Bartaman Logo
২৭ মে, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

লক্ষ্যবস্তু জ্বালানি ক্ষেত্র

“এ কেবল দিনে রাত্রে/ জল ঢেলে ফুটা পাত্রে/ বৃথা চেষ্টা তৃষ্ণা মিটাবারে”!

লক্ষ্যবস্তু জ্বালানি ক্ষেত্র
  • ২৭ মে, ২০২৬ ০৪:০০

“এ কেবল দিনে রাত্রে/ জল ঢেলে ফুটা পাত্রে/ বৃথা চেষ্টা তৃষ্ণা মিটাবারে”! শতাধিক বর্ষ পূর্বে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন তাঁর ‘প্রতিনিধি’ কবিতায়। কথাগুলি আজ অন্য প্রসঙ্গে ভীষণ প্রাসঙ্গিক। মনে হয় যেন আজকের সমস্যাসংকুল জীবনের কথাই তিনি অগ্রিম বলে গিয়েছেন এই ছত্রে। ভোগবাদী সমাজে চাহিদার শেষ নেই। আর সেই চাহিদা পূরণের তাগিদে মানুষ সর্বক্ষণ ছুটে বেড়াচ্ছে, কাজ করছে। এর ভালো মন্দ দুটি দিকই আছে। সে আলোচনার পরিসর ভিন্ন। মানুষের সীমাহীন চাহিদা পূরণের তাগিদই রকমারি জীবিকার সৃষ্টি করেছে। মানুষের জীবন-জীবিকা স্বাভাবিক রাখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সুষ্ঠুভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য গণতান্ত্রিক দেশের মানুষ প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গড়ে। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো হিসাবে ভারতে নির্বাচিত সরকার থাকে কেন্দ্রের পাশাপাশি রাজ্যগুলিতেও। সেই অর্থে অর্ধ শতকের ভিতরে এবারই প্রথম ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার পেয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। অর্থাৎ কেন্দ্রে এবং রাজ্যে একই দলের (বিজেপি) সরকার গদিয়ান। তাই এই স্বাভাবিক প্রত্যাশা জেগেছে যে, বাংলার মানুষ এবার সত্যিই ভালো থাকবে। গত কয়েক দশকের দৈনন্দিন সমস্যা দূর হবে ধীরে ধীরে। 

Advertisement

ভোট মিটেছে এবং রাজ্যে সরকার বদল হয়েছে সপ্তাহ কয়েক আগে। আর অমনি বেড়ে চলেছে তেল ও গ্যাসের দাম। এই বৃদ্ধি তাও অনেকদিন বাদে একবার নয়। বাড়ল মাত্র ১১ দিনের ভিতরে চারবার! সোমবার সকাল থেকেই পেট্রল পাম্পগুলিতে নতুন সংশোধিত বর্ধিত মূল্য কার্যকর করা হয়েছে। পেট্রলের দাম লিটার প্রতি ২ টাকা ৬১ পয়সা বেড়েছে। ডিজেলের দাম বেড়েছে প্রতি লিটারে ২ টাকা ৭১ পয়সা। মাত্র ১১ দিনের ব্যবধানে পরপর চারবার মূল্যবৃদ্ধির ফলে চলতি মাসের শুরুর তুলনায় নাগরিকদের এখন প্রতি লিটার জ্বালানির জন্য প্রায় ৮ টাকা অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে। খনিজ তেলের দামে ওঠানামার দিকটি কয়েকবছর আগে বাজারের হাতেই ছেড়ে দিয়েছে কেন্দ্র। তার ফলে এটাই নিয়ম হওয়ার কথা যে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে ভারতের বাজারে পেট্রল ও ডিজেলের দাম বাড়বে। তেলের দাম হ্রাসের ব্যাপারটিও হবে বিপরীত নিয়মে। কিন্তু নাগরিককে এই নিয়মের সুবিধা কমই দেওয়া হয়। যখন রাশিয়ার থেকে বেশ সস্তা দরে তেল কিনেছে সরকার তখনও দেশবাসী সস্তায় পেট্রল ডিজেল কেনার সুবিধা পায়নি। বস্তুত কেন্দ্রীয় নীতির সুবাদে দেশীয় তেল কোম্পানিগুলি গত দশ-বারো বছরে ফুলেফেঁপে উঠেছে। নাগরিকদের দাবির প্রতি কেন্দ্র কর্ণপাত করেনি। অন্যদিকে, পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধপরিস্থিতিতে তেলসহ পেট্রপণ্য মহার্ঘ হতেই কান্নাকাটি জুড়ে দিয়েছে তেল সংস্থাগুলি। তাদের দাবি, অবিলম্বে তেলের দাম না বাড়ালে তারা নাকি মারাই পড়ে যাবে, ইত্যাদি! অমনি মোদি সরকারও সুবোধ বালকের মতো দফায় দফায় তেল ও গ্যাসের দাম বাড়িয়ে যাচ্ছে। রুগ্‌ণ অর্থব্যবস্থার অধীনে সাধারণ মানুষ এই দাম মেটাবে কোত্থেকে? ভেবেই দেখা হচ্ছে না। আরো পরিতাপের বিষয় হল, মোদি সরকার ফের আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির বিপরীত আচরণ করছে! ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিবাদ মিটে গিয়ে শান্তির সম্ভাবনা উজ্জ্বল হতেই আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দাম কমতে শুরু করেছে। মিলছে স্বস্তির বার্তা। ঠিক তখনই, সোমবার ভারতের তেল সংস্থাগুলি বিস্ময়করভাবে পেট্রল-ডিজেলের দাম বাড়িয়ে দিল আরো একদফা! অর্থাৎ দামবৃদ্ধির বহর ১১ দিনে চারবার।
সোমবারের অঙ্কটা যথেষ্ট বেশি। পেট্রলে লিটার পিছু ২.৬১ টাকা এবং ডিজেলে ২.৭১ টাকা। জানুয়ারি-মার্চ, তিনমাসে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানিগুলি ১৯,৪৭০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। অন্তত কংগ্রেসের দাবি এমনটাই। ওইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীকে তাদের প্রশ্ন, এই মুনাফার কোনো লাভ আম জনতা পাবে না কেন? নরেন্দ্র মোদিকে ‘মেহেঙ্গাই মানব’ বলে কটাক্ষ করলেন রাহুল গান্ধী। এই প্রশ্নে খড়্গহস্ত কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গেও। এভাবে ভোট মিটতেই পেট্রল, ডিজেলের লাগাতার দামবৃদ্ধিকে যথার্থই ‘ডাকাতি’ বলেছেন তিনি। তাঁর দাবি, ইউপিএর ২০০৪-১৪ সালের জমানায়  আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ১৭৫.৩৪ শতাংশ বেড়েছিল। মোদির আমলে বৃদ্ধি অনেক কম (পেট্রলে ৪৩.০১ শতাংশ এবং ডিজেলে ৬৭.৮৭ শতাংশ)। তার ফলে গত ১২ বছরে মোদি সরকার শুধু খনিজ তেল বাণিজ্যেই ৪৩ লক্ষ কোটি টাকা ‘লুট’ করেছে! এত বড়ো দেশ চালাতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন অবশ্যই। কিন্তু তার জন্য রাজস্ব উৎসের বিকেন্দ্রিকরণই কাম্য। মোদি সরকার সেই পথে না হেঁটে একবগ্গা মতো লক্ষ্যবস্তু করে তুলেছে কেবল খনিজ তেল বা জ্বালানিকেই। সরকারের রাজস্বের সীমাহীন চাহিদা মেটাতে নাভিশ্বাস উঠে গিয়েছে জ্বালানি ক্ষেত্রের। সরকারের এই দৃষ্টিভঙ্গির বদল না-হলে সুরাহা মিলবে না ‘ট্রিপল ইঞ্জিনেও’। অগ্নিমূল্য তেলের গুঁতোয় বারোটা বাজবে দেশীয় অর্থনীতির। বাংলাও তার বাইরে থাকবে না। 

সম্পর্কিত সংবাদ