নিজস্ব প্রতিনিধি, বারাসত ও সংবাদদাতা, বনগাঁ: বৃহস্পতিবার সকালে অন্ধকার নেমে এল রাজ্যের প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষাকর্মীর পরিবারে। উত্তর ২৪ পরগনা জেলার মধ্যমগ্রাম থেকে হাবড়া, বারাসত থেকে বনগাঁ—সর্বত্র বহু স্কুলে একাধকি শিক্ষক চাকরি হারিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের রায়ে। এক রায়ের ধাক্কায় মুহূর্তে ‘প্রাক্তন’ হয়ে গিয়েছেন হাজার হাজার শিক্ষক। শিক্ষক সঙ্কট দেখা দিতে চলেছে বহু স্কুলে। এর ফলে সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কাও করছে শিক্ষামহল।
অশোকনগর বিদ্যাসাগর বাণীভবন হাইস্কুলের দু’জন শিক্ষক সৌকত সাহা এবং রুম্পা খাতুন চাকরি হারিয়েছেন। এই স্কুলের ১৪০৬ জন পড়ুয়ার জন্য ১৭ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা ছিলেন। এখন মাত্র ১৫ জনকে দিয়ে কীভাবে স্কুল চলবে, তা নিয়ে চিন্তিত প্রধান শিক্ষক মনোজ ঘোষ। তিনি বলেন, ‘ওঁদের যোগ্যতা নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই। এবার তো ক্লাস করানোটাই সমস্যার হয়ে দাঁড়াবে।’ কম্পিউটার শিক্ষক সৌকত সাহার বাড়ি বালুরঘাটের গঙ্গারামপুরে। বাবা মারা গিয়েছেন আগেই। নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান সৌকত পাঞ্জাবের টেকনিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন নিয়ে মাস্টার্স করেন। পুলিসের চাকরিও করেছেন লালবাজারের সাইবার ক্রাইম বিভাগে। স্বপ্ন ছিল স্কুলের শিক্ষক হওয়ার। এসএসসি পরীক্ষায় পাশ করে পুলিসের চাকরি ছেড়ে ২০১৮ সালে অশোকনগর বিদ্যাসাগর বাণীভবন হাইস্কুলে যোগ দেন। দমদমে বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকেন। সৌকত বললেন, ‘সিবিআই তো তদন্ত করছে। তার মধ্যেই এই রায়!’ পশ্চিম মেদিনীপুরের লালগড়ে স্কুল ইনসপেক্টর হিসেবে চাকরি করতেন অরিজিৎ মজুমদার। সেই চাকরি ছেড়ে ২০১৮ সালে তিনি এসএসসির মাধ্যমে নিয়োগ পান মধ্যমগ্রাম বয়েজ হাইস্কুলে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে তিনিও চাকরি হারিয়েছেন এদিন। উত্তর দিনাজপুরের কৃষক পরিবারের ছেলে মাসুদ আলম গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবিতে এমএ পাশ করেছেন গোল্ড মেডেল সহ। কাউন্সেলিংয়ের কিছু জটিলতার কারণে বাড়ির কাছে স্কুলে চাকরি পাননি। তিনি বাগদার কনিয়ারা যাদবচন্দ্র হাইস্কুলে শিক্ষকতা করছিলেন। তিনি ‘প্রাক্তন’ হয়ে গিয়েছেন রায়ের পরই। এই স্কুলে মাসুদের মতো চারজন শিক্ষক-শিক্ষিকা চাকরি হারিয়েছেন। এখন এই স্কুলের প্রায় ৬১০ জন ছাত্রছাত্রীর জন্য রইলেন ১৪ জন। স্বভাবতই বিপাকে পড়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। স্কুলের জীবন বিজ্ঞানের শিক্ষিকা দীপান্বিতা দাস রয়েছে চাকরি বাতিলের তালিকায়। তিনি বারাসতের হৃদয়পুর থেকে বাগদার ওই স্কুলে নিত্য যাতায়াত করেন। তালিকায় নাম রয়েছে কম্পিউটার শিক্ষক তন্ময় ঘোষ ও গণিতের শিক্ষক জয়ন্ত দাসের।
গোপালনগর শ্রীপল্লি প্রিয়নাথ হাইস্কুলের তিনজন শিক্ষকের চাকরি বাতিল হয়েছে। বৃহস্পতিবার মামলার রায় দান থাকায় তাঁরা কেউ স্কুল আসেননি। স্কুলের এক শিক্ষক বলেন, ‘আমরা সবাই মিলে একটা পরিবারের মতো ছিলাম।’ গাইঘাটা ভাড়াডাঙা হাইস্কুলের শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী মিলিয়ে চারজনের চাকরি গিয়েছে। সহকর্মীদের এভাবে চাকরি চলে যাওয়ায় বিষণ্ণতা ঘিরে ধরেছে অন্যান্য শিক্ষকদের।