Bartaman Logo
২৭ মে, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

শতবর্ষ পরেও বিভেদ ভোলানোর কারিগর তিনিই

প্রায় একশো বছর আগে, বিশ্বকবির ‘১৪০০ সাল’ কবিতা পড়ে একই নামে একটি কবিতা লিখেছিলেন বিদ্রোহী কবি।

শতবর্ষ পরেও বিভেদ ভোলানোর কারিগর তিনিই
  • ২৬ মে, ২০২৬ ০৪:০০

ড. সায়ন্তন মজুমদার: প্রায় একশো বছর আগে, বিশ্বকবির ‘১৪০০ সাল’ কবিতা পড়ে একই নামে একটি কবিতা লিখেছিলেন বিদ্রোহী কবি। রবীন্দ্র কবিতাটির ধ্রুবপদের কিঞ্চিৎ পরিবর্তন করে তিনি লিখেছিলেন, ‘আজি হতে শতবর্ষ আগে’। আজ ঠিক একশো বছর পিছিয়ে আমরা চলে যাব ১৯২৬ সালে। শুধুমাত্র ‘অগ্নিবীণা’ বাদনে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা নয়, ‘শেষ সওগাত’ কাব্যভুক্ত ‘চির-বিদ্রোহী’ কবিতারও কবি ছিলেন নজরুল। তাঁর জীবনে বছরটি কেমন কেটেছিল—জানব সেটাই।

Advertisement

ছাব্বিশের জানুয়ারি থেকেই নজরুল হয়ে গিয়েছিলেন কৃষ্ণনগরী অর্থাৎ কৃষ্ণনগরবাসী। কয়েকদিনের মধ্যেই ময়মনসিংহের উদ্দেশে তিনি লিখে পাঠান একটি পত্রভাষণ। অসুস্থতার দরুন কৃষক শ্রমিক সম্মেলনে তিনি যেতে পারেননি। সেখানে রয়েছে শ্রমজীবীদের জাগরণের জন্য ফেরেশতা বা দেবদূতের আবির্ভাবের ঘোষণা। কবির ঐকান্তিক ইচ্ছা চাষির লাঙল-মজুরের শাবল সেই ফেরেশতার অস্ত্র, শোষিতদের কুটির বসতঘর, নিপীড়িতদের মলিন বস্ত্র হোক তাঁর জয়ধ্বজা।
ফেব্রুয়ারি মাসে কৃষ্ণনগরে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় কৃষক ও শ্রমিক দলের অধিবেশনে সমবেত কণ্ঠে পরিবেশিত হয় তাঁর লেখা ‘কৃষাণের গান’ ও ‘শ্রমিকের গান’। রাজনৈতিক মঞ্চে রাজনৈতিক সংগীত এ হেন কয়ারের ভঙ্গিতে পরিবেশনের প্রবর্তক সম্ভবত তিনিই। এই সুরের ধারা বহন করে মার্চে ফরিদপুর মাদারিপুরের নিখিল বঙ্গীয় ও অসম প্রদেশীয় মৎস্যজীবী সম্মেলনের উদ্বোধনী সংগীতরূপে তিনি পরিবেশন করেন ‘ধীবরদের গান’—‘শোন রে ও ভাই জেলে/এবার উঠব রে সব ঠেলে!’
চৈত্র মাসে প্রকাশিত হয় ছোটোদের কবিতার প্রথম সংকলন তথা কাজী সাহেবের নবম কাব্য ‘ঝিঙে ফুল’। এতেই ছিল আমাদের হারানো ছেলেবেলায় পড়া ‘কাঠবেড়ালি! কাঠবেড়ালি! পেয়ারা তুমি খাও?’ ছত্র। কুমিল্লার ছোট্ট কন্যা জটুকে (কবি ডাকতেন জটায়ু পক্ষী নামে) কাঠবিড়ালির সঙ্গে কথা বলতে দেখে লেখেন কবিতাটি। সেই হল খুকি। সেই সৃষ্টির ‘রাঙাদিদি’ অন্য কেউ নন—ছিলেন নজরুলের স্ত্রী প্রমীলা দেবী। আরও একটি বিখ্যাত চৈতালি সৃষ্টি হল ‘সর্বহারা’ কবিতা। সেই নামেই সেবছর কার্তিক মাসে প্রকাশিত হয় ‘সর্বহারা’ কাব্য। আবার এপ্রিলেই বন্ধ হয়ে যায় স্বপরিচালিত ‘লাঙল’ পত্রিকা। 
১৯২৬ সালের উগ্র সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে নজরুলের অবস্থান আজ শতক পেরিয়েও আমাদের ‘পথের দিশা’ দেখাতে পারে। জন্মমাস মে বা জ্যৈষ্ঠতে কৃষ্ণনগর প্রাদেশিক সম্মেলনে তিনি গেয়েছিলেন স্বরচিত ‘কাণ্ডারি হুঁশিয়ার!’ সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামার অভিঘাতে রচিত এই কবিতা রচনার ঠিক আগের দিন ৫ জ্যৈষ্ঠ লিখেছিলেন বিখ্যাত ‘ছাত্রদলের গান’।
প্রয়াণমাস আগস্টের ১২ তারিখে ‘লাঙল’ পত্রিকা রূপান্তরিত রূপে কবির সম্পাদনায় ‘গণবাণী’ নামে প্রকাশিত হয়। ভাদ্রে মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে ৯ এবং ১৬ তারিখে প্রকাশিত সেই পত্রিকায় লেখেন দুটি অনবদ্য গদ্য ‘মন্দির ও মসজিদ’ এবং ‘হিন্দু-মুসলমান’। প্রথমটির শুরুই হয়েছে উভয় সম্প্রদায়ের কতিপয় দাঙ্গাপিপাসুদের উক্তি দিয়ে—‘মারো শালা যবনদের! মারো শালা কাফেরদের!’ কিন্তু দাঙ্গাশেষের চিত্র পরিবেশনকালে দেখা যাচ্ছে কেউ আর ‘আল্লা মিয়া বা কালী ঠাকুরানীর’ নাম নিচ্ছে না। সকলের মুখে একটাই আর্তনাদ—‘বাবা গো! মা গো!’ নজরুলের অমর লেখনিরবে আমরা শুনি সেই জাতীয় ধ্বনি ‘মাতৃপরিত্যক্ত দুটি বিভিন্ন ধর্মের শিশু যেমন করিয়া এক স্বরে কাঁদিয়া তাহাদের মাকে ডাকে!’ কিন্তু তাদের কান্নায় মসজিদ টলে না, মন্দিরের পাষাণ প্রতিমা সাড়া দেন না।
নিবন্ধকার সকল মানুষকে এক আকাশের গম্বুজতলে সম্মেলনের কারিগররূপে রুদ্রের আগমনি ঘোষণা করেন। তাঁর মতে, সকল মানুষের দেবতা উপাসনালয়ে মোল্লা-পুরুত-পাদরি-ভিক্ষুর নাম ও বেশ ধরে থাকা প্রহরীদের হাতে বন্দি হয়ে রয়েছেন। মানুষের নিগ্রহকারীকে তাঁর জংলি-বর্বর পশুশিকারির মতো মনে হয়েছে।
দাঙ্গাকারী দুই দলের নেতাকে তিনি শয়তান বলেই ঠাওরেছেন। সেই ইবলিশ বা শয়তানই টিকি রেখে মুসলমানকে, দাড়ি রেখে হিন্দুকে খ্যাপায়, আবার গোরা সিপাই হয়ে হিন্দুমুসলমানের বুকে গুলি চালাতে দু’বার ভাবে না। তার জন্যই মানুষের হাতে তৈরি ইটে যে ভজনালয় তৈরি হয়, তার দুটো ইট খসেছে বলে উভয় সম্প্রদায়ের দু’শো মাথা ধড় হতে খসে পড়ে। তবুও নিবন্ধশেষে আত্মবলীয়ান নজরুল নিজে শুনেছিলেন এবং সকলকেও শুনিয়েছিলেন স্রষ্টার সিংহাসনপানে প্রতিধ্বনিত মসজিদের আজান ও মন্দিরের শঙ্খধ্বনিকে, যাতে সারা আকাশ খুশি হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয় আলোচ্য ‘হিন্দু-মুসলমান’ প্রবন্ধের শুরুতেই কবিগুরুর সঙ্গে চিরবিদ্রোহী কবির একদিনের আলোচনার কথা রয়েছে। জ্বলন্ত সেই সাম্প্রদায়িক সমস্যা প্রসঙ্গে পরম স্নেহভাজন কাজীকে গুরুদেব বলেছিলেন, ‘দ্যাখো, যে ন্যাজ বাইরের, তাকে কাটা যায়, কিন্তু ভিতরের ন্যাজকে কাটবে কে?’
নজরুল মনে করেছিলেন সেই লেজের উদ্ভবভূমি ‘টিকিপুর’ ও ‘দাড়িস্তান’। তাঁর মতে পণ্ডিত্ব ও মোল্লাত্ব-র প্রতীক এই দুই ত্ব-মার্কা চুলের গোছা নিয়েই আজ এত চোলাচুলি। এগুলো না থাকলেই নারায়ণের গদা এবং আল্লাহের তরবারির মারকাটারি বাঁধবে না। ঈশ্বরকে নিয়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মারামারি প্রসঙ্গে নজরুল একটি বাল্যস্মৃতির উদাহরণ দিয়েছেন। পাড়ায় পাড়ায় রেষারেষি থেকে ছোটোবেলায় তারা কোন পাড়ার সূর্য কখন ওঠে তাই নিয়ে কোন্দল করতেন। এদিকে সূর্য যে একমেবাদ্বিতীয়ম্ সেই বোধ তখন তাদের ছিল না।
এরপর বিতর্কের পূর্ণ অবতারণা করে নজরুল ভূ-ভারতের সেই কোন্দলের অলিখিত বিচারকর্তা আবদুর রহিম কিংবা মদনমোহন মালব্যের নাম নিয়ে ফেলেছেন। ডুবন্ত মানুষকে বাঁচানোর সময় তার ধর্মপরিচয়ের চেতনা চলে আসলে মানুষে-পশুতে পার্থক্য থাকে না। অত বছর আগে, এক অদ্ভুত হতাশা যেন নজরুলকেও গ্রাস করেছিল ‘মানুষ কি এমনই অন্ধ হবে যে, সুনীতিবাবু হয়ে উঠবেন হিন্দুসভার সেক্রেটারি এবং মুজিবুর রহমান সাহেব হবেন তঞ্জিম তবলিগের প্রেসিডেন্ট?’ প্রবন্ধের শেষে তাই শঙ্কাপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকালে তিনি লিখেছেন—পশুর খসে যাওয়া ন্যাজ বা লেজ মানুষের মাথায় গজিয়ে যাচ্ছে। তার ওষুধও তিনি বাৎলে দিয়েছিলেন ৯ আশ্বিনে লেখা ‘হিন্দু-মুসলিম যুদ্ধ’ কবিতায়—‘ল্যাজে তোর যদি লেগেছে আগুন, স্বর্ণলঙ্কা পুড়া’। তাঁর উদ্দিষ্ট ছিল বহিঃশত্রু অর্থাৎ ইংরেজরা।
কাজী সাহেবের নিদান দেওয়া মৃতসঞ্জীবনী সেই মহৌষধির বাঙালির আজ বড়োই...বড্ড বেশি প্রয়োজন।
আলোচ্য বছরটিতে নজরুলের জীবনভূমি ও কাব্যভুবনে কিছু নতুন ফসল উৎপন্ন হয়। ৯ সেপ্টেম্বর বুলবুলের মাধ্যমে তিনি দ্বিতীয়বার সাময়িক পুত্রসুখ লাভ করেন। যা তাঁকে মহান করেছিল, তারই মাহাত্ম্যসূচক ‘দারিদ্র্য’ কবিতা ঠিক সেই সময়েরই রচনা। ওই সময়েই প্রকাশিত হয় তাঁর তৃতীয় প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘দুর্দিনের যাত্রী’।
কয়েক বছর পরে পুত্রের নামেই প্রথম গানের বইয়ের নামকরণ করেছিলেন তিনি। সেই বইতেই ছিল ‘আসে বসন্ত ফুলবনে’, ‘বাগিচায় বুলবুলি তুই’, ‘নিশি ভোর হল’ গান। এর মধ্যে নজরুলের লেখা প্রথম গজল গান কোনটি, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ১৯২৬-এর শেষ দিকে কলকাতায় অনুষ্ঠিত মিশরের বিখ্যাত শিল্পী মিস ফরিদার উর্দু গজল শোনার পরোক্ষ প্রভাবে প্রথমটির রচনা হওয়া সম্ভব। সেটি ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের পৌষ মাসের ‘সওগাত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। শেষ গানটি নাকি কয়েকজন হিন্দুস্তানি ভিক্ষুকের উর্দু গজল শোনার কয়েক মিনিটের মধ্যে কবি লিখে ফেলেন।
কিন্তু কবিতার অসিঝংকারের বদলে গানের বাঁশি ধরাতে সমালোচকের বিষকথা পান করতে হয় নজরুলকে। জ্যৈষ্ঠ ও আশ্বিনের ‘কালিকলম’ পত্রিকায় ‘মাধবী-প্রলাপ’ ও ‘অ-নামিকা’ নামে কবিতা লেখেন তিনি। ‘বিদ্রোহী’বিরোধী ‘শনিবারের চিঠি’ পত্রিকা প্রথম কবিতার প্রতি অশ্লীলতার অভিযোগ জানান থানায়! সজনীকান্ত দাস আবার এক কাঠি এগিয়ে গাজী আব্বাস বিটকেল ছদ্মনামে দ্বিতীয় কবিতাটির অনুসারিকা বা প্যারোডিরূপে ‘অঙ্গুঠ’ কবিতা লেখেন।
২০২৬ ও ১৯২৬ দুটিই নির্বাচনের বছর। আর কাজী সাহেব দাঁড়িয়েছিলেন সেই নির্বাচনে। বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার উচ্চ পরিষদীয় নির্বাচনে পূর্ববঙ্গ হতে প্রার্থী হন তিনি। নির্বাচনের উপযোগী জনবল ও অর্থবল তাঁর ছিল না। বিধানচন্দ্র রায়ের কাছ থেকে তিনশো টাকা পেয়েছিলেন। অন্তরঙ্গজন মুজফফর আহমেদ বাধা দিলেও শোনেননি। তাঁকে ইসলামবিরোধী কাফেররূপে প্রচার করা হচ্ছিল। ধর্মগুরু বাদশা পীর নজরুলের অনুকূলে শংসাপত্র ও ভোটদানের বিবৃতি দিলেও, শেষ পর্যন্ত তিনি পরাজিত হন।
তবে পূর্ববঙ্গে ভোটের প্রচারকার্যেও মহাবিদ্রোহী কবি প্রমাণ রেখেছেন যে আখেরে তিনি একজন সৌন্দর্যপিয়াসী, নিসর্গসন্দর্শক কবিই। সেই সময় জয়দেবপুরে এক জ্যোৎস্নারাতের ফুটফুটে জোছনায় আলোড়িত হন তিনি। আরবি- ফারসি- ইংরেজি- তৎসম শব্দভাণ্ডারে জ্যোতির্বিজ্ঞান, ভারতীয় পুরাণ, আরব্যরজনী, ইরানি উপকথা মিলিয়ে বাংলায় এক তিলোত্তমা কাব্যমূর্তি সৃজিত হয় তাঁর হাতে। গগনের নীল গাঙে, জোছনা সোনায় রাঙা, তারাদের মজলিসে এক আকাশপ্রিয়া যেন উড়ে চলেছে। নবমীর চাঁদের সসার বা রেকাবিতে তার জন্য আনা হয়েছে চাঁদনি শিরাজী পানীয়। ‘চাঁদনিরাতে’ কবিতায়, পরিবেশিকা সাকীর প্রতি আনমনা নজরুল রেখেছেন মধুর আবেদন—‘আনমনা সাকি! অমনি আমারও হৃদয়-পেয়ালা-কোণে/কলঙ্ক-ফুল আনমনে সখী লিখো মুছো ক্ষণে ক্ষণে!’
লেখক প্রাবন্ধিক ও গবেষক (মতামত ব্যক্তিগত)

সম্পর্কিত সংবাদ