ডাঃ প্রতাপ চন্দ্র রেড্ডি: একটা সময় ছিল, যখন একজনের দেহে অন্যের হৃৎপিণ্ড বা কিডনি প্রতিস্থাপন করা এক বিস্ময়কর ব্যাপার ছিল। পৃথিবীর প্রথম সফল কিডনি প্রতিস্থাপনের ঘটনাটি ঘটে ১৯৫৪ সালে। যদিও তার পরেও অনেকদিন পর্যন্ত এই অস্ত্রোপচার ছিল বিরল। কারণ, সেই সময়ে প্রায়ই দেখা যেত গ্রহীতার দেহ প্রতিস্থাপিত কিডনি প্রত্যাখ্যান করছে। তাছাড়া চিকিৎসা পরিকাঠামোও ছিল সীমিত। কিন্তু বর্তমানে অঙ্গ প্রতিস্থাপন বা অর্গান ট্রান্সপ্লান্টেশন চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ। এর সাহায্যে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ তাঁদের জীবন ফিরে পান।
এই ক্ষেত্রে ভারতের অগ্রগতি রীতিমতো চমকপ্রদ। ২০১৩ সালে, ভারতে বছরে পাঁচ হাজারেরও কম অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা হতো। ২০২৩ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে আঠার হাজার।
প্রতিটা প্রতিস্থাপনের পিছনে রয়েছে একটি করে পুনর্জন্মের গল্প। একটা করে পরিবারের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। নতুন করে জীবনের মানে খুঁজে পাওয়ার গল্প। এই গল্পগুলো সত্যি হয়ে ওঠার পিছনে রয়েছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি, সরকারি নীতি, অঙ্গদাতা ও তাঁদের পরিবারের সহানুভূতি।
অস্ত্রোপচারের উন্নতি ও নতুন নতুন উদ্ভাবনও এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করেছে। মিনিম্যালি ইনভেসিভ পদ্ধতি, যা এক সময়ে ছিল অভাবনীয়, এখন জীবিত অঙ্গদাতাদের ক্ষেত্রে প্রচলিত প্রক্রিয়া। এর সাহায্যে অঙ্গদাতা শরীরে যৎসামান্য যন্ত্রণা ভোগ করেন এবং দ্রুত সেরে ওঠেন।
এখন দাতারা অস্ত্রোপচারের অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই বাড়ি ফিরে যেতে পারেন। অতীতে তাঁদের দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকতে হতো।
সরকারি ভূমিকার কথাও বলতেই হবে। অঙ্গ প্রতিস্থাপন একটি
অঙ্গ সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও এখন অভাবনীয় উন্নতি ঘটেছে। একটা সময় ছিল যখন সময়ের সঙ্গে লড়াই করে অঙ্গ প্রতিস্থাপন করতে হতো। কিন্তু এখন, নতুন কোল্ড স্টোরেজ প্রযুক্তি এবং এক্স ভিভো পারফিউসনের সাহায্যে অঙ্গ অনেক বেশিক্ষণ সংরক্ষণ করা সম্ভব। এইসব উদ্ভাবনের ফলে হৃৎপিণ্ড এবং অন্যান্য অঙ্গ বেশিক্ষণ সচল রাখা এবং দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে।
অঙ্গ প্রার্থীর জন্য উপযুক্ত দাতা খুঁজে পাওয়ার প্রক্রিয়াও আগের চেয়ে অনেক মসৃণ হয়েছে। এখন উন্নত এইচএলএ টাইপিং, ডিসেনসিটাইসিং প্রযুক্তি এবং দুই ভিন্ন দাতা-প্রাপক জুটির মধ্যে কিডনি বিনিময়ে মাধ্যমে এখন আলাদা ব্লাড গ্রুপের এবং ভিন্ন ইমিউন সিস্টেমের প্রাপকের দেহেও কিডনি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে। একসময় এটা ছিল অসম্ভব। আধুনিক ইমিউনোসাপ্রেস্যান্ট ওষুধের (যা শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে রাখে) সাহায্যে প্রতিস্থাপিত কিডনি প্রত্যাখ্যানের হার অনেক কমে গিয়েছে। এর ফলে রোগী সুস্থ এবং স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাচ্ছেন।
আধুনিক প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়ার ফলাফল আগের চেয়ে অনেকটাই ভালো। এখন ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় একটা প্রতিস্থাপিত কিডনি কমবেশি ১০ বছর সুস্থ থাকছে। হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস ও লিভারের প্রতিস্থাপনে সাফল্যের হারও অনেক বেশি।
২০২৩ সালে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের সংখ্যার নিরিখে ভারত পৃথিবীর মধ্যে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানে ছিল।
কিন্তু প্রতিস্থাপনের প্রকৃত প্রভাব পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। প্রতিটা সফল প্রতিস্থাপন মানুষের সহানুভূতি, বিজ্ঞানের অগ্রগতি ও নীতিগত দূরদৃষ্টির প্রকাশ। এর ফলে কিছু মানুষ তাঁদের জীবন ফিরে পান। কিছু পরিবার তাদের আশা, ভরসা, শান্তি ফিরে পায়।
ভবিষ্যতে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ব্যাপারে সচেতনতা বাড়ানো, আরও উন্নত পরিকাঠামো গড়ে তোলা এবং নতুন প্রযুক্তি অভিযোজন করার কাজে আমাদের লেগে থাকতে হবে। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে সম্ভব হলে, কোনও রোগীকে যেন একটা অঙ্গ পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে না হয়। এটাই হবে আমাদের লক্ষ্য।
অঙ্গ প্রতিস্থাপন এখন আর কোনও অলৌকিক ঘটনা নয়। এটা এখন আমাদের ব্রত। যত বেশি জীবন আমরা বাঁচাতে পারব, তত দ্রুত আমরা একটা সুস্থ, সবল, আনন্দময় ভারত গড়ার কাজে এগিয়ে যেতে থাকব।
প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, অ্যাপোলো হাসপাতাল গোষ্ঠী। (মতামত ব্যক্তিগত)


