সেই প্রাচীনকাল থেকে এ দেশ-ও দেশ জানার নেশায় মানুষ ঘুরে ফিরেছে গোটা পৃথিবী। জানার আকুল তৃষ্ণায় সে চাঁদেও গেছে। সৌরজগতের কোনায় কোনায় অনুসন্ধানের চেষ্টা চলছে মানুষের। অথচ ভেবে দেখেছেন, আমাদের শরীরের ভেতরেই রয়েছে এমন এক দেশ, যার রহস্য আজও উদঘাটিত নয়। তাবড় তাবড় বিজ্ঞানী, গবেষক হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন এর রহস্য উন্মোচনে। তবুও যেন সবটুকু জেনে ফেলা যাচ্ছে না। আমাদের শরীরের এই রহস্যময় দেশের নাম ব্রেন, বাংলায় যার রাশভারী নাম মস্তিষ্ক!
জটিল, ভীষণ জটিল!
আমাদের মস্তিষ্কের গঠন খুবই অদ্ভুত, বিশাল জটিলও বটে। মানব মস্তিষ্কে প্রায় ৮৬ বিলিয়ন নিউরন আছে। প্রতিটি নিউরন হাজার হাজার সাইন্যাপ্সের মাধ্যমে অন্য নিউরনের সঙ্গে যুক্ত। প্রায় ১০০ ট্রিলিয়ন সংযোগ আছে আমাদের মস্তিষ্কে। এই অসীম সংখ্যক সংযোগ আমাদের চিন্তা, স্মৃতি, আবেগ এমনকি সিদ্ধান্তের জটিলতা তৈরি করে। সুতরাং, প্রতিটি নিউরনের ক্রিয়া আলাদা করে বোঝা কঠিন। আবার আমাদের ব্রেনের পুরোটা জুড়ে যে একই সংখ্যক নার্ভ সেল আছে, তা-ও নয় কিন্তু। কোথাও বেশি, কোথাও কম। যেমন ধরুন সেরিবেলাম। ব্রেনের এই অংশে নার্ভ সংখ্যায় অনেক বেশি। আবার এই ব্রেনেরই অন্যত্র দেখা যায়, নার্ভ সেল হয়তো বেশি নেই, কিন্তু সাপোর্টিভ সেল রয়েছে অনেক।
ফ্যাট ছাড়া অচল!
আপনাদের একটা বিস্ময়কর তথ্য দিই। প্রায় দেড় কেজি ওজনের এই ব্রেইনে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ফ্যাট থাকে। অর্থাৎ, অন্যান্য অঙ্গের তুলনায় মস্তিষ্কে চর্বির পরিমাণ অনেকটাই বেশি। ব্রেনের মূল কাজগুলো, যেমন স্মৃতি রাখা, চিন্তা করা, আবেগ নির্ধারণ বা অনুভব করা, মোটর স্কিলস—এগুলো ঠিকমতো করার জন্য এতটুকু ফ্যাট আমাদের মস্তিষ্কের জন্য লাগেই। যদি মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত চর্বি না থাকে, স্নায়ুতন্ত্র ধীরে কাজ করে। স্মৃতি কমে যায়। মনোযোগও কমে যেতে পারে।
সূত্রে ফেলা কঠিন!
মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণার পরবর্তী পর্যায়ে আমরা জেনেছি মস্তিষ্ক কীভাবে সংকেত পাঠায়। নিউরনগুলো কেমন করে একে অপরের সঙ্গে জুড়ে থাকে। কিন্তু সেই সংযোগের ভিত্তিতে চেতনা কেমন করে তৈরি হয়, কীভাবে চিন্তা করি, কেন ভাবনা আসে, স্বপ্ন দেখি, কীভাবে ঘুমিয়ে পড়ি, ঘুমের মধ্যেই মস্তিষ্কে কী কী চলে, তার কার্যকারণ, ব্যাখ্যা ধরতে পারি না।
মন আর মস্তিষ্ক এক?
মন কী? মন আর মাথা কি আসলে একই? যদি তা না হয়, তবে মন থাকে কোথায়? নাকি এই মন ও তার যাবতীয় জটিল জারিজুরি মস্তিষ্কের একটি অমীমাংসিত অংশ? প্রশ্ন অনেক, কিন্তু উত্তর সুনির্দিষ্ট নয়। আর সেই কারণেই হয়তো মস্তিষ্ক আজও রহস্যময়।
কী আছে মাথায়?
সহজ করে বললে, আমাদের মস্তিষ্কে ৩টি প্রধান অংশ। সেরিব্রাম, সেরিবেলাম ও ব্রেইনস্টেম।
সেরিব্রাম: মাথার উপরের বড়ো অংশ। কাজ হল চিন্তা, স্মৃতি, আবেগ, ভাষা ও যোগাযোগ, সিদ্ধান্ত নেওয়া, সমস্যা সমাধান, দৃষ্টি, শোনা, স্পর্শের তথ্য প্রক্রিয়াকরণ।
সেরিবেলাম: ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক। অবস্থান মাথার পিছনের নীচের অংশে। এই অংশ যদি কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে আমাদের ব্যালেন্স বা সামগ্রিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। চলতে ফিরতেও অসুবিধা হয়।
ব্রেন-স্টেম: মস্তিষ্কের নীচের অংশে। মস্তিষ্ককে ক্র্যানিয়াল নার্ভের সঙ্গে যুক্ত করে। প্রধান কাজ—জীবনধারন সংক্রান্ত কাজ নিয়ন্ত্রণ। যেমন- শ্বাসপ্রশ্বাস, হৃদস্পন্দন, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, অ্যাংজাইটি ও অটোমেটিক রিফ্লেক্স এবং সেরিব্রাম ও সেরিবেলামের সঙ্গে সঙ্কেত আদানপ্রদান।
অক্সিজেনের পিয়াসী!
মস্তিষ্কের ওজন গোটা শরীরের ওজনের প্রায় ২ শতাংশ হলেও এটি দেহের মোট অক্সিজেনের ২০ শতাংশ ব্যবহার করে। এত অক্সিজেনের চাহিদার কারণ, মস্তিষ্কের নিউরনগুলো সবসময় সক্রিয় থাকে চিন্তা, স্মৃতি, অনুভূতি, সংকেত প্রেরণ ইত্যাদির জন্য। অক্সিজেন না পেলে মাত্র কয়েক মিনিটে নিউরন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
নমনীয়তা ভাবায়!
মস্তিষ্কের নমনীয়তা বা প্লাস্টিসিটিও আমাদের অবাক করে। প্লাস্টিসিটি হলো মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন এবং অভিযোজনের ক্ষমতা, যার মাধ্যমে নিউরন ও তাদের সংযোগ (সাইন্যাপ্স) নতুন অভিজ্ঞতা, শেখা বা কোনও ক্ষতির পর পুনরায় গঠিত হতে পারে।
স্ট্রাকচারাল প্লাস্টিসিটি: নতুন নিউরন সংযোগ তৈরি করে বা পুরনো সংযোগ শক্তিশালী করে। উদাহরণ: নতুন ভাষা শেখা, বাদ্যযন্ত্র বাজানো শেখা।
ফাংশনাল প্লাস্টিসিটি: মস্তিষ্কের একটি অংশে ক্ষতি হলে অন্য অংশ তার কাজ সামলে নেয়। উদাহরণ: কারও একটা হাত অকেজো হলে অন্য হাতের নিউরন বেশি সক্রিয় হয়ে কাজ শিখে নেয়।
স্মৃতি শুধু ‘নথি’ নয়!
মস্তিষ্কের মেমোরি বা স্মৃতি মেকানিজম সত্যিই অদ্ভুত এবং রহস্যময়। আমাদের স্মৃতি কিন্তু নির্দিষ্ট নয়, পরিবর্তনশীল। মস্তিষ্কে তথ্য নিয়মিত পুনর্গঠন ও সংশোধন হয়। আমরা যখন কোনো ঘটনা মনে করি, তখন কিন্তু প্রায়ই সেই স্মৃতি পুরোপুরি ঠিক থাকে না। সব স্মৃতি দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষিত হয় না; মস্তিষ্ক বাছাই করে গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি রাখে। নিউরনের সংযোগ ও প্লাস্টিসিটি এতই নমনীয় যে, কখনও কখনও মুছে ফেলা স্মৃতি আবার ফিরেও আসে। শর্ট-টার্ম মেমোরি থাকে কয়েক সেকেন্ড থেকে মিনিট পর্যন্ত। লং-টার্ম থাকে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। এই স্তরভিত্তিক সংরক্ষণ প্রক্রিয়া মস্তিষ্ককে আরও অদ্ভুত ও জটিল করে তোলে।
এমআরআই-এ কতটুকু রহস্যভেদ?
ম্যাগনেটিক রেজোনেন্স ইমেজিং শক্তিশালী প্রযুক্তি। কিন্তু এটি দিয়েও মস্তিষ্কের পুরো রহস্য উন্মোচিত করা যায়নি। ফাংশনাল এমআরআই দিয়ে মস্তিষ্কের কোন অংশ কখন সক্রিয় হচ্ছে, তা নির্ধারণ করা যায়। মানুষের স্মৃতি, ভাষা, আবেগ, সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া বোঝা যায়।
মস্তিষ্কের কোন অংশ বেশি সক্রিয় তা দেখতে পারি। পেশা, অভ্যাস ও চিন্তার ধরণ অনুযায়ী পার্থক্য চিহ্নিত করা সম্ভব। তবে আমরা কী ভাবছি বা কেমন অনুভূতি হচ্ছে, তা সরাসরি জানা যায় না। নিউরনের জটিল রসায়ন ও বৈদ্যুতিক প্রক্রিয়াও পুরোপুরি দেখা যায় না। স্বপ্ন, চেতনা বা সৃজনশীল চিন্তাও সরাসরি দেখতে পাওয়া যায় না।
সুতরাং, ব্রেন এর রহস্য আজও রহস্যই। এর কূল-কিনারা পাওয়া আদৌ সম্ভব কিনা, তা আগামীই জানে।
লিখেছেন সায়ন্তী সেন