তন্ময় মল্লিক: গামছার কথা উঠলেই মাথায় আসে মুর্শিদাবাদের বেলডাঙার নাম। বেলডাঙার গামছার খ্যাতি দেশজোড়া। গামছার কথা বললে আরও একটি নাম আম বাঙালির মনে ভেসে ওঠে, আব্দুর রেজ্জাক মোল্লা। সর্বদা তাঁর কাঁধে থাকত লাল গামছা। রাজ্যের মন্ত্রী হলেও তিনি নিজেকে ‘চাষার ব্যাটা’ বলতেই বেশি পছন্দ করতেন। সদ্য প্রয়াত রেজ্জাক মোল্লার পছন্দের সেই
গামছাই এবার বামেদের ডাকা ব্রিগেডের অন্যতম চর্চার বিষয়। ব্রিগেড উপলক্ষ্যে এক লক্ষ গামছা দেবে সিপিএম। তবে, গলায় গামছা ঝোলালেই কৃষক দরদি হওয়া যাবে না, বাংলার বঞ্চনার বিরুদ্ধেও হতে হবে সোচ্চার। ব্রিগেডের সভায় সারের
ভর্তুকি বৃদ্ধি, ১০০ দিনের কাজের দাবিতে গলা না ফাটিয়ে রাজ্য সরকারের মুণ্ডুপাত করলে তা হবে কৃষক দরদির ভেক।
ব্রিগেড যে কোনও রাজনৈতিক দলের শক্তি পরীক্ষার ‘গ্রাউন্ড ফিল্ড’। সাধারণত নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলি ব্রিগেডে জনসভার ডাক দিয়ে থাকে। বিধানসভার ভোট প্রায় এক বছর বাকি। সেই অর্থে এটাকে ‘নির্বাচনী ব্রিগেড’ বলা যাবে না। এবার ব্রিগেড ডেকেছে সিপিএমের শ্রমিক, কৃষক ও খেতমজুর সংগঠন। গত বছর ডেকেছিল সিপিএমের যুব সংগঠন। ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকার রেকর্ড করা দলটি শূন্যে পৌঁছে মনে করেছে, সিপিএম দলটা ক্রমশ ‘বৃদ্ধের দলে’ পরিণত হচ্ছে। নতুন প্রজন্ম দলে না এলে ঘুরে দাঁড়ানো অসম্ভব। তাই তারা পরিকল্পিতভাবে যুবদের বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিল।
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি সিপিএমের যুব সংগঠন ব্রিগেডে যে সভা করেছিল তাতে চমক ছিল প্রচুর। মঞ্চ বাঁধা হয়েছিল মাঠের মাঝখানে। চারিদিকে ছিল দলীয় কর্মী সমর্থকদের ভিড়। চিরাচরিত গণসঙ্গীতের পরিবর্তে সভা শুরু হয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পছন্দের রবীন্দ্রসঙ্গীত ‘বাংলার মাটি, বাংলার জল’ দিয়ে। চমক ছিল মঞ্চেও। সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক ছাড়া কোনও সিপিএম নেতাকে মঞ্চে দেখা যায়নি। বিমান বসু, সূর্যকান্ত মিশ্রের মতো প্রবীণ নেতারাও ছিলেন দর্শক আসনে। ‘ক্যাপ্টেন’ সম্বোধনে সম্বোধিত হয়েছিলেন ডিওয়াইএফের রাজ্য সম্পাদক মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়।
মীনাক্ষীর মেঠো ভাষণ শুধু বামপন্থীদেরই নয়, অরাজনৈতিক লোকজনকেও আকৃষ্ট করে। দু’মাস ধরে রাজ্যজুড়ে প্রচার চালানোয় ব্রিগেড প্রায় ভরে গিয়েছিল। ভিড় দেখে আলিমুদ্দিনের কর্তারা মনে করেছিলেন, মীনাক্ষীদের সামনে রেখেই
রাজ্যের ছাত্রযুবদের বাম রাজনীতির আঙিনায় টেনে আনা যাবে। ব্রিগেডের কয়েক মাস পরেই ছিল দেশের সরকার গড়ার ভোট। যুবদের সভার ভিড় লোকসভা নির্বাচনে তাদের শূন্যের বদনাম ঘোঁচানোর আশা জাগিয়েছিল। কিন্তু আসন জেতা তো দূরের কথা, সিপিএমের অধিকাংশ প্রার্থীই জামানত খুইয়ে ছিলেন। তারপর থেকেই বাংলায় একটা কথা চালু হয়েছে, ‘সিপিএমের লোক আছে, ভোট নেই।’ সিপিএমের ডাকে যাঁরা ব্রিগেড ভরান, যাঁরা গলার শিরা ফুলিয়ে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান দেন, তাঁরাই চটের আড়ালে গিয়ে অন্য দলের প্রতীকে বোতাম টেপেন। একের পর এক নির্বাচনে সিপিএমের কর্মী সমর্থকরা এভাবেই নিজেদের ঠকিয়ে চলেছেন। একেই বলে আত্মপ্রবঞ্চনা। আত্মঘাতী গোলেই ছিটকে যাচ্ছে ম্যাচ থেকে। সেই কারণে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইটা দিন দিন কঠিন হচ্ছে।
আগামী কালের জনসভায় কত লোক হবে, ব্রিগ্রেড কতটা ভরবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চর্চা আছে। বঙ্গ সিপিএম বিধানসভায় ও লোকসভায় একজন প্রতিনিধিকেও পাঠাতে পারেনি। তা সত্ত্বেও অনেকে মনে করছেন, লোক জড়ো ও ইস্যু তৈরির ব্যাপারে বিজেপির থেকে কিছুটা হলেও সিপিএম এগিয়ে রয়েছে। তাই এবারও ব্রিগেড দেখে বোঝা যাবে না, সিপিএম এ রাজ্যে শূন্য।
ব্রিগেডের ভিড় কখনওই ভোট নির্ধারণের মাপকাঠি হতে পারে না। তবে একথা ঠিক, ব্রিগেডের জনসমাগম অরাজনৈতিক লোকজনের মধ্যে কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলে। তাই প্রতিটি রাজনৈতিক দল ব্রিগেডের জনসভা সফল করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে। ক্ষমতায় থাকার রেকর্ড সৃষ্টিকারী একটা দলের ১০ বছরে শূন্যে নেমে যাওয়াটাও একটা রেকর্ড। এটা শুধু লজ্জার নয়, যন্ত্রণারও। সেই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে কখনও কংগ্রেসের, কখনও সাম্প্রদায়িক শক্তির হাত ধরতেও দ্বিধা করেনি। কিন্তু লাভ হয়নি। কারণ একসময় বামেরা যাঁদের ভোটে জিতত সেই কৃষক, খেতমজুর, গরিব খেটেখাওয়া মানুষই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ভোট ব্যাঙ্ক’ হয়ে গিয়েছে। সেখানে আঘাত হানাই রবিবারের ব্রিগেডের লক্ষ্য।
শ্রমিক, কৃষক, খেতমজুর এবং বস্তি উন্নয়ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত বাম নেতারাই এবারের ব্রিগেডের বক্তা। সিপিএম বুঝতে পারছে, খেটে খাওয়া মানুষের আস্থা ফেরাতে না পারলে হাল ফিরবে না লালের। সম্ভবত তারজন্যই উদ্যোক্তা হিসেবে এমন সংগঠনগুলিকে যুক্ত করা হয়েছে যাদের সঙ্গে একটা সময় খেটেখাওয়া মানুষের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। কিন্তু বাম নেতৃত্ব বুঝতে পারছে না, ঘি তারা অনেক দিন আগে খেয়েছে। এখন আর হাতের গন্ধ শুঁকিয়ে লাভ হবে না।
সিপিএম রাজ্যের ক্ষমতা দখলের পর ভূমি সংস্কার করে প্রান্তিক মানুষের মন জিতে নিয়েছিল। পরিসংখ্যান বলছে, প্রায় ১১ লক্ষ একর জমির বর্গা রেকর্ড করিয়েছিল। তাতে উপকৃত হয়েছিল প্রায় ১৪ লক্ষ পরিবার। এছাড়াও জোতদারদের হাতে থাকা আট লক্ষ একর জমি খাস ঘোষণা করে ভূমিহীনদের মধ্যে বিলি করেছিল। সংখ্যাটা প্রায় ১৫ লক্ষ। সব মিলিয়ে আনুমানিক ৩০ লক্ষ পরিবার উপকৃত হয়েছিল। শুধু ভূমি সংস্কারের ঢাক পিটিয়েই সিপিএম একের পর এক নির্বাচনে জয় হাসিল করেছিল। সিপিএমের প্রচারের দৌলতে বামফ্রন্ট সরকার ও ভূমি সংস্কার সমার্থক হয়ে উঠেছিল। ওই একটি কাজের জন্য সিপিএমের অনেক অত্যাচার, অপরাধ সাধারণ মানুষের চোখে লঘু হয়ে যেত।
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সিপিএমের ভোট ক্রমশ কমছে। ব্যর্থতার দায় ঝেড়ে ফেলতে সিপিএম কখনও ‘বিজেমূল’ থিওরি, কখনও ‘বাইনারি পলিটিক্স’কে অজুহাত করেছে। কিন্তু, বাস্তবটা হল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিষেবার তোড়ে বিরোধীদের সমস্ত চেষ্টা খড়কুটোর মতো ভেসে যাচ্ছে। বাম আমলে ভূমি সংস্কারের ফলে উপকৃত পরিবারের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০ লক্ষ। তারজন্য তারা দশকের পর দশক গরিব মানুষের সমর্থন পেয়েছিল। তাহলে সামাজিক প্রকল্পের ঝাঁপির সৌজন্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভিত কতটা পোক্ত হতে পারে, সেটা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হতে হয় না। তন্ন তন্ন করে খুঁজেও বাংলায় এমন কোনও খেটেখাওয়া পরিবার পাওয়া যাবে না, যারা রাজ্য সরকারের কোনও না কোনও প্রকল্পের ‘ডাইরেক্ট বেনিফিসিয়ারি’ নয়। সেই জন্যই রাজ্যের গরিবগুর্বোরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ভোট ব্যাঙ্কে’ পরিণত হয়েছে। তারা বুঝেছে, তৃণমূল সুপ্রিমো যতদিন মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন তাঁদের সুবিধা কেউ কেড়ে নিতে পারবে না, উল্টে বাড়বে।
কেন্দ্রীয় সরকার ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে বাংলার ১০০ দিনের কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। তারজন্য দুর্নীতিকে অজুহাত হিসেবে খাড়া করেছে। লাগাতার কেন্দ্রীয় টিম পাঠিয়ে তদন্ত করেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশমতো রাজ্য ব্যবস্থাও নিয়েছে। তারপরেও কাজ চালু করেনি। সিপিএম নেতৃত্ব খুব ভালো করেই জানে, বিজেপি সরকার ১০০ দিনের কাজ অর্থাৎ মনরেগার মতো প্রকল্প চালু রাখার বিরোধী। খেটেখাওয়া মানুষের কাজ সুনিশ্চিত করা যে সরকারেরই দায়িত্ব, সেটা বিজেপি মনে করে না। সেই কারণে কংগ্রেস সরকারের চালু করা এই প্রকল্পের ব্যাপারে নরেন্দ্র মোদির তীব্র অনীহা। তারজন্য দেশে বেকারত্ব বৃদ্ধি পেলেও, ক্ষুধার সূচকে ভারতের অবস্থা আরও করুণ হলেও ১০০ দিনের কাজে বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়। নরেন্দ্র মোদির বিশ্বাস, ‘এই প্রকল্প নিছক মাটিতে গর্ত খোঁড়ার কাজ।’
সিপিএম নেতৃত্ব এসব বোঝে না, জানে না, এমনটা ভাবার কোনও কারণ নেই। তা সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় সরকার গরিবের পেটে লাথি মারলেও সিপিএম প্রতিবাদে সোচ্চার হয় না। উল্টে রাজ্য সরকারের দুর্নীতির দিকে আঙুল তুলে বিজেপির বঞ্চনায় মদত জোগায়। তাতে সিপিএমের গায়ের জ্বালা মেটে। কিন্তু গরিবের পেটের আগুন নেভে না। গরিবের যন্ত্রণা উপশমে পদক্ষেপ করেন মমতাই। তাই সিপিএম তাঁকে যত আক্রমণ করছে গরিব মানুষের কাছ থেকে তারা ততই দূরে সরে যাচ্ছে। সেটা সিপিএমকে উপলব্ধি করতে হবে। তা না হলে তাদের ব্রিগেড হয়তো ভরবে, কিন্তু ভোট কিছুতেই ফিরবে না। কারণ গরিব মানুষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই তাদের প্রতিনিধি মনে করে।