নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ফলতার বাসিন্দা। কিন্তু আগে কখনও কলকাতা শহর চোখে দেখেনি ১৫ বছরের কিশোরী। তাই প্রতিবেশী গৃহবধূ যখন তাকে কলকাতা ঘোরানোর প্রস্তাব দিয়েছিল, সম্মতি জানাতে দেরি করেনি নবম শ্রেণির ছাত্রী। তখনও সে ঘুণাক্ষরে টের পায়নি, ঠিক কী অপেক্ষা করছে তার জন্য! ফলতা থেকে তাকে কলকাতার এন্টালিতে এনে এক মহিলার সঙ্গে পরিচয় করানো হয়। সেই মহিলার মাধ্যমে আড়াই লক্ষ টাকার বিনিময়ে তাকে তুলে দেওয়া হয় নারী পাচারের এক ‘মিডলম্যান’-এর হাতে। এখানেই শেষ নেয়! এন্টালির একটি ফ্ল্যাটে তাকে আটকে রেখে এক মাস ধরে ধর্ষণ করেছে সেই ‘মিডলম্যান’। ‘জিরো এফআইআর’ রুজু করে তদন্তে নামার পর তা জানতে পারে পুলিশ। ফলতার কিশোরীর খোঁজ মেলে এন্টালিতেই। তদন্তকারীরা জানতে পারেন, পুলিশ ইতিমধ্যে ধর্ষণে অভিযুক্তসহ এই কারবারে জড়িত অভিযোগে সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত জামাইষষ্ঠীর দিন। নির্যাতিতার বাবা জানান, ওই দিন বাড়ি ফিরে তিনি দেখেন, মেয়ে ঘরে নেই। কাউকে কিছু বলেও যায়নি। মেয়ের এক বান্ধবীর সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। সে জানায়, প্রতিবেশী এক গৃহবধূর সঙ্গে তাকে বেরতে দেখা গিয়েছে। সেই গৃহবধূর কাছে গেলে তিনি জানান, তাঁর স্বামী ও তিনি কলকাতায় ঘুরতে নিয়ে গিয়েছিলেন কিশোরীকে। সেখানে সে হারিয়ে গিয়েছে! এই বক্তব্যে সন্দেহ হওয়ায় ফলতা থানায় গিয়ে অভিযোগ দায়ের করেন তিনি। পুলিশ তদন্ত শুরু করে।
ওই গৃহবধূর সঙ্গে কথা বলে পুলিশ জানতে পারে, কলকাতার এন্টালিতে এক মহিলার সঙ্গে তারা যোগাযোগ করেছিল। এন্টালি থানাকে বিষয়টি জানায় ফলতা থানা। গোপন সোর্স কাজে লাগায় পুলিশ। অবশেষে এন্টালি এলাকার ৭০টি সিসি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখে রুমা মান্না নামে এক মহিলার সন্ধান মেলে। তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন তদন্তকারীরা। আদতে ফলতার জাফরপুরের বাসিন্দা রুমা পুলিশকে জানায়, নাবালিকাকে এনে কলকাতায় ‘মিডলম্যান’ কুণাল সেনের কাছে বিক্রি করেছে তারা। এন্টালিতে একটি ফ্ল্যাটে টাকার ‘ডিল’ ফাইনাল হয়েছে। সেখান থেকেই ভিন রাজ্যে নাবালিকাকে পাচার করে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পুলিশ সক্রিয় হয়েছে খবর পেয়ে গাঢাকা দেয় মিডলম্যানসহ অভিযুক্তরা। রুমার কথা মতো এন্টালির একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালায় ফলতা ও এন্টালি থানার যৌথ টিম। সপ্তাহখানেক আগে সেখান থেকেই উদ্ধার করা হয় নাবালিকাকে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ জানতে পারে, জামাই ষষ্ঠীর দিন থেকে তাকে লাগাতার ধর্ষণ করা হয়েছে। একসময় অসুস্থ হয়ে পড়ে সে। পুলিশ আরও জানতে পারে, রুমা ছাড়াও এই কারবারের সঙ্গে আরও ৬জন জড়িত। আশপাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে ও রুমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের চিহ্নিত করে পুলিশ। মঙ্গলবার রাতে রুমা সহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। লালবাজার সূত্রে খবর, ধৃতরা হল খোকন মান্না, কুণাল সেন, সুরজিৎ প্রামাণিক, স্বপ্না মান্না, রুমা মান্না, জ্যোতি মান্না, বালিকা মান্না। তাদের হেপাজতে নিয়ে পাচারের অন্যান্য সূত্র খুঁজছেন তদন্তকারীরা।