। অর্থাৎ নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহ। ভূভারতের সকলেই জানে যে, নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর সেনাপতি তথা ভারত সরকারের সেকেন্ড ইন কমান্ড অমিত শাহ। তবে অতীতের জুটিগুলির সঙ্গে এই যুগলবন্দির একটি পার্থক্য আছে। এই নতুন রাজনৈতিক জুটির কেউ একে অন্যকে বন্ধু হিসেবে বিবেচনা করেন না। অমিত শাহ নিজেকে সচেতন এবং প্রকটভাবেই মোদির একনিষ্ঠ অনুগামী তথা অনুগত হিসেবেই বিবেচনা করেন এবং প্রকাশও করেন। পক্ষান্তরে মোদির কাছেও অমিত শাহ বিশ্বস্ত এক স্নেহের পাত্র এবং সবথেকে কাছের ঘনিষ্ঠতম রাজনৈতিক সঙ্গী। যদিও কোনও সন্দেহ নেই মোদি সরকারের অন্যতম চালিকাশক্তি, বিজেপি দলের প্রধানতম সাংগঠনিক পরিচালক এক ও একমাত্র অমিত শাহ। মোদির প্রবল জনপ্রিয়তা বিজেপিকে নির্বাচনে জয় এনে দেওয়ার জন্য প্রয়োজন। আর অমিত শাহের নিত্যদিনের সাংগঠনিক পরিচালনা তথা সরকারের নানাবিধ সিদ্ধান্ত গ্রহণে তিনিই অগ্রগণ্য। 
সাম্প্রতিককালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারংবার একটি বাক্য বলেন। অ্যাক্টিং প্রধানমন্ত্রী। অর্থাৎ তিনি পরোক্ষে বোঝাতে চান নরেন্দ্র মোদি নামেই প্রধানমন্ত্রী। আসলে আজকাল প্রধানমন্ত্রী অমিত শাহ। স্বাভাবিকভাবেই আজকের ভারতীয় রাজনীতির সবথেকে পুরনো রাজনৈতিক মস্তিষ্ক যিনি প্রশাসনে আছেন, তিনি হলেন মমতা। মমতা ইচ্ছাকৃতভাবেই এই বাক্যটি ব্যবহার করেন। রাজনৈতিকভাবে বিজেপিকে চরম অস্বস্তিতে ফেলতে।
ইতিহাস বলছে প্রধানমন্ত্রীদের যাঁরা সেনাপতি এবং দক্ষিণ হস্ত ছিলেন, তাঁদের কেউ প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি। আদবানি সর্বশেষ উদাহরণ।  আপাতত এবার নতুন জুটির ক্ষেত্রেও কমবেশি ধরে নেওয়া হচ্ছে যে, ২০২৯ সালের নির্বাচনের পর বিজেপি জয়ী হলে অমিত শাহ হবেন প্রধানমন্ত্রী। যেহেতু তিনিই সরকারের সেকেন্ড ইন কমান্ড। তাঁর বয়সও কম। 
ভারতীয় রাজনীতির  ইতিহাসের গতিপ্রকৃতিকে নস্যাৎ করে ২০২৯ সালে বিজেপি কি জয়ী হতে পারবে? সব জল্পনাকে ধূলিসাৎ করে অমিত শাহ হবেন প্রধানমন্ত্রী? নাকি হঠাৎ ২০২৯ সালের আগে অথবা পরে কোনও একটি রাজনৈতিক পালাবদলের ওলটপালট চলে এসে সেই মিথকেই বজায় রাখবে যে, সেনাপতি কখনওই প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন না?  কোনও সন্দেহ নেই যে, ১৯৪৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত যত রাজনৈতিক জুটি ও যুগলবন্দি এসেছে, নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ জুটি অন্তত প্রভাব ও দাপটের দিক থেকে সবথেকে শক্তিশালী!  
যদিও ভারত নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্র নির্মাণ ও পরিচালনার সাফল্যের গ্রাফে অবশ্যই বহুগুণ এগিয়ে নেহরু-প্যাটেল! সদ্য স্বাধীনতার পরই দেশভাগ, দাঙ্গা, দেশীয় রাজ্যকে অন্তর্ভুক্তি এবং ভারতকে একজোট রাখা। এই চারটি মহাজাগতিক সঙ্কটকে সামাল দেওয়া এক অবিশ্বাস্য সাফল্য! অতএব সব জুটির সেরা জুটি আজও নেহরু-প্যাটেল! 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ