সুমন তেওয়ারি, আসানসোল: কেমন শহর দেখতে চায় শিশুরা? পুরসভার কাছে তাদের চাহিদাই বা কেমন? কোনওভাবে কি তারা অপমান বা নির্যাতনের শিকার? এসব জানতে শিশুদের মুখোমুখি হবেন আসানসোলের মেয়র ও চেয়ারম্যানরা। লক্ষ্য একটাই, এ শহরকে শিশুদের বাসযোগ্য করে তোলা। যার মধ্যে রাজনীতির কোনও গন্ধ থাকবে না। ভোট প্রাপ্তির অঙ্ক কষা থাকবে না। শুধু থাকবে পুরসভার কিছু কাজকর্মকে শিশু-বান্ধব করে তোলা। তাই, শিশুদের মন-জানালা খুলে দেখতে চায় পুর-কর্তৃপক্ষ। আর এর জন্য ‘টক টু মেয়র’ কর্মসূচি আনছে আসানসোল পুরসভা।
পুরসভার এমন অভিনব উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন শহরবাসী। প্রশংসায় পঞ্চমুখ সমাজ বিজ্ঞানীরাও। তাঁরা বলছেন, ‘সত্যিই খুব ভালো পরিকল্পনা। কারণ, আজকে যে শিশু, কাল তিনি দেশের নাগরিক। ভালো নাগরিক হওয়ার পাঠ শৈশবেই দেওয়া উচিত। এই পৃথিবীকে ওদের বাসযোগ্য করতে হলে ওদের সঙ্গে নিয়েই করতে হবে। ওদের মনের কথা জানতে হবে। তবেই দেশের ভবিষ্যৎ-ভিত মজবুত হবে। সন্দেহ নেই পুরসভার এটা সাধু প্রয়াস।’ শহরের অভিভাবকরাও পুরসভার এই উদ্যোগে খুশি। আসানসোল জেলা হাসপাতালের সাইক্রিয়াটিস্ট কৌশিক পাল বলছিলেন, ‘বহু ক্ষেত্রে সমাজ কিংবা সংসারে নানা ঘটনায় ট্রমার মধ্যে পড়ে যায় শিশুরা। তখন তারা কারও সঙ্গে খোলাখুলি কথা বললে স্বস্তিবোধ করে। সেক্ষেত্রে পুরসভা এগিয়ে এলে এর চেয়ে ভালো কিছু হতে পারে না। শিশুদের মানসিক বিকাশেও এই উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়।’
এমন প্রয়াসের সলতে পাকানোর কাজ শুরু অবশ্য অনেক আগে থেকেই। বর্তমানে সেই ভাবনাকে পরিকল্পনার আকারে এনেছেন আসানসোল পুরসভার মেয়র বিধান উপাধ্যায়। তিনি বলছিলেন, ‘আমাদের শহরের ১০৬টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬০ টি ওয়ার্ডে চাইল্ড প্রোটেকশন ইউনিট আগে থেকেই সক্রিয়। বাকি ওয়ার্ডগুলিতে দ্রুত তা করার জন্য কাউন্সিলারদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে নতুন বহু ভাবনা রয়েছে। যা শহরের উন্নয়ন, শহরের সৌন্দর্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। আমরা ঠিক করেছি, একটি নির্দিষ্ট নম্বর থাকবে। যার মাধ্যমে শিশুরা আমাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারবে।’
আসানসোল, জামুড়িয়া, রানিগঞ্জ, কুলটি চারটি পুরসভা নিয়ে গড়ে উঠেছে আসানসোল কর্পোরেশন। রাজ্যের পশ্চিম প্রান্তের এই পুর এলাকা বহু জাতি, সম্প্রদায় ও বহু ভাষাভাষীর মানুষ বাস করেন। শিল্পাঞ্চল হলেও বহু এলাকাতেই শিক্ষার অভাব রয়েছে। বহু ক্ষেত্রে শিশুরা অত্যচারের মুখোমুখি হয়। নাবালিকার বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয় প্রশাসনের অজান্তে। কখনও আবার কারখানা, ইট ভাটায় দেখা যায় শিশুশ্রমিক। এইসব রোধ করতে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে চাইল্ড প্রোটেকশন ইউনিট কাজ করছে। তার সুফলও মেলা শুরু করেছে। কিন্তু এখানেই থেমে যেতে চান না পুর আধিকারিকরা।
শিশুদের সামগ্রিক বিকাশের কথা মাথায় রেখে গত সপ্তাহেই মেয়র একটি বৈঠক ডাকেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন সব কাউন্সিলার। ছিলেন পুরসভার ডেপুটি মেয়র ওয়াশিমূল হক, চেয়ারম্যান অমরনাথ চট্টোপাধ্যায় সহ একাধিক পুর আধিকারিক। উপস্থিত ছিলেন পশ্চিম বর্ধমান জেলা চাইল্ড প্রোটেকশন ইউনিটের সদস্যরাও। বৈঠকে ডেপুটি মেয়র ওয়াশিমূল হক প্রস্তাব দেন, ‘আমাদের শহরের প্রতিটি জনবহুল এলাকায় একটি করে বেস্ট ফিডিং রুম করতে হবে। যেখানে শিশুরা স্বাচ্ছন্দ্যে মাতৃদুগ্ধ পান করতে পারে। চাইল্ড প্রোটেকশনের জন্য কী কী সরকারি নিয়ম রয়েছে, তা জনবহুল এলাকায় তুলে ধরতে হবে।’ চেয়ারম্যান অমরনাথ চট্টোপাধ্যায় জানান, প্রতিটি ওয়ার্ডে কাউন্সিলারদের এলাকার চাইল্ড প্রোটেকশন কমিটিকে সক্রিয় রাখতে হবে। আইসিডিএস সেন্টারগুলির শিশুরা ঠিক মতো পুষ্টিযুক্ত খাবার পাচ্ছে কিনা, তা লক্ষ্য রাখতে হবে। এরই পাশাপাশি, জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে কাউন্সিলারদের শিশু-বান্ধব শহর গড়তে কী কী দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে হবে, তা তুলে ধরা হয়। তখনই প্রস্তাব দেওয়া হয়, প্রতিটি ওয়ার্ডে যে কমিউনিটি হল রয়েছে, সেখানে চাইল্ড কর্নার গড়া যেতে পারে। তারপরই টুক টু মেয়র নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন বিধান উপাধ্যায়।