নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে লেনদেনের নোটিফিকেশন এখন মোবাইলেই আসে। সেকাজের জন্যই একটি বেসরকারি ব্যাঙ্কের গুরুগ্রাম শাখা নিয়োগ করেছিল ‘থার্ড পার্টি’ সংস্থাকে। সেই কোম্পানির এক অস্থায়ী কর্মীই ব্যাঙ্কের কম্পিউটার থেকে গ্রাহকদের অ্যাকাউন্ট ডিটেইলসের ছবি তুলে পাচার করে দিয়েছিল জালিয়াতদের কাছে। তার সুবাদেই হাজার খানেক গ্রাহকের থেকে প্রতারকরা হাতিয়ে নেয় প্রায় আড়াই কোটি টাকা। ১৮ মাস ধরে চলা এই জালিয়াতির পর্দাফাঁস হয়েছিল করোনাকালে, প্রথম লকডাউনের ঠিক ছ’দিন আগে।
সেই ঘটনার পর পাঁচ বছর কেটে গিয়েছে। করোনাকালের জেরে গোটা দেশে জোয়ার এসেছে ডিজিটাল লেনদেনের। পাল্লা দিয়ে শিখরে সাইবার জালিয়াতিও। ব্যাঙ্ক ম্যানেজার সেজে ফোন থেকে ডিজিটাল অ্যারেস্ট—এসবের মাধ্যমে গত চার বছরে সাধারণ মানুষের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে প্রতারকরা হাতিয়ে নিয়েছে ৩৩ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২২ হাজার ৮১২ কোটিই শুধু ২০২৪ সালে। এমনই রিপোর্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের। ফলে মাথাব্যথা বেড়েছে গোয়েন্দাদের। তদন্তে নেমে অনলাইন প্রতারণার নেপথ্যে ব্যাঙ্কের অস্থায়ী কর্মীদেরই হাত দেখতে পাচ্ছেন তাঁরা। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার তরফে এই সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট জমা পড়েছে অমিত শাহের মন্ত্রকে। সূত্রের খবর, তাতে সরাসরি কাঠগড়ায় তোলা হয়েছে ব্যাঙ্কের আউটসোর্সিং স্টাফ ও ব্যাঙ্কে কাজের বরাত পাওয়া ‘থার্ড পার্টি’ সংস্থার কর্মীদের একাংশকে। এ যেন সর্ষের মধ্যেই ভূত!
গোয়েন্দা সংস্থার দাবি, রাষ্ট্রায়ত্ত এবং বেসরকারি সব ব্যাঙ্কই এখন আউটসোর্সিং স্টাফ (অস্থায়ী কর্মী) তথা বাইরের বিভিন্ন এজেন্সিকে দিয়ে কাজ করায়। সংশ্লিষ্ট শাখার বিভিন্ন কম্পিউটারের ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড থাকে তাঁদের কাছে। সেই অস্থায়ী কর্মীদের একাংশ ব্যাঙ্কে বসেই, কাজের অছিলায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভাণ্ডারে ‘লগ ইন’ করছে। সহজেই সংরক্ষিত নথির নাগালও পেয়ে যাচ্ছে। ওই কর্মীদের একাংশের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলেছে সাইবার জালিয়াতরা। তারপর মোটা টাকার বিনিময়ে হাতিয়ে নিচ্ছে গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট ও ফোন নম্বর সহ বিভিন্ন গোপন তথ্য। তার জেরেই বাড়ছে অনলাইন প্রতারণার রমরমা। এমনকী সাইবার অপরাধীদের ব্যবহার করা ভাড়ার অ্যাকাউন্টগুলির তথ্য দেওয়ার পরেও সেগুলির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গড়িমসি করছে ব্যাঙ্কগুলি। ব্যাঙ্ক কর্তাদের একাংশের সঙ্গে প্রতারকদের যোগসাজশের জন্যই এই ঢিলেমি বলে অভিযোগ। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার এই রিপোর্টেই চরম উদ্বেগে দিল্লির কর্তারা।
জানা গিয়েছে, হরিয়ানার নুর এতদিন ছিল সাইবার প্রতারকদের ঘাঁটি। তার পাশাপাশি এই জালিয়াতির নতুন ‘হাব’ হয়ে উঠেছে গুজরাতের সুরাত, ঝাড়খণ্ডের দেওঘর, উত্তরপ্রদেশের মথুরা, রাজস্থানের জয়পুর, আলওয়ার সহ একাধিক জায়গা। শুধু তা-ই নয়, গত চার বছরে বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট খোলার পরিমাণ হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়াও গোয়েন্দাদের নজরে এসেছে। সেগুলির সিংহভাগই ‘মিউল অ্যাকাউন্ট’ অর্থাৎ, জালিয়াতরা অন্যের নথি জমা করে খুলেছে। বিভিন্ন ব্যাঙ্কের পদস্থ কর্তাদের একাংশই একাজে সাহায্য করছে বলে অভিযোগ। সেই কারণে এমন সমস্ত কর্মীদের উপর বাড়তি নজরদারি চান গোয়েন্দারা। তাদের যাতে গোপন নথি দেখার মতো কোনও কাজ না দেওয়া হয়, সেই সুপারিশও করা হয়েছে রিপোর্টে। এরপরই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তরফে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ব্যাঙ্কগুলিকে।