Bartaman Logo
২৭ মে, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

টাকার পতন, মূল্যবৃদ্ধি ধাক্কাই নয়! বিকাশ হচ্ছে

সালটা ছিল ২০১৩। নরেন্দ্র মোদি তখন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী। আমেদাবাদ থেকে হায়দরাবাদ—প্রত্যেক ভাষণে দেশের অর্থনীতি নিয়ে ইউপিএ সরকারকে আছোলা ‘উপহার’ দিয়ে চলেছেন তিনি।

টাকার পতন, মূল্যবৃদ্ধি ধাক্কাই নয়! বিকাশ হচ্ছে
  • ২৬ মে, ২০২৬ ০৪:০০

শান্তনু দত্তগুপ্ত: সালটা ছিল ২০১৩। নরেন্দ্র মোদি তখন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী। আমেদাবাদ থেকে হায়দরাবাদ—প্রত্যেক ভাষণে দেশের অর্থনীতি নিয়ে ইউপিএ সরকারকে আছোলা ‘উপহার’ দিয়ে চলেছেন তিনি। নিশানায় ঘুরেফিরে এসেছে শুধুই ডলারের দাম। গুছিয়ে একটি কটাক্ষ করেছিলেন মোদিজি। বলেছিলেন, ডলারের বিনিময়ে টাকার দাম নাকি আমাদের তৎকালীন অর্থমন্ত্রীর বয়সের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাড়ছে। তখন ভারতের অর্থমন্ত্রী ছিলেন পি চিদম্বরম। তাঁর বয়স ওই বছর ছিল ৬৭ বছর। আর টাকার দাম? ঘোরাফেরা করছিল ৬৪ থেকে ৬৮’র মধ্যে। 

Advertisement

সুষমা স্বরাজ সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ভারতীয় টাকা শুধুমাত্র মুদ্রা নয়। একটি প্রতিষ্ঠান। ঐতিহ্য। পতন যদি এভাবেই অব্যাহত থাকে, তার জবাবদিহি সরকারকে করতে হবে। অর্থমন্ত্রী নয়, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে সংসদে দাঁড়িয়ে অর্থনীতির এই দুরবস্থার দায় স্বীকার করতে হবে।
আমাদের মতো সাধারণ ভারতীয়দের স্মৃতিশক্তি বড়োই দুর্বল। বিরোধী বেঞ্চে বসে বিজেপির প্রথম সারির নেতা-নেত্রীদের এইসব মন্তব্য কিছুতেই আর মনে পড়ছে না। তখন যা ছিল প্রতিষ্ঠানিক অপরাধ, আজ সেটাই গা সওয়া হয়ে গিয়েছে। তখন ডলারের দাম ৬৫ টাকা পেরিয়ে যাওয়ায় একটি সরকারের পতন ঘটিয়ে দিয়েছিলাম আমরা। আর আজ সেই টাকারই দাম ৯৭ টাকা ছুঁয়ে ফেলার পরও মনে হচ্ছে, এ তো হতেই পারে। পশ্চিম এশিয়ায় ‘যুদ্দু’ চলছে যে! আমরা ভুলে যাচ্ছি, যুদ্ধ এই ক’দিন আগে লেগেছে। তার আগেই ৩০ টাকা বেড়ে গিয়েছে ডলারের বিনিময়মূল্য। কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার আগে মোদিজি বলেছিলেন, ‘আমিও প্রশাসন চালাই। এটা হতে পারে না। টাকার দর এভাবে পড়তে পারে না। বাংলাদেশে পড়ছে না, পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কায় না। শুধু ভারতে। এর পিছনে নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতিগ্রস্ত না হলে টাকার পতন এভাবে হয় না।’ মনমোহন সিং সরকারকে রাস্তায় নামিয়ে আনার পণ করেছিলেন তিনি। আজ আমরা কিন্তু মোদিজিকে আরও একটু সময় দেওয়ার পক্ষে। এই তো মাত্র ১২ বছর হয়েছে। আর একটু দেখি না! মাত্র ৯৭ টাকাই তো হয়েছে ডলার! আর একটু বাড়ুক। ২০১৩ সালে অপরিশোধিত জ্বালানির দাম ১১৭ ডলার ছুঁয়ে ফেলেছিল। চলতি বছরও ছুঁয়েছে। ফারাক হল, তখন কলকাতায় পেট্রলের দাম ৮০ টাকা ছাড়ায়নি। আর এখন ১১৩ টাকা পার করেছে। মনমোহন জমানার শেষ পর্বে রান্নার গ্যাসের দাম ছিল ৪১০ টাকা। আর এখন সিলিন্ডার পিছু প্রায় হাজার টাকা। আমাদের কাছে ওই দিনটা অস্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এটা স্বাভাবিক। ভাবটা এমন, আঃ হা! সরকারের কীই বা করার আছে? দাম তো বাড়াতেই হবে। না হলে বিকাশ হবে কীভাবে? স্পেস টেকনোলজিতে রাস্তা, পেট্রলের মধ্যে ইথানলের মিশ্রণ সত্ত্বেও দাম না কমা, জন্মেই মাথাপিছু ৫ লক্ষ টাকার ঋণ, বাড়তে থাকা আত্মহত্যা...। না, না এগুলো বিকাশ নয়। কো-ল্যাটারাল ড্যামেজ। দেশের জন্য দশটা ভালো করতে গেলে দু’-তিনটে স্যাক্রিফাইস করতেই হয়। কারা করবে? কেন? আমরা! তখন না হয় ৩০-৪০ টাকা কেজি দরে চাল কিনতাম। এখন ৬০-৭০ টাকায় কিনছি। এটাই স্যাক্রিফাইস। ওষুধের দাম ২০০ শতাংশ বেড়ে গিয়েছে। তাতে কী? মানিয়ে নিতে হবে! এমআইএস থেকে পিপিএফ, সবেরই সুদের হার কমে গিয়েছে। অবসর নেওয়ার পরও গতর খাটাতে হচ্ছে প্রবীণ নাগরিকদের... স্রেফ বেঁচে থাকার জন্য। এটাও কো-ল্যাটারাল ড্যামেজ। আমরা আছি। সরকারের পাশে আছি। বিজেপি সরকারের পাশে। সত্যিই তো, একটু তেলের দাম বাড়লে কীই বা আসে যায়? গাড়ি তো চড়ে বড়োলোকরা। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের তাতে কী? হ্যাঁ, চাষিভাইদের খানিক ডিজেল লাগে ঠিকই। তাঁরা ছুটছেন পাম্পে লাইন দিতে। ১০ লিটার চেয়ে পাঁচ লিটার পাচ্ছেন। বেশি টাকা দিলেও ভবি, মানে পেট্রল পাম্প ভুলছে না। কারণ তেলের সাপ্লাইটাই যে নেই। সেই কারণে দেরি হচ্ছে পণ্য পরিবহণেও। তেলের আশায় পণ্যবাহী ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকছে সার বেঁধে। ট্যাঙ্কার ঢুকলে পড়ছে লাইন। ততক্ষণে হয়তো ১৮ ঘণ্টা কেটে গিয়েছে। ড্রাইভার-খালাসিদের একদিনের অতিরিক্ত পারিশ্রমিক আর খাই খরচ জুড়ে যাচ্ছে বিলের সঙ্গে। আর ডিজেলের বাড়তি দাম তো রয়েছেই। ফল? মূল্যবৃদ্ধি। চাল, ডাল, ভোজ্য তেল, সাবান-শ্যাম্পু, আলু-পেঁয়াজ... সবকিছুর। তার একটা বড়ো অংশ আবার অর্থনীতির ভাষায় এফএমসিজি। ফাস্ট মুভিং কনজিউমার গুডস। সাবান-টুথপেস্ট ছাড়াও এই তালিকায় রয়েছে প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, ডিটারজেন্ট, কসমেটিকস, সফট ড্রিঙ্কস। ছ’মাস আগে আমরা এইসব জিনিসপত্র কিনতে যত টাকা খরচ করেছি, চলতি মাসে সেই অঙ্কটা অনেকটা বেড়ে গিয়েছে। নিশ্চুপে। একে কি মূল্যবৃদ্ধি বলা চলে? না, এটা অসহায়তা। মনমোহন জমানায় ব্যর্থতা ছিল। এখনকার সরকার চেষ্টা করছে। পারছে না। বিশ্বজুড়ে অস্থিরতার জন্য। সোনার দাম তখন ২৭ হাজার টাকা ছিল, এখন প্রায় দেড় লক্ষ টাকা। তখন ছিল প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতি। আর এখন চেষ্টা। না হলে দু’লক্ষ হয়ে যেত হয়তো। 
এই তো বিজেপি ভোটের আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, জিতে এলেই বাংলায় সাড়ে চারশো টাকায় রান্নার গ্যাস পাওয়া যাবে। পেট্রলের উপর রাজ্যের কর ১০ টাকা কমিয়ে দেওয়া হবে। সেই সুবিধাও আপাতত 
মিলছে না। নিশ্চয়ই কারণ কিছু আছে। চেষ্টা তারা করছে। কিন্তু পেরে উঠছে না। যুদ্ধ-টুদ্ধ মিটে গেলে ঠিক হয়ে যাবে। একটু সময় তো দিতেই হবে তাদের। সেটা আমাদের কর্তব্য। আমাদের সেই মতোই তৈরি থাকতে হবে। বুঝে নিতে হবে, মূল্যবৃদ্ধির হার আরও বাড়বে। পণ্য পরিবহণের খরচ বেড়ে গেলে কোম্পানি নিশ্চয়ই সেই টাকা নিজেদের পকেট থেকে দেবে না। ওটা আমরাই দেব। সারের দাম বাড়বে। সেই ভরতুকি সরকার দেবে না। কৃষক দেবে। বিদেশ থেকে বহু পণ্য আমাদের প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলিকে আমদানি 
করতে হয়। যাকে বলে কাঁচামাল। সেই সবই ডলার দিয়ে কিনতে হয় তাদের। ফলে ৬৪ টাকা ডলারের দাম হলে পণ্যের দাম যা হত, ৯৬ টাকা ডলারের ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই তা হবে না। ১০০ টাকার প্রোডাকশন কস্ট বেড়ে ১৩০ টাকা হবেই। তাই দামও বাড়বে। এই অতিরিক্ত খরচ কে দেবে? আমরা। মোদি সরকারের পাশে দাঁড়াতে। বিকাশের জন্য। 
মুদির দোকান থেকে শেয়ারবাজার, সর্বত্র আজ বিকাশ দাঁড়িয়ে আছে। আশ্বাসের হাত তুলে। নিশ্চিন্ত থাকুন। সময় বদলাচ্ছে। সময় বদলাবে। আপনারা আরও ভালো আছেন। বুঝতে পারছেন না। একটু সবুর করুন। বিরোধী-সমালোচক-নিন্দুকের চোখে নয়, ভক্তের চোখে দেখুন। সাফল্য ছাড়া আর কিছু দেখতে পাবেন না। কতটা খারাপ আছে, সেটা ভাববেন না। বরং দেখুন, আরও কতটা খারাপ থাকতে পারতেন। মোদিজি আপনাদের রক্ষা করেছেন। বিকাশ হচ্ছে। অনুপ্রবেশকারীদের পুশব্যাক করা হচ্ছে। বিদেশিরা কোনো নাগরিক সুবিধা ‘চুরি’ করে নিচ্ছে না। এটাই তো সব কা সাথ, সব কা বিকাশ। আমরাও এটাই বিশ্বাস করি। মনমোহন সিং ভুল ছিলেন। ২০০৮ থেকে ২০১৩, বিশ্বমন্দার আঁচ তিনি ভারতের উপর পড়তে দেননি বলে প্রচার চালানো হয়। কী করেছিলেন তিনি? পরিকাঠামো খাতে বিপুল বৃদ্ধি! ১ লক্ষ ৮৬ হাজার কোটি টাকার রেকর্ড ফিস্কাল স্টিমুলাস ঘোষণা! রেপো রেট অর্ধেক করে ঋণ নেওয়ায় উৎসাহ দেওয়া! কী হয়েছিল তাতে? কর্পোরেট সেক্টরে টাকার জোগান বেড়েছিল, পরিকাঠামো খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধিতে রাস্তাঘাট-সেতু তৈরি হয়েছিল। কাজ পেয়েছিল মানুষ। তাদের হাতেও টাকা এসেছিল। বিদেশি বিনিয়োগ ভারতের বাজার ছেড়ে যায়নি। ২০১৩ সালে দেশের শেয়ারবাজারে এফপিআই বা ফরেন পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্ট ছিল ২ লক্ষ ১০ হাজার কোটি টাকার। কারণ, বিনিয়োগকারীরা ভরসা রেখেছিলেন মনমোহন সিংয়ের উপর। ফলে অর্থনীতি ধসে পড়েনি। কিন্তু এসব তো পুরানো টোটকা। আমাদের সরকার নোট বাতিল করেছে। জিএসটি চালু করেছে। লকডাউন করেছে। সেই সময় মানুষকে খয়রাতি দেয়নি, লোনের ব্যবস্থা করেছে। সহজ সুদে। এই জমানায় আজ ২ লক্ষ ২০ হাজার কোটি টাকার রেকর্ড অর্থ তুলে নিয়েছেন বিদেশি লগ্নিকারীরা। প্রায় ১৫ শতাংশ। এগুলো নতুন। বিকাশের ধ্বনি আলোড়িত হয়েছে আকাশে-বাতাসে। আমরাও বিশ্বাস করেছি, ভালো আছি। এর থেকে ভালো ছিলাম না। পদ থাকলেও চাকরি নেই, বেতন থাকলেও সঞ্চয় নেই, খিদে থাকলেও বাজার নেই... এগুলো সামান্য ঘটনা। আসল কথা, আমরা ভালো আছি। বিজেপি এই আপ্তবাক্য আমাদের মাথায় ঢুকিয়ে দিতে পেরেছে সাফল্যের সঙ্গে। রেজিমেন্টেড পার্টি তারা। তাদের প্রত্যেকটা পদক্ষেপের পিছনে দূরের লক্ষ্য থাকে। আর থাকে তৃণমূল স্তরে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের নিরলস পাবলিক রিলেশন। ঘরে ঘরে। শ্রেণি ধরে ধরে। প্রত্যেক সুযোগে তাদের এজেন্ডা সাধারণ মানুষের মাথায় পুরে দিতে পারে গেরুয়া সংগঠনের ছোটো-বড়ো নেতারা। এটাই সাফল্য। এটাই বিকাশ। আমরা কয়েকদিন বেশি দামে নিত্যপণ্য কিনব। সোনার দিকে তাকাব না। গাড়ি কম চড়ব। ওয়ার্ক ফ্রম হোম করব। সরকারের জন্য এতটুকু তো আমরা করতেই পারি। নাগরিক হিসাবে আমাদের কর্তব্য। মোদিজি বলেছেন ইলেকট্রিক গাড়ি বেশি চালাতে। তাই আমরা দেখব, রাস্তায় ইভি বেড়েছে। বিশেষত সরকারি ক্ষেত্রে। ইলেকট্রিক গাড়ি বিক্রির বাজার যতটা বাড়বে বলে সরকার ভেবেছিল, এতদিনে তা পূরণ হওয়ার পথে এগবে। সাফল্য এটাই। বিকাশ এটাই। বাকি? ওই যে বললাম, কো-ল্যাটারাল ড্যামেজ। 

সম্পর্কিত সংবাদ