সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়: আট লক্ষ পনেরো হাজার কোটি টাকার দেনা ও সীমিত রাজস্ব আয় নিয়ে উন্নয়নের দিশা দেখানো কীভাবে সম্ভব? প্রথমবার বাজেট পেশ করতে এসে এই কঠিন প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজলেন রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। তিনি যেসব প্রস্তাব রাখলেন তাতে সরকারের প্রতিশ্রুতি পূরণের সদিচ্ছা স্পষ্ট। সরকারের বয়স এখনও দু’মাস হয়নি। এত অল্প সময়ে রাজ্য সরকারি কর্মচারী, কৃষক, অস্থায়ী কর্মচারী, মহিলা, যুব, আদিবাসী সমাজের জন্য একাধিক প্রস্তাব রাখা হল। জোর দেওয়া হল পরিকাঠামোর বিস্তারে। এই চেষ্টাকে সাধুবাদ জানাতেই হবে। এর অর্ধেকও যদি বাস্তবায়িত হয় তাহলে বাংলার বহু প্রতীক্ষিত উন্নয়নের সূচনা হবেই। সদিচ্ছা আছে বলেই মুখ্যমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী সকল শ্রেণির মানুষের কথা ভেবেছেন। পিছিয়ে থাকা রাজবংশী, কুরমালি সম্প্রদায়ের জন্যও বাজেটে প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এতেই রাজ্য বাজেট একটা ইনক্লুসিভ চরিত্র পেয়েছে।
রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া ডিএ ২০% বেড়েছে। বাকিটাও দফায় দফায় মিটিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পূর্বতন সরকারের সমস্ত সামাজিক কল্যাণ প্রকল্প চালু রাখার কথা বলা হল। ‘যুব শক্তি’র বদলে আসছে ‘ভরসা’, তাতে যুব শ্রেণির জন্য মাসিক ভাতা দেওয়া হবে। সমাজের দরিদ্র ও দুর্বল শ্রেণির জন্য এই বাজেট এককথায় দরাজ। বয়স্ক, বিধবা, বিশেষভাবে সক্ষম থেকে শুরু করে আশা কর্মী , হোম গার্ড, এনবিএফ, প্যারা টিচারদের বেতন বৃদ্ধি, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য নির্দিষ্ট বরাদ্দ করে বোঝানো হল রাজ্যের নতুন সরকার চায় ‘সব কা সাথ, সবকা বিকাশের’ শপথ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলতে।
অর্থের সংস্থান করবে কে?
সবার বিকাশের জন্য সবার আগে দরকার অর্থ। প্রয়োজন পরিকাঠামো গড়ে তোলা। তবেই হবে কর্মসংস্থান। একমাত্র তাহলেই মানুষের হাতে অর্থ আসবে আর সেই অর্থ বাজারে হাতে হাতে ঘুরবে। নতুন করে জিনিসের চাহিদা তৈরি হবে। একমাত্র সেই পথেই নতুন লগ্নি ও শিল্প সম্ভাবনা তৈরি করা সম্ভব। এভাবেই উন্নয়নের চক্রে ফিরিয়ে আনা যাবে রাজ্যকে। বাজেটের সব ঘোষণা কার্যকর করার জন্য সর্বাগ্রে চাই প্রয়োজনীয় অর্থ এবং কেন্দ্রের সাহায্য। এজন্যই কেন্দ্রের বহুমুখী উন্নয়ন প্রকল্পের অংশীদার হওয়ার প্রস্তাব রেখেছে রাজ্য। সড়ক, সেতু, জলপথ, সমুদ্র বন্দর ও বিমানবন্দর গড়ার প্রস্তাব রেখেছেন একটার পর একটা। এক লক্ষ সরকারি চাকরির ঘোষণাও অভূতপূর্ব। এসব যদি সত্যিই হয়, তাহলে বলতেই হবে, দ্রুত বদলে যাবে পশ্চিমবঙ্গের ছবি। এতে যে পরিমাণ বিনিয়োগ ঘটবে এবং নতুন চাকরি হবে তাতে রাজ্যবাসীর মাথাপিছু আয়, ক্রয়ক্ষমতা ও খরচের ঝোঁক বেড়ে যাবে। অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের বৃদ্ধি ঘটবে। বাজেটে উন্নয়ন ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে সর্বত্র, শিলিগুড়ি থেকে সুন্দরবন। এতে পিছিয়ে থাকা এলাকার অন্ধকার কাটতে বাধ্য। সব মিলিয়ে যে প্রস্তাব এসেছে তাতে আশাপ্রদ চিত্রই ফুটে উঠেছে।
উন্নয়নের ছবি তো আঁকা হল, কিন্তু রসদ কোথায়? বালুরঘাট, মালদহ, কল্যাণীতে বিমানবন্দর তৈরি হবে কি নামমাত্র টাকায়? এই বাজেটে অসংখ্য প্রস্তাব রাখা হয়েছে যার জন্য বরাদ্দ হয়েছে প্রয়োজনের তুলনায় অতি সামান্য। এই বাজেট আগামী আট মাসে সবকিছু দেখিয়ে দিতে পারবে না, তবে নিশ্চিতভাবে ভবিষ্যতের জন্য রাজ্যের উন্নয়নে একটা রোডম্যাপ তৈরি করে দিল।
সদিচ্ছার জয় হোক
এই বাজেটে রাজ্যের যুব ও মহিলা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যৎ তৈরির কথা ভাবা হয়েছে। এটা ইতিবাচক দিক। এর জন্য শিক্ষা পরিকাঠামো ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রস্তাব রাখা হয়েছে। শিক্ষক অধ্যাপক শিক্ষাকর্মী নিয়োগ, নতুন মেডিকেল কলেজ থেকে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়, এমনকি নতুন আইআইএম, আইআইটি গড়ে তোলা, নিজস্ব উদ্যোগ তৈরিতে আর্থিক সহায়তা, স্টার্ট আপ তৈরিতে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ড, সর্বোচ্চ স্তরে পড়াশোনা ও পরীক্ষার ট্রেনিংয়ের জন্য বৃত্তি চালুর ভাবনা প্রশংসনীয়। রাজ্যে নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, বন্দর স্থাপন, শিল্প করিডর গড়ে তোলা, একশ কোটির বেশি লগ্নির শিল্প গড়তে জমির সিলিং তুলে শর্ত সহজ করা, তোলাবাজি বন্ধে আইন বা লাল ফিতের ফাঁস দূর করতে সিঙ্গল উইন্ডো চালু করে শিল্পবান্ধব পরিবেশ ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব কার্যকর করা এই সময়ের প্রয়োজন। কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ ঘটিয়ে সেটা সম্ভব, বাজেটে সেই ভাবনারই প্রতিফলন দেখা গিয়েছে।
সীমিত বরাদ্দ, সক্ষমতা কোথায়?
রাজ্যের উন্নয়নে দরকার মোট উৎপাদনের তুলনায় ঋণের অনুপাত কমানো। তবেই রাজ্যের সক্ষমতা বাড়বে। তৈরি হবে দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যত। সেই দিকে এই বাজেটের নজর কম। রাজ্যের সীমাবদ্ধ আর্থিক ক্ষমতা পিছনে ঠেলবেই। কেন্দ্রের অংশীদার হয়েও সহজে সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে তোলা কঠিন। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও বিশ্ব ব্যাংকের থেকে ঋণ নেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তাতে সুদ বাবদ আরও ব্যয় যেমন বাড়বে, দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ ক্ষমতাও কমবে। এই বাধা কাটাতে প্রয়োজন রাজস্ব আয় বাড়ানো। এবারের বাজেটে সেটা নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। দেখানো হয়েছে রাজস্ব ঘাটতি অর্ধেক কমে যাবে! কিন্তু কীভাবে? সামাজিক কল্যাণ খাতে ঝাড়াই বাছাই করে প্রাপকের সংখ্যা কত কমবে? একথা সত্যি, রাজ্যের নিজস্ব অনেক খরচ কমবে কেন্দ্রের প্রকল্প চালু হলে। সেই দিক থেকে খরচ কমবে। কিন্তু কোন সূত্রে আয় বাড়বে তা নিয়ে কোনো উল্লেখ নেই। বাজেটে যা বলা হয়েছে তা বাস্তবায়িত করতে হলে মূলধনী ব্যয় দ্বিগুণের বেশি করতে হবে। এজন্য বাজেটের সংস্থান মোটেই পর্যাপ্ত নয়। আর্থিক ও রাজস্ব ঘাটতি দুই নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিন্তু কী করে, তার ব্যাখ্যা নেই। তবে বলা যেতেই পারে, এই বাজেটে নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি পালনের দায়বদ্ধতা মেটালো সরকার। এখন বাস্তবে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান ঘটাতে অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাব কতটা কার্যকর হবে তার উপরেই নির্ভর করবে রাজ্যের ভবিষ্যৎ। তবে সাহসী ঘোষণায় প্রত্যাশা বাড়ছে মানুষের।
(লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক, মতামত ব্যক্তিগত)