


ফিলিপিনো মুরগির কারি
ঠাকুরবাড়ির বিশ্বনাগরিক রান্নাবান্নার এক দারুণ নিদর্শন ফিলিপিনো মুরগির কারি। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির রান্নাঘর কোনোদিনই কেবল নিজের অঞ্চলের মধ্যে বাঁধা ছিল না। ইউরোপ-এশিয়ার নানা খাবারের ছোঁয়ায় এখানে বিদেশি প্রভাব মিশে গিয়েছিল। এই রান্নাটা আলাদা করে চোখে পড়ে ফিউশন স্বাদের জন্য। বেশি ঝাল পাবেন না এতে। এই রান্নার মাধ্যমে বোঝা যায়, ঠাকুর পরিবার কীভাবে নতুন নতুন খাবার নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতে ভালোবাসত। বিদেশি রান্নার আইডিয়াকে নিজেদের দেশি কায়দায় মিশিয়ে একেবারে নতুন অথচ আপন স্বাদের পদ বানানো হত ঠাকুরবাড়ির রান্নাঘরে। রেসিপিটা বেশ সহজ। আমাদের চেনা পরিচিত উপকরণেই তৈরি বাড়িতে অনায়াসেই তৈরি করে ফেলা যায়, এ এমনই এক সুস্বাদু রান্না।
উপকরণ: ১ কেজি মুরগি (ধোয়া), ২টি পেঁয়াজ (কাটা), ১ কাপ নারকেলের দুধ, ২ টেবিল চামচ রশুন বাটা, ২-৩ টেবিল চামচ মাখন, ১ টেবিল চামচ গোলমরিচ গুঁড়ো, ২ চা চামচ ভিনিগার, নুন ও চিনি স্বাদমতো, ১টা গাজর, রান্নার জন্য তেল পরিমাণ মতো।
প্রণালী:
ম্যারিনেট: মুরগির সঙ্গে রশুন বাটা, গোলমরিচ গুঁড়ো আর নুন মেখে কমপক্ষে ১ ঘণ্টা রেখে দিন।
বেরেস্তা: কড়াইতে তেল গরম করে অল্প চিনি দিয়ে তা ক্যারামেলাইজ করুন। তাতে পেঁয়াজ কুচি দিয়ে বাদামি করে ভেজে বেরেস্তা বানান। তুলে আলাদা করে রাখুন।
মুরগি রান্না: ওই কড়াইতে ম্যারিনেট করা মুরগি দিয়ে আঁচ বাড়িয়ে ভাজুন। তারপর গাজর লম্বা ফালি করে কেটে দিয়ে দিন। পরিমাণমতো জল দিয়ে, ঢেকে মাঝারি আঁচে রান্না করুন। মুরগি নরম হওয়া এবং জল কমে না আসা পর্যন্ত।
উপকরণ যোগ: জল যখন এক-তৃতীয়াংশে কমে আসবে, তখন মাখন, নারকেলের দুধ আর অর্ধেক বেরেস্তা দিয়ে ভালো করে নাড়ুন।
শেষ ধাপ: ভিনিগার মিশিয়ে ৫-১০ মিনিট ঢিমে আঁচে ফুটিয়ে নিন। গ্রেভি ঘন হলে এবং তা মোলায়েম হয়ে এলে উপর থেকে বেরেস্তা ছড়িয়ে পরিবেশন করুন।
চাল পটল
চাল পটল ঠাকুরবাড়ির রান্নার এক বিশেষ নিরামিষ পদ। ঠাকুরবাড়ির রান্নাঘর থেকেই এই পদটি জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এটি একটি প্রাচীন বাঙালি রেসিপি, যা প্রায়ই নিরামিষ রান্নার তালিকায় দেখা যেত। এই পদের বিশেষ সুবাস ও টেক্সচার আসে গোবিন্দভোগ চাল থেকে। এটি ছোট দানার, আঠালো ও সুগন্ধি চাল, যা পটলের সঙ্গে একসঙ্গে রান্না করা হয়। এই রেসিপির উল্লেখ পাওয়া যায় প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবীর লেখা প্রায় ১০০ বছরের পুরনো রান্নার বই আমিষ ও নিরামিষ আহার (দ্বিতীয় খণ্ড)-এ। তিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাইঝি। ঠাকুরবাড়ির কিছু রান্নায় এই পদটি ছোটো, নরম করে ভাজা পটল দিয়ে তৈরি করা হয়, যা পরে চালের সঙ্গে ধীরে ধীরে ফুটতে থাকে। ফলে তৈরি হয় এক ধরনের পোলাওয়ের মতো টেক্সচার, যা এই পদের আসল আকর্ষণ।
উপকরণ: ৮-৯টি পটল (খোসা ছাড়িয়ে লম্বালম্বি কাটা), ৩/৪ কাপ গোবিন্দভোগ চাল (ধুয়ে ভিজিয়ে রাখা), ২ টেবিল চামচ কিশমিশ, ১টি টম্যাটো বাটা, ১ টেবিল চামচ আদা বাটা। গোটা গরমমশলা: লবঙ্গ, দারচিনি, তেজপাতা, এলাচ। গুঁড়ো মশলা: হলুদ, জিরে গুঁড়ো, গরমমশলা অল্প করে,৩ টেবিল চামচ তেল + ১ টেবিল চামচ ঘি, নুন ও চিনি স্বাদমতো।
প্রণালী: পটলে নুন ও হলুদ মাখিয়ে নিন। তারপর তেল ও ঘি গরম করে তা হালকা বাদামি করে ভেজে তুলে রাখুন। একই কড়াইতে এলাচ, দারচিনি, তেজপাতা ফোড়ন দিন। এরপর টম্যাটো বাটা, আদা বাটা, জিরে গুঁড়ো ও নুন দিয়ে মাঝারি আঁচে নাড়ুন। যতক্ষণ না টম্যাটোর কাঁচা গন্ধ চলে যাচ্ছে ততক্ষণ কষিয়ে নিন। এবার গোবিন্দভোগ চাল, হলুদ গুঁড়ো ও চিনি দিয়ে ৩–৪ মিনিট ভালো করে নেড়ে নিন। ১ কাপ গরম জল ঢেলে দিন। ভাজা পটল ও কিশমিশ দিয়ে ঢেকে কম আঁচে রান্না করুন, যতক্ষণ না চাল নরম হয় এবং জল শুকিয়ে যায়। নামানোর আগে উপর থেকে ঘি ও গরমমশলা গুঁড়ো ছড়িয়ে দিন। গরম গরম পরিবেশন করুন।
দুধ কাতলা
দুধ কাতলা ঠাকুরবাড়ির রান্নাঘরের এক ঐতিহ্যবাহী বাঙালি পদ। এখানে কাতলা মাছকে ফুল ক্রিম দুধের ঝোলে রান্না করা হয়। এই প্রাচীন রেসিপিটিতে সাধারণত আদার রস ও গোটা গরমমশলা ব্যবহার করা হয়। যার ফলে এর স্বাদ হয় মোলায়েম। সুগন্ধি এবং ক্রিমি টেক্সচার এই পদটির বিশেষত্ব। খাবারের প্রতি বিশেষ অনুরাগী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর সঙ্গে মিলে তিনি অনেক পদ তৈরি করেছেন ও নতুনভাবে সাজিয়ে তুলেছেন। এই পদটি অনেক জায়গায় ‘ক্ষীরোদ কাতলা’ নামেও পরিচিত। আবার কাতলার ‘হোয়াইট কারি’ বলা হয়। পদের মূল আকর্ষণ থাকে এর মোলায়েম, দুধে ভেজা ক্রিমি স্বাদ।
উপকরণ: ৪ টুকরো কাতলা মাছ, ১ কাপ দুধ, ৪ টেবিল চামচ পেঁয়াজের রস (বা পেস্ট), ২ চা চামচ আদার রস (বা পেস্ট), গোটা গরমমশলা: ২টি তেজপাতা, ১ ইঞ্চি দারচিনি, ২-৩টি এলাচ, ২টি লবঙ্গ, ঘি ও সরষের তেল, নুন ও চিনি স্বাদমতো, দেড় চা চামচ গরমমশলা গুঁড়ো।
প্রণালী: প্রস্তুতি ও ভাজা: মাছে নুন (ইচ্ছা হলে অল্প হলুদ) মাখিয়ে নিন। সরষের তেলে তা হালকা করে ভেজে সোনালি করে তুলে রাখুন।
ফোড়ন ও গ্রেভি: একই তেলে তেজপাতা, দারচিনি, এলাচ, লবঙ্গ দিয়ে ফোড়ন দিন।
মশলা ভাজা: এবার পেঁয়াজের রস ও আদার রস দিয়ে মাঝারি আঁচে ২–৩ মিনিট নাড়ুন, কাঁচা গন্ধ চলে যাওয়া পর্যন্ত।
দুধ দিয়ে রান্না: আঁচ একদম কমিয়ে দিন। ধীরে ধীরে নাড়তে নাড়তে দুধ দিন (যাতে তা ফেটে না যায়)। তারপর ভাজা মাছ দিয়ে ৫-৬ মিনিট ঢিমে আঁচে ফুটতে দিন।
শেষ ধাপ: এবার ঘন দুধ, চিনি ও লবণ দিয়ে আরও ৩-৪ মিনিট রান্না করুন, যতক্ষণ না গ্রেভি একটু ঘন হয়।
পরিবেশন: আঁচ বন্ধ করে উপর থেকে সামান্য ঘি ও গরমমশলা ছড়িয়ে দিন। গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।