Bartaman Logo
২৭ মে, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

তৈবিচড়া গ্রামে স্কন্ধনাশা দেবতার পশ্চাৎভাগের পুজো করেন মহিলারা

তৈবিচড়া গ্রামে স্কন্ধনাশা দেবতার পশ্চাৎভাগের পুজো করেন মহিলারা
  • ১৭ ডিসেম্বর, ২০২৪ ০০:০০
নিজস্ব প্রতিনিধি, বেথুয়াডহরি (তৈবিচড়া): নাকাশিপাড়া ব্লকের পাটিকাবাড়ি পঞ্চায়েতের তৈবিচড়া গ্রামের শেষ প্রান্ত। নাম পূর্বপাড়া। সেখানেই বিশাল খেতের মাঝখানে রয়েছে বড় বটগাছ। গরমকাল কিংবা শীতের অলস দুপুরে সেই বটের ছায়া, জিরোনোর জন্য আদর্শ জায়গা। তার চারিধারে বিস্তৃত প্রান্তরে চাষ হচ্ছে সর্ষে, ভুট্টা, আরও কত কী। আর সেই বটগাছের নীচে বাঁধানো বেদির উপর শুয়ে রয়েছেন জাগ্রত দেবতা স্কন্ধনাশা। বুকের উপর ভর দিয়ে উপুর হয়েই শুয়ে থাকেন তিনি। প্রতি বছর পৌষ সংক্রান্তির রাতে দেবতা পূজিত হন। উল্লেখ্যযোগ্য বিষয় হল, মুখের দিকের পরিবর্তে দেবতার পশ্চাতভাগে ধূপধুনো দিয়ে পুজো করেন মেয়েরা। হিন্দু ধর্মে এই দেবতার কথা অনেকেরই অজানা। শোনা যায়, এই দেবতা হলেন শিবের শিষ্য। যদিও বাংলায় আর কোথাও এই দেবতার অস্তিত্ব আছে কিনা তা স্পষ্ট নয়। লোক দেবতা হিসেবেই পূজিত হয়ে আসছেন বছরের পর বছর ধরে। তৈবিচাড়ার গ্রামের মানুষের কাছে দেবতার মাহাত্ম্য অনেক। 
Advertisement
গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, আগে সেই বটগাছের বেদি বাঁধানো ছিল না। পৌষ সংক্রান্তির ঠিক আগে মাটি দিয়ে কোনওরকমে দেবতার শোয়ানো মূর্তি তৈরি করা হতো। তরপর পুজোর পর বটগাছের তলাতেই থাকতেন তিনি। আবার বর্ষার বৃষ্টিতে দেবতার সেই মাটির মূর্তি ধুয়েও যেত। গ্রামের আদি বাসিন্দাদের কথায়, সেই দেবতাকে আজ অবধি মন্দিরে স্থাপন করা যায়নি। বটগাছের নীচেই দেবতার বাস।‌ তৈবিচড়া গ্রামে এই দেবতার আগমনের পিছনে পূর্ব বাংলার যোগ রয়েছে বলে দাবি গ্রামবাসীদের। কারণ, বাংলাদেশ ঢাকা জেলার কান্নামাত্তার বাসিন্দা পূর্ণচন্দ্র সরকার ও তাঁর স্ত্রী অবলারানির নাম সেই বেদিতে খোদাই করা আছে। জানা গিয়েছে, অবলারানির সন্তান হচ্ছিল না। স্বপ্নাদেশ পান, এমন পুজো করতে হবে, যেন তাঁর কাছে সকল সন্তান এসে হাজির হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি প্রথমে শিবের উপাসনা, পরে স্কন্ধনাশার পুজো শুরু করেন। ১৯৬০-৬৪ সাল নাগাদ তিনি পূর্ব বাংলা ছেড়ে পশ্চিমবাংলায় চলে আসেন। ওঠেন নাকাশিপাড়ার পাটিকাবাড়ি এলাকায়। তাঁর হাত ধরেই গ্রামে এই পুজোর শুরু। দেবতার ভোগে থাকে পাঁচরকম ফল,আতপ চাল, সন্দেশ, সুরার বোতল। সেইসঙ্গে গজাল ও জিওল মাছ পুড়িয়ে দেবতাকে ভোগ দেওয়া হয়। উল্লেখযোগ্য, দেবতাকে মন্ত্র ছাড়াই পুজো করা হয়। 
সেই নিয়েও গল্প রয়েছে। শোনা যায়, অবলারানি তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিধান দেন যে, দেবতার মুখের দিকে পুজো না করতে। কারণ দেবতার পুজোর নিয়মকানুন অনেক জটিল। সামান্য ভুলেই তিনি নাকি রুষ্ট হন। তাই মন্ত্র ছাড়াই শুধুমাত্র ধূপধুনো আর ভোগ দিয়েই স্কন্ধনাশা দেবতার পশ্চাতভাগকে পুজো করা হয়। অবলারানির পরিবারের সদস্যরা এখনও সেই গ্রামে রয়েছেন। পরিবারের সদস্যরাই এই পুজো করেন। পরিবারের বর্তমান সদস্য গোবিন্দ সরকার বলেন, ‘মেয়েরা বটগাছের ওখানে দেবতাকে পুজো দিয়েই সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি ফিরে আসেন। ফেরার সময় পিছন ফিরে তাকাতে নেই। পুজোর দিন মেয়েদের সারাদিন নিরামিশ খেয়ে থাকতে হয়। আগে মাটির ঠাকুর ছিল। প্রতিবছর বৃষ্টিতে দেবতার মূর্তি ধুয়ে যেত। বছর কুড়ি আগেই সিমেন্ট দিয়ে বেদি বাঁধিয়ে দেওয়া হয় এবং সিমেন্ট দিয়েই দেবতার মূর্তি গড়া হয়।’ গবেষক সুপ্রতিম কর্মকার বলেন, ‘এই ধরনের দেবতার পুজো সেভাবে কোথাও হয়নি। তবে পূর্ববঙ্গে এই দেবতার পুজোর প্রচলন আছে। সবাই লোক দেবতা হিসেবেই পুজো করেন।’
সম্পর্কিত সংবাদ