নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: নির্যাতিতার বয়ানে অসঙ্গতি, সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাব এবং তদন্তে গাফিলতির জেরে কড়েয়া থানার এক গণধর্ষণ মামলা থেকে বেকসুর খালাস হলেন তিন ব্যক্তি। মঙ্গলবার আলিপুরের সপ্তম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক অঞ্জন কুমার সেনগুপ্ত তিন অভিযুক্তকে বেকসুর খালাস করার সঙ্গেই নিজের পর্যবেক্ষণে তদন্তকারী পুলিস আধিকারিকদের কড়া ভর্ৎসনাও করেছেন। বিচারকের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে মামলা সংক্রান্ত গাফিলতির যাবতীয় দিকও। এই মামলায় ৯০ দিনের মধ্যেই চার্জশিট জমা দিয়েছিল পুলিস। কিন্তু তাতে নানা প্রাসঙ্গিক তথ্যে খামতির বিষয়টিও উঠে আসে।
আদালত ও পুলিস সূত্রে জানা গিয়েছে, গণধর্ষণের ওই ঘটনাটি ২০১৪ সালের ২০ জুনের। ওইদিন রাত ১০টা নাগাদ কড়েয়া থানা এলাকার একটি ধাবা থেকে রুটি-তড়কা কিনতে বেরিয়েছিলেন স্থানীয় এক গৃহবধূ। বাড়ি থেকে মাত্র পাঁচ মিনিট দূরত্বে ছিল ধাবাটি। অভিযোগ ছিল, ওই সময় কড়েয়া এলাকার বাসিন্দা তিন ব্যক্তি জামানলুর রহমান, আকবর খান ও শাহাজাদা বক্স ওই গৃহবধূকে জোর করে একটি গাড়িতে তুলে নেয়। এরপর আগ্নেয়াস্ত্র দেখিয়ে ধর্ষণ করে পরে বালিগঞ্জ পার্ক রোডে রাস্তার ধারে ওই মহিলাকে ফেলে চম্পট দেয়। ওই রাতেই মহিলা কড়েয়া থানায় গণধর্ষণের অভিযোগ দায়ের করেন ওই তিনজনের বিরুদ্ধে। তদন্তে নেমে এক সপ্তাহের মধ্যেই তিন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে পুলিস। কিন্তু সংশ্লিষ্ট গাড়ি এবং তার চালকের কোনও সন্ধান মেলেনি। অভিযুক্তদের জেল হেফাজতে রেখেই আলিপুর আদালতে মামলা শুরু হয়। ওই মহিলা বিচারকের কাছে গোপন জবানবন্দিও দেন।
এদিন রায় ঘোষণা পর্বে বিচারকের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে এই মামলায় বিস্তর গাফিলতি ও ফাঁকফোকরগুলি। তাতে তদন্তকারীদের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে। যে খামতিগুলি সামনে এসেছে, তা হল (১) যে গাড়িতে তুলে মহিলাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ, পুলিস তা বাজেয়াপ্ত করতে পারেনি (২) গাড়িচালকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হলেও, তাকে গ্রেপ্তার করা যায়নি (৩) আগ্নেয়াস্ত্র দেখিয়ে ধর্ষণ করার অভিযোগ উঠলেও, সেই অস্ত্র আদালতে পেশ করা হয়নি (৪) ঘটনার সময় পুলিসের কাছে নির্যাতিতা অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। এরপর গোপন জবানবন্দি দিয়েছিলেন বিচারকের কাছে। সর্বশেষে মামলার বিচার প্রক্রিয়া চলাকালীন সাক্ষ্যও দিয়েছিলেন ওই মহিলা। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তিনটি ক্ষেত্রেই ঘটনা নিয়ে মহিলার বক্তব্য ছিল পরস্পর বিরোধী (৫) ধর্ষণের পর যেখানে মহিলাকে ফেলে দেওয়া হয়েছিল, সেই ঘটনাস্থল নিয়েও ছিল নানা ধন্দ। পুলিসের কাছে এক জায়গা এবং আদালতে অন্য জায়গার কথা বলা হয় (৬) এমনকী মেডিক্যাল পরীক্ষাতেও ধর্ষণ সংক্রান্ত কোনও জোরালো তথ্য মেলেনি (৭) এই মামলায় মোট সাক্ষী ছিলেন ১৮ জন। তার মধ্যে বেশ কয়েকজন সাক্ষীর বয়ানেও ছিল বিস্তর অসঙ্গতি।
এই মামলায় অভিযুক্তদের আইনজীবী সর্বাণী রায় বলেন, পুলিস আদালতে গণধর্ষণ নিয়ে যা অভিযোগ করেছিল, তা কোনওভাবেই প্রমাণ করতে পারেনি। আমার মক্কেলদের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অথচ ১১ বছর ধরে তাঁদের জেলে পুরে রাখা হয়েছিল। সরকারি আইনজীবী মৃদুলা বিশ্বাস বলেন, রায়ের নথি না দেখে, কোনও মন্তব্য করব না। -নিজস্ব চিত্র