অনেকটা যেন অ্যাকশন রিপ্লে। ১৯৮৩ সালের একদিনের বিশ্বকাপ ফাইনালে ভারতের স্বল্প রানের জবাব দিতে সামনে থেকে ক্যাচ তোলেন প্রবল প্রতিপক্ষ ওয়েস্ট ইন্ডিজের ভিভিয়ান রিচার্ডস। অনেকটা পিছনের দিকে দৌড়ে সেই ক্যাচ তালুবন্দি করেন ভারতের অধিনায়ক কপিলদেব। ইতিহাস বলছে, সেই ক্যাচেই ম্যাচের রং বদলে চ্যাম্পিয়ন করেছিল কপিলের ভারতকে। রবিবার মাঝরাতে নবী মুম্বইয়ের ডি ওয়াই পাতিল স্টেডিয়ামে ভারতের মহিলা ক্রিকেট দলের প্রথম বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে সেই ইতিহাসই যেন ফিরে এল হরমনপ্রীত কাউরের হাত ধরে। দক্ষিণ আফ্রিকার শেষ জুটির অন্যতম ব্যাটার ডি ক্লার্কের ক্যাচ তখন আকাশ থেকে দ্রুত বিমান অবতরণের মতো মাটিতে আছড়ে পড়ার অপেক্ষায়। ভারত অধিনায়ক হরমনপ্রীতকে দেখা গেল, অসামান্য ক্ষিপ্রতায় সামান্য পিছন দিকে দৌড়ে শরীরটাকে শূন্যে ভাসিয়ে বলটা মুঠোবন্দি করে ডানামেলা পাখির মতো দৌড়তে শুরু করলেন। এর আগে ২০০৫ ও ২০১৭ সালে দু’বার ফাইনালে উঠেও স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা নিয়ে ফিরতে হয়েছিল ভারতকে। আর এই ৪৫ দিনের বিশ্বযুদ্ধে রূপকথা তৈরির স্বপ্ন নিয়ে জান লাগিয়ে দিয়েছিলেন ভারতের সোনার মেয়েরা। গ্রুপ লিগের খেলায় তিনটি ম্যাচে হেরে গেলেও স্বপ্নকে হারিয়ে যেতে দেননি তাঁরা। অবশেষে রবিবারের রাতে ভারতের অধিনায়কের মুঠোবন্দি ম্যাচের সঙ্গে বিশ্বকাপটাও পেয়ে গিয়েছে ভারত। এবারের বিশ্বকাপে স্বপ্নের রং আক্ষরিক অর্থেই নীল। ভারতের কিংবদন্তি ক্রিকেটার শচীন তেণ্ডুলকর যথার্থই বলেছেন, ১৯৮৩ একটা গোটা জাতিকে স্বপ্ন দেখার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। এই বিশ্বকাপ জয় দেখে হাতে ব্যাট তুলে নেওয়ার স্বপ্ন দেখবে অসংখ্য তরুণী। সত্যিই আজ গোটা ভারতবাসী গর্বিত, কুর্নিশ তাঁদের।
সন্দেহ নেই, এই বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে রবিবার রাতে ১৪০ কোটি দেশবাসী ডুবে ছিল। মহিলাদের ক্রিকেট খেলাকে হেয় প্রতিপন্ন করার মানসিকতা এই পুরুষশাসিত সমাজের একাংশের মধ্যে আজও একটা পরিচিত ছবি। হরমন, স্মৃতি, দীপ্তিদের সাফল্য সেই মানসিকতায় কিছুটা হলেও পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা যায়। শুধু ক্রিকেট বা অন্যান্য খেলা নয়, যুদ্ধবিমান চালানো থেকে অসংগঠিত ক্ষেত্রের কঠোর কায়িক পরিশ্রমের কাজে মেয়েরা এখন পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে। যদিও প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই বৈষম্য এখনও চূড়ান্ত মাত্রায় চোখে পড়ে। তবু একথা মেয়েরা বারবার প্রমাণ করে চলেছে যে, উপযুক্ত সুযোগ ও সহযোগিতা পেলে তারাও পিছিয়ে থাকবে না। তার প্রমাণও অজস্র। মাত্র কিছুদিন আগেই ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর সময় ভারতীয় সেনার দুই মহিলা অফিসারের বীরগাথার কথা জেনেছে দেশবাসী। মহিলা বিশ্বকাপ জয়ের কারিগরদের সাফল্যের পিছনেও রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন লড়াইয়ের কাহিনি। প্রমাণ হয়েছে টিম ওয়ার্কের সাফল্য।
ভারতের মতো দেশে দেখা যায়, মহিলা হলেও ক্রীড়া জগতে টিকে থাকতে হলে হাজারও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে লড়াই চালাতে হয়। মহিলারা যেহেতু অনেকক্ষেত্রে অনেক বেশি কোণঠাসা, তাই তাদের লড়াইও অনেক বেশি কঠিন। এর সঙ্গেই আছে, মহিলা ক্রীড়াবিদ তুলে আনার ক্ষেত্রে পরিকাঠামোর নিদারুণ অভাব ও সরকারের কিছু নেতিবাচক মনোভাব। তবু তার মধ্যেই জন্ম নিচ্ছে রিচা, আমনজোৎ, রাধা, শেফালিরা। এঁরাই আসলে নারী শক্তির উত্থানের বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। শুধু তাঁরা নন, এমন আরও কেউ কেউ ভারতের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। তাঁরা প্রত্যেকেই ভারতের কৃতী সন্তান। যেমন, অনূর্ধ্ব ২৩ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে মহিলাদের বিভাগগুলিতে আমেরিকা, জাপানের মতো দেশকে পিছনে ফেলে দিয়েছে ভারতের মেয়েরা। এই মুহূর্তে বাহরিনে চলছে এশিয়ান ইউথ গেমস। সেখানেও ভারতের মহিলাদের সাফল্য নজরকাড়া। কয়েকমাস আগে মহিলা দাবার বিশ্বকাপ ফাইনালে চ্যাম্পিয়ন ও রানার্স দু’জনেই ভারতের খেলোয়াড়। গত মাসে বক্সিং, বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে চারটে মেডেলের সবক’টি পেয়েছেন মহিলা খেলোয়াড়রা। দিন কয়েক আগে ব্যাডমিন্টনের এশিয়া চ্যাম্পিয়নশিপে অনূর্ধ্ব পনেরো ও সতেরো বিভাগের সিঙ্গলস-এ সোনা জিতেছে মহিলারা। অন্য এক প্রতিযোগিতায় দশ মিটার এয়ার পিস্তল শুটিংয়েও সোনা জিতেছে মহিলা খেলোয়াড়। এমন উদাহরণ বহু, যেখানে মুষ্টিমেয় কিছু মহিলা ক্রীড়াবিদের নাছোড় লড়াই ও চোখ ধাঁধানো সাফল্যের হাত ধরে উঠে আসছে ভারতের নাম। কিন্তু প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও হাজার হাজার মহিলার সামনে দরজা আজও বন্ধ। ঐতিহাসিক জয়ের পর হরমনপ্রীত বলেছেন, ‘এটা শেষ নয়, শুরু’। দেশের বহু মানুষ মনে করেন, এই জয় যেমন হাজার হাজার মেয়েকে মাঠে টেনে আনার প্রেরণা হিসেবে কাজ করতে পারে, তেমনই এই জয় শাসকগোষ্ঠীর চোখ খুলে দিয়ে মহিলাদের আরও এগিয়ে আসতে পথ করে দেবে। এভাবেই নারীশক্তির পূর্ণ বিকাশ সম্ভব। আসলে বহু বছরের ‘অভিশাপ’ কাটিয়ে বিশ্বকাপজয়ী এই প্রমীলা ব্রিগেড প্রমাণ করে দিল, সাফল্যের কোনও লিঙ্গ বিচার হয় না। যাঁরা এখনও মহিলাদের গৃহবন্দি করে রাখতে চান, রাতে বাইরে বেরনো নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তাঁদেরও মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। বিধিনিষেধের বেড়াজাল ভাঙার বার্তা দিয়ে সেই মধ্যরাতেই বিশ্বজয়ের পতাকা উড়িয়ে মহিলা ক্রিকেটাররা প্রমাণ করে দিলেন ‘অর্ধেক আকাশে’র বিচরণ আজ বিশ্বজুড়ে।