


২০২১ সালে গোটা বিধানসভা নির্বাচন পর্বে পশ্চিমবঙ্গে মাত্র ১৫ জন অফিসারকে বদলি করেছিল কমিশন। অন্যদিকে, ভোটমুখী বাংলায় সাম্প্রতিক ১৭ দিনে সরানো হয়েছে ৪৮৩ জন অফিসারকে! এটাকে তফাত না বলে এক অভূতপূর্ব বৈপরীত্যই মানতে হবে। আর এখানেই প্রশ্ন, কেন? ভারতের সংবিধান বদলে যায়নি; পালটে যায়নি জাতীয় নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) নিয়মাবলি কিংবা দিকনির্দেশ। তাহলে কমিশনের এই ভূমিকাকে স্বাভাবিক ধরে নেওয়া হবে কোন যুক্তিতে? নির্বাচন কমিশন একটি স্বশাসিত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। এই সংস্থার দায়িত্ব লোকসভা এবং বিধানসভাগুলির নির্বাচন স্বচ্ছতার নীতিতে সম্পন্ন করা। এই নীতি শুধুমাত্র ভোটগ্রহণ এবং গণনার দিন আঁকড়ে থাকলে চলে না, ভোটার তালিকা প্রস্তুত থেকে মনোনয়নপত্র বিচার, নির্বাচনি প্রচার এবং নির্বাচনোত্তর কিছুদিনেও ইসিআইয়ের সক্রিয়তা কাম্য। বিশেষ করে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় কমিশনের অনবদ্য ভূমিকা প্রতিটি শান্তিকামী নাগরিকের চাহিদা। বলা বাহুল্য, কমিশনের সক্রিয়তা যেন অতিসক্রিয়তায় পর্যবসিত না-হয়, এবং কমিশনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নাতীত হওয়া সবসময় জরুরি। সোজা কথায়, কমিশনের ভূমিকায় বৃহত্তম গণতন্ত্র যেন সত্যিকার উত্তরণের পথ খুঁজে পায়। আমরা যেন ভুলে না যাই যে, ভারতের গণতন্ত্র পশ্চিমাদের চোখে আজও ইলেক্টোরাল অটোক্রেসির অধিক গুরুত্ব পায় না।
এই বদনাম ঘোচাবার জন্য পূর্ণ স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষতার নীতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠান ভীষণ জরুরি। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রশ্নবাণে জর্জরিত। ইসিআইয়ের তড়িঘড়ি এসআইআর শুধু রকমারি ত্রুটি রেখে যাচ্ছে না, বেনজির অশান্তিরও জন্ম দিয়েছে। অতএব স্বেচ্ছাচারী ইসিআই এবারের নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরুর আগেই বহু মানুষের কাছে ‘ভিলেন’ চিহ্নিত হয়ে গিয়েছে। সংস্থাটির পক্ষে এই ভাবমূর্তি থেকে বেরোনো এখন কঠিন। তার মধ্যে নির্বাচিত রাজ্য সরকারের ভূমিকাকে পদে পদে নস্যাৎ করার মানসিকতা সংস্থাটিকে বিজেপি বা মোদি সরকারের ‘দালাল’ ভাবাতে সাহায্য করেছে বহু নিরপেক্ষ মানুষকে। সাম্প্রতিক অতীতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার প্রশাসন পরিচালনায় যতগুলি পদক্ষেপ করেছে তার বেশিরভাগই খারিজ করে দিয়ে কমিশন কোন বার্তা দিল? এই সরকার যতই কোটি কোটি মানুষের পছন্দের হোক না কেন, তাদের কাজকর্ম সুবিধার নয়! যেমন কমিশনেরই নির্দেশ মেনে, নির্বাচন ঘোষণার কিছুদিন আগে পর্যন্ত নবান্ন একগুচ্ছ অফিসারকে অদলবদল করেছিল। এই বদলি প্রক্রিয়া আরম্ভ হয়েছিল এসআইআর শুরুর আগে। ওই দফায় রাজ্য সরকার অন্তত ১,৩৭০ জন অফিসারকে বদলি করেছিল। তাঁদের মধ্যে ৯৭ জন আমলা, ১৪৬ জন বড়ো মাপের পুলিশকর্তা এবং রাজ্য প্রশাসনের ১,১২৭ জন অফিসার। সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধা থাকলে মমতার প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তকে কমিশনের মেনে নেওয়া উচিত ছিল। আরো উচিত ছিল রাজ্য সরকারকে সাধুবাদ জানানো, কেননা তাতে সমন্বয়ের ভিত্তিতে কমিশনেরই কাজে বাড়তি সুবিধা হত। পরিবর্তে অনাবশ্যক অসূয়া মনোভাব প্রদর্শনে পারদর্শিতা দেখাতে তৎপর হল জ্ঞানেশ কুমারের কমিশন!
কমিশন কি এই ভয় পাচ্ছে যে, তাতে ভোটের ফলাফল ২০২১ সালকে অনুসরণ করতে পারে? আর কে না জানে, একুশের পুনরাবৃত্তি মানে বিজেপির স্বপ্নভঙ্গের কাহিনি আরো একবার লিখিত হওয়া? তাই নিন্দুকেরা বলাবলি করছেন, শাসক মোদিবাবুর শেষ ইচ্ছা পূরণ করার গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিয়েই আসরে অবতীর্ণ জ্ঞানেশবাবু! এই ভাষায় দুয়ো দেওয়ার জন্য ভোটমুখী পাঁচ রাজ্যের ছবিটারই পাশে রাখছেন তাঁরা বাংলার বেনজির খতিয়ানকে। ভোটমুখী পাঁচ রাজ্যে ইসিআই বদলি করেছে মোট ৫০৬ জন অফিসারকে। সেখানে শুধু বাংলা থেকেই ৪৮৩ জন! এই ছবির একটাই মানে, টার্গেট বাংলা!