ভাগলপুর বেড়ানোর দীর্ঘদিনের লালিত ইচ্ছেটায় জং ধরে গিয়েছিল। বন্দে ভারত এই রুটে চালু হতেই ইচ্ছের ফর্দে ঘষামাজা শুরু হয়ে গেল। মন্দার হিল স্টেশনে বন্দে ভারত থামে। সুতরাং সেখান থেকেই ভাগলপুর দেখার খাতা খোলা হবে।
ভাগলপুর বেড়ানোর দীর্ঘদিনের লালিত ইচ্ছেটায় জং ধরে গিয়েছিল। বন্দে ভারত এই রুটে চালু হতেই ইচ্ছের ফর্দে ঘষামাজা শুরু হয়ে গেল। মন্দার হিল স্টেশনে বন্দে ভারত থামে। সুতরাং সেখান থেকেই ভাগলপুর দেখার খাতা খোলা হবে।
নির্ধারিত দিনে সাতসকালে হাওড়া স্টেশন থেকে ধরলাম বন্দে ভারত। ছুটে চলা ট্রেনে বসে ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ পর্ব মিটতে না মিটতেই কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম। ঘড়ির কাঁটা ধরে ট্রেনটা নামিয়ে দিল মন্দার হিল স্টেশনে। তখন দুপুর সাড়ে বারোটা। প্ল্যাটফর্ম শুনশান। লোকজন সেরকম নেই। স্টেশন চত্বরে অপেক্ষমান কয়েকটা অটো টোটো। যাব মন্দার পাহাড়। যা হিন্দু ও জৈন ধর্মাবলম্বীদের কাছে এক পবিত্র স্থান। দূরত্ব মোটামুটি পাঁচ কিলোমিটার। দরদাম করে একটা অটো ঠিক করা হল। রাস্তা ভালোই, তবে কিছু জায়গায় পিচ সরে বোল্ডার বেরিয়ে গিয়েছে।
কিছুক্ষণের মধ্যে চলে এলাম বাঁকা জেলার মন্দার পর্বতের পাদদেশে। এখন দুপুর ১টা। পাহাড়ে ওঠার রোপওয়ে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। অটোস্ট্যান্ড থেকে পায়ে পায়ে এগিয়ে চলি। সামনেই পাহাড়তলে পাপহরণী সরোবর। স্বচ্ছ পান্নার মতো জল। জলে মেঘ-রোদের লুকোচুরি। সরোবর জুড়ে এক প্রশান্তি। সরোবর মাঝে এক বিষ্ণু মন্দির। তার প্রতিচ্ছবি জল আয়নায়। মন্দিরে যাওয়ার জন্য সরোবরের উপর লম্বা পুলটি বেশ দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মন্দির অভ্যন্তরে দেবতা, অনন্ত শয়ানে বিষ্ণু। সরোবরের সিঁড়ির ধাপে বসে রইলাম বেশ কিছুক্ষণ। এখানে বোটিং-এর ব্যবস্থাও রয়েছে। সরোবরের ওপার থেকে পাহাড়টা সটান উঠে গিয়েছে আকাশে। এটাই মন্দার হিল। যেন আকাশের বুকে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। ওই পাহাড় শীর্ষেই আছে জৈন তীর্থঙ্কর বাসুপূজ্যের মন্দির।
পুরাণ কাহিনি অনুসারে অমৃতের সন্ধান মেলে সমুদ্র গর্ভে। সেই অমৃতপানে মৃত্যুকে জয় করা সম্ভব। তাই দেবতারা ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বরের শরণাপন্ন হলেন। সব শুনে তাঁরা বিধান দিলেন অমৃতপ্রাপ্তির জন্য হিমালয় পর্বতের উত্তরে ক্ষীর সমুদ্র মন্থন করতে হবে। এদিকে অসুরদের সাহায্য ব্যতীত সমুদ্র মন্থন অসম্ভব। শেষমেশ অসুরদেরও অমৃতের ভাগ দেওয়া হবে এই শর্তে, রাজি করানো হল। কিন্তু সমুদ্র মন্থনের জন্য মন্থনদণ্ড কোথায় পাওয়া যাবে? আর সেই মন্থনদণ্ডের ধারকই বা কে হবেন? মুশকিল আসান করেন স্বয়ং বিষ্ণু। তিনি বলেন, আমি মহা কূর্ম রূপে আমার পৃষ্ঠে মন্থনদণ্ড ধারণ করব। আর মন্দার পর্বত হবে সেই মন্থনদণ্ড। কিন্তু আবার সমস্যা! সেই মন্থনদণ্ডের রজ্জু কোথায় পাওয়া যাবে? অবশেষে বাসুকী নাগকে রাজি করানো হল, সেই রজ্জু হতে। অমৃতের সন্ধানে দেবাসুরের মধ্যে চলতে থাকে দড়ি টানাটানি খেলা। এই মন্থনের ফলেই পর পর উঠে আসে, পুষ্পক রথ, ঐরাবৎ, পারিজাত পুষ্প, কৌস্তুভ মণি, লক্ষ্মীদেবী, সুরভী গাই এবং অমৃতকুম্ভ নিয়ে স্বয়ং ধন্বন্তরি। সেই অমৃতকুম্ভ নিয়েই ধুন্ধুমার লড়াই।
সেই মন্থনদণ্ডের পাদদেশে বসে আছি! কেমন যেন শিহরন হল। সরোবরের চতুর্দিকের পাড় জুড়ে প্রচুর গাছপালা। ফলে এক ছায়াময় সবুজের ঘেরাটোপ। পায়ে পায়ে এগিয়ে চলি লেকের অপর প্রান্তে। লেকের বাঁদিক জুড়ে অর্থাৎ বিষ্ণু মন্দিরের প্রবেশ সম্মুখে বেশ কিছু দোকানপাট। মূলত পুজো সামগ্রীর দোকান। বাঁদরদের উৎপাত ভালোই। রোপওয়ে অফিসে অনুরোধে কোনও লাভ হল না। এখন ওদের লাঞ্চপর্ব চলছে। এই পথেই গড়ানে পাথুরে জমিতে সমুদ্র মন্থনের ভাস্কর্য নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয়েছে। লেকের সীমান্ত প্রাচীর বরাবর সমুদ্র মন্থনের নানান ম্যুরাল চিত্র। এদিকটায় লোকজন সেরকম আসে না। জায়গাটা বেশ পরিচ্ছন্ন। আছে পুণ্যার্থীদের বিশ্রামের জন্য বিশাল হলঘর।
হেঁটেই উঠব এই সিদ্ধান্তে সিঁড়িপথ খুঁজতে আবার বাজারের মুখে এসে হাজির হলাম। পুদিনা পাতাসহ আখের রস খেয়ে কিছুটা এনার্জি সঞ্চয় করলাম। এবার পাহাড়ে ওঠার পালা। চওড়া সিঁড়ি। নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে দু’ধারে রেলিং দেওয়া হয়েছে। ফলে ছাদে উঠছি না পাহাড়ে উঠছি প্রথমে বোঝা যাচ্ছে না। ফুরফুরে মেজাজে তরতর করে উঠে চলেছি। দুপুর রোদের মধ্যেও আমাদের মতো বেশকিছু পর্যটক চড়াই ভাঙছেন। পুণ্যের টানে দলে আছেন প্রবীণরাও। পাহাড়টা চেনা শুশুনিয়ার মতো গাছপালা ঘেরা সবুজে মোড়া নয়। কিছুটা জয়চণ্ডী পাহাড়ের মতো। তবে অত নিচু নয়। বেশ খাড়াই। উচ্চতা প্রায় ৭০০ ফুট। কিছুটা চড়াই উঠতেই সিঁড়ির সারি ভয় ধরিয়ে দেয়। তবে নীচের প্রকৃতিকে দেখে মুগ্ধতায় মন ভরে যায়। উচ্চতার সঙ্গে বাড়তে থাকে হাওয়ার দাপট। এত হাওয়া বইছে যে, মাথায় টুপিই রাখা যাচ্ছে না। রোপওয়ে লাইনের প্রথম টাওয়ারটা পেরিয়ে গেলাম। এরপরই প্রশস্ত পাথুরে চাট্টান। পুণ্যার্থীদের কথা মাথায় রেখে এখানে একটা কংক্রিটের প্রতীক্ষালয় করা হয়েছে। সাময়িক বিরতি নিতে বসে পড়লাম সেখানে। এখান থেকে দাঁড়িয়ে পাখির চোখে নীচের সরোবরসহ পারিপার্শ্বিক প্যানোরামিক দৃশ্য অনবদ্য।
বিরতি শেষ, আবার চড়াই শুরু। শুরু হল কঠিন, রুক্ষ, বাদামি পাথরের রাজ্য। এই খাড়াই সিঁড়ি বেশ কষ্টকর। শহুরে অনভ্যস্ত শরীরে হাঁপ ধরে। দাঁড়াতে হয় বারেবারে। অনেকটা দম নিয়ে শেষে সেই পাহাড়টাই জয় করি। কিন্তু এরপরও যে একটা পাহাড় চড়তে হবে! এখন দাঁড়িয়ে আছি সেকেন্ড টাওয়ারের কাছে। এখানটাও অনেকটা পাহাড়ি সমতল। সামনেই এক জলাশয়। নাম সীতাকুণ্ড। ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে আরও কয়েকটা কুণ্ড। পুরাণমতে, এই মন্দার পাহাড়ের মাথায় শ্রীকৃষ্ণ মধু ও কৈটভ নামে দুই দৈত্যের সঙ্গে যুদ্ধ করেন। মধুকে এখানেই বধ করেন। তাই শ্রীকৃষ্ণের একটি নাম মধুসূদন। কৈটভ পালিয়ে কাছেই এক পাহাড়ে আশ্রয় নেয়। শ্রীকৃষ্ণ সেখানে গিয়ে তাঁকে বধ করেন। পুণ্যার্থীদের কথা ভেবে এখানেও কিছু দোকানপাট রয়েছে। সেসব দোকানে লেবুজল, আইসক্রিম, কাঁচা ছোলা বিক্রি হচ্ছে। হাঁপাতে হাঁপাতে পাথুরে চত্বরে বসে পড়ি। এদিকটাতে বেশ সবুজের আধিক্য। এই কুণ্ডের বাম দিকের রাস্তা চলে গিয়েছে নৃসিংহ গুহা ও আকাশগঙ্গা গুহার দিকে। এইসব গুহায় বহু সাধু সন্ন্যাসী বাস করেন। সামনেই দেখা যাচ্ছে শেষ সুউচ্চ পাহাড়টা। আর ওখানেই রোপওয়ে পথের ইতি। শেষমেশ উপরে ওঠার অদম্য ইচ্ছেতে ভাটা পড়ল। সিদ্ধান্ত হল এখান থেকেই নীচে নেমে যাব। ফলে উপরের বাসুপূজ্যের মন্দির, মন্দারনাথ মহাদেব মন্দির কিছুই দেখা হল না। তবে মন্দিরের চূড়া এখান থেকেই দৃশ্যমান। দূর থেকেই প্রণাম সেরে নিলাম। এবার দ্রুত নীচে নামতে থাকি। কারণ বিকেলের মধ্যে ট্রেন না ধরলে, ভাগলপুর পৌঁছাতে গভীর রাত হয়ে যাবে।
কীভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে রেলপথে মন্দার হিল স্টেশনে নামতে পারেন। ভাগলপুর থেকে গাড়ি করেও যেতে পারেন।
সফরসূচি ঠিক করার সময় মনে রাখবেন প্রতি বছর মহাবীর জয়ন্তী এবং মকর সংক্রান্তিতে এখানে উৎসবের আয়োজন করা হয়। পাপহরণী সরোবরের ধারেই রয়েছে ট্যুরিস্ট লজ। মন্দার হিল স্টেশনের কাছেও কয়েকটি হোটেল মিলবে।
মানস মুখোপাধ্যায়