নিজস্ব প্রতিনিধি, তমলুক: এক সময় তাম্রলিপ্ত রাজ পরিবারের রাজকুমারীরা দেবীবরণ করতেন। পুজোর প্রধান দায়িত্ব সামলাতেন রানিমা। সেখানে পুরুষ প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। ১৫০০ বছর পেরিয়ে তাম্রলিপ্ত রাজ পরিবারের সেই দুর্গাপুজো আজ সর্বজনীন। রাজ পরিবারে চৌহদ্দি ছেড়ে গত ১৭ বছর ধরে পুজো হচ্ছে ঐতিহাসিক রাজবাড়ির ময়দানে। রাজ পরিবারের সন্তান তথা পুরসভার চেয়ারম্যান দীপেন্দ্রনারায়ণ রায়ের হাত ধরেই পুজো আজ সর্বজনীন। আদি তাম্রলিপ্ত সর্বজনীন পুজো কমিটির ব্যানারে এই পুজোয় মিশে রয়েছে নানা ইতিহাস আর ঐতিহ্য। বিগ বাজেটের চোখ ধাঁধানো থিম না থাকলেও ইতিহাসের ছোঁয়া এই পুজোর মূল আকর্ষণ। আপামর তমলুকবাসীর আবেগ জড়িয়ে রয়েছে এই পুজোর সঙ্গে। বিগত কয়েক বছর ধরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ওই পুজোর উদ্বোধন করছেন। জেলাশাসক, পুলিস সুপারের উপস্থিতিতে জেলার মধ্যে উদ্বোধনের মূল অনুষ্ঠানটি এখানেই হয়। এবারও মুখ্যমন্ত্রীই পুজোর উদ্বোধন করবেন বলে দীপেন্দ্রনারায়ণবাবু জানিয়েছেন। তাম্রলিপ্ত রাজ পরিবার সুপ্রাচীন। ষষ্ঠ শতকে এই পরিবারের রাজকুমারীরা দেবীবরণ করতেন। ‘দশকুমার চরিত’ গ্রন্থে তাম্রলিপ্ত রাজ পরিবারের দুর্গাপুজোর বিবরণ রয়েছে। স্বাধীনতা পূর্ব সময়ে এই রাজবাড়ি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন থেকে অসহযোগ আন্দোলন, সবেতেই রাজবাড়ির ভূমিকা ছিল সক্রিয়। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন রাজা সুরেন্দ্রনারায়ণ রায়। এক সময়ে প্রাণ বাঁচাতে হুগলির কাছারি বাড়িতে আত্মগোপন করতে হয়েছিল। যে কারণে তাম্রলিপ্ত রাজবাড়ির পুজোর ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ে। কয়েকবছর পর আবারও রাজবাড়িতে পুজো শুরু হয়। তাম্রলিপ্ত রাজবাড়ি আজ নিজেই এক ইতিহাস। তাই ঐতিহাসিক কারণেই আজও পুজোর নানা রীতি চালু। পুজোর সময়ে রাজবাড়ি থেকে শালগ্রাম শিলা পুজো মণ্ডপে আনা হয়। সেখানে পুজো করা হয়। অতীতে রাজাদের আমলে পুজোর সময় অস্ত্রপুজো হতো। সেই রীতি মেনে এখন ষষ্ঠীর দিন রাজ পরিবার থেকে তরোয়াল, তিনটি পাঁঠা এবং নৈবেদ্য বর্গভীমা মায়ের মন্দিরে যায়। সেখানে রাজ পরিবারের নামে অস্ত্রপুজো হয়। সপ্তমী, সন্ধি ও নবমী পুজোতে মায়ের মন্দিরে রাজ পরিবার থেকে দেওয়া একটি করে পাঁঠা বলি দেওয়া হয়। গত ১৭ বছর ধরে রাজবাড়ির ময়দানে পুজো হচ্ছে। পুজো উপলক্ষ্যে বড় মেলা বসে। অঞ্জলি দেওয়ার সময় প্রায় ৪০টি ব্যাচ হয়। প্রচুর দর্শনার্থী আসেন। তাঁদের সকলের সুবিধার কথা মাথায় রেখেই মণ্ডপ চত্বর বড় করা হয়েছে। নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে গোটা এলাকা সিসি ক্যামেরায় মোড়া থাকে। পুলিসের পাশাপাশি স্বেচ্ছসেবকরাও থাকেন ভিড় নিয়ন্ত্রণে। এই মুহূর্তে পুজোর প্রস্তুতি তুঙ্গে। মণ্ডপের পাশেই অনুষ্ঠান মঞ্চ বাঁধা হচ্ছে। সেখানে পুজোর দিনগুলিতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। আটচালা প্রতিমা এখানকার বৈশিষ্ট্য। মুখ্যমন্ত্রী থেকে রাজ্যপাল সহ অনেক ভিআইপি পুজোয় শুভেচ্ছাবার্তা পাঠান। এবারও জোরকদমে মণ্ডপসজ্জার কাজ চলছে। পুজো উপলক্ষ্যে সপ্তাহব্যাপী নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান রয়েছে। স্থানীয় শিল্পীদের পাশাপাশি অতিথি শিল্পীরাও অনুষ্ঠান করবেন। ইতিহাস আর ঐতিহ্য মিশে রয়েছে আদি তাম্রলিপ্ত সর্বজনীন পুজোয়। রাজ পরিবারের বর্তমান সদস্য দীপেন্দ্রনারায়ণ রায় বলেন, ১৭ বছর ধরে সর্বজনীন হিসেবে রাজবাড়ির মাঠে এই পুজো হচ্ছে। বিপুল মানুষের সমাগম হয়। বড় মেলা বসে। এবারও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরই পুজোর উদ্বোধন করার কথা। সেইমতো চূড়ান্ত প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।



