Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

তালিবান প্রোটোকল ভারতের সংস্কৃতি হতে পারে না

পোডিয়ামের পিছনের দেওয়ালে পরিচিত একটা ছবি। মানে, পেইন্টিং। আফগান উপত্যকায় বামিয়ান বুদ্ধর। বিশ্বের বৃহত্তম বুদ্ধমূর্তি। যদিও বাস্তব নয়, অতীত। ২০০১ সালে এই তালিবানি ধ্বংসলীলারই শিকার। অথচ, সেই বামিয়ান বুদ্ধই শোভা পাচ্ছেন আমির খান মুত্তাকির সাংবাদিক সম্মেলনের মঞ্চের পিছনে। কে তিনি?

তালিবান প্রোটোকল ভারতের সংস্কৃতি হতে পারে না
  • ১৪ অক্টোবর, ২০২৫ ১৯:১০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: পোডিয়ামের পিছনের দেওয়ালে পরিচিত একটা ছবি। মানে, পেইন্টিং। আফগান উপত্যকায় বামিয়ান বুদ্ধর। বিশ্বের বৃহত্তম বুদ্ধমূর্তি। যদিও বাস্তব নয়, অতীত। ২০০১ সালে এই তালিবানি ধ্বংসলীলারই শিকার। অথচ, সেই বামিয়ান বুদ্ধই শোভা পাচ্ছেন আমির খান মুত্তাকির সাংবাদিক সম্মেলনের মঞ্চের পিছনে। কে তিনি? আফগানিস্তানের তালিবান সরকারের বিদেশমন্ত্রী। আরও একটা পরিচয় আছে তাঁর-কান্দাহার বিমান হাইজ্যাকের সময় তিনিই ছিলেন আফগানিস্তানের শিক্ষা ও তথ্য-সংস্কৃতি মন্ত্রী। প্রত্যেকটা ঘা দগদগে। সেই হাইজ্যাক, বিজেপি সরকারের আত্মসমর্পণ, মাসুদ আজহারের মতো জঙ্গির মুক্তি, তার জেরে একের পর এক জঙ্গি হানা... তাও তালিবান মন্ত্রী ছ’দিনের ভারত সফরে। রাজধানীর বুকে বসে তাঁর সাংবাদিক সম্মেলন। আফগান দূতাবাসেই। পোডিয়ামের সামনে রাখা সারি সারি চেয়ার। আর তাতে বসে সাংবাদিকরা। এই সাংবাদিক শব্দটির কোনও লিঙ্গভেদ হয়? অর্থাৎ, যেমন অভিনেতা-অভিনেত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা... সাংবাদিকের লিঙ্গ বোঝানোর জন্য কি সাংবাদিকা বা তেমন কোনও শব্দ? না হয় না। কারণ, এই পেশাটাই সেই জাতে পড়ে, যার কোনও জাত নেই। লিঙ্গও নেই। দুনিয়াভর মহিলারা কারগিল থেকে গাজা যুদ্ধ কভার করতে যাচ্ছে, কখনও জঙ্গি নেতার ইন্টারভিউ নিচ্ছে, কখনও বাজেট বিশ্লেষণ করছে, আবার কখনও খুন-ধর্ষণের খবর। কিন্তু ১০ অক্টোবর, ২০২৫ সালের চিত্রটা কেমন যেন বেসুরো ঠেকল। কারণ, আমির খান মুত্তাকির সাংবাদিক সম্মেলনে সবাই পুরুষ। কোনও মহিলা সাংবাদিকের কাছে আমন্ত্রণপত্র পৌঁছায়নি। প্রত্যেক নারীর পথ সেদিন আফগান দূতাবাসের দরজায় এসে শেষ হয়ে গিয়েছে। তাঁরা বাইরে দাঁড়িয়ে থেকেছেন, প্রশ্ন করেছেন... আর হ্যাঁ, আচরণ করেছেন ঠিক পেশাদার সাংবাদিকের মতো। তাঁরা জানতেন, তালিবান অভিধানে নারী স্বাধীনতা বা অধিকার বলে কিছু নেই। কিন্তু তাজ্জব হওয়ার মতো বিষয় হল, ওই ঘরে উপস্থিত একজনও এ নিয়ে প্রশ্ন করলেন না। কেন? প্রশ্নটা কি ব্যক্তিগত হয়ে যেত? নাকি কূটনীতি-বিরুদ্ধ? আফগানিস্তানের তালিবান সরকার শরিয়তি আইন মেনে চলে। সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত প্রত্যেক পুরুষ তা জানতেন। তাঁরা কি তা মেনেও চলেন? ওই মুহূর্তে তাঁরা কি ভুলে গিয়েছিলেন যে, ভারতের ঐক্য, সংস্কৃতির ভিত শুধু এই ‘অধিকার’। জাতপাত, ধর্ম, লিঙ্গ নির্বিশেষে অধিকার। স্বাধীনতা। গণতন্ত্র। সাংবাদিকরা না হয় সামান্য চাকুরে। মহামান্য ভারত সরকার কি তা ভুলে গিয়েছিল? তারা কি অনুরোধ করতে পারত না যে, এটা ঠিক হচ্ছে না। মহিলা-পুরুষ বিচার না করে সাংবাদিকদের ডাকতে হবে! তারা কি বলতে পারত না, দূতাবাসে অসুবিধা থাকলে কোনও হোটেলে সাংবাদিক সম্মেলন করুন। আয়োজন আমরা করে দিচ্ছি। কিন্তু না তেমন কিছু হয়নি। অনেকেই বলছে, ‘প্রোটোকল’। কিন্তু কোনও প্রোটোকল যদি মানবিকতার সত্ত্বার উপর আঘাত হানে, তাহলে তাকে প্রোটোকল বলে না। ধ্যাষ্টামি বলে। আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো বলেই গিয়েছেন... ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে...’। আজ বেঁচে থাকলে বহু ক্ষেত্রেই অন্যায় শব্দটিকে তিনি ধ্যাষ্টামি দিয়ে রিপ্লেস করে দিতেন। আর হ্যাঁ, সত্যিই যদি প্রোটোকলের মাতামাতি থাকত, তাহলে রবিবার আরও একটি সাংবাদিক সম্মেলন আমির খান করতেন না। তাও আবার তা মহিলা সাংবাদিকদের ডেকে। বোঝাই যাচ্ছে, চাপ পড়েছে। এবং বেড়েছে। তা শুধু আফগান সরকারের উপর নয়, আমাদের মহামহিম ভারত সরকারের উপরও। এই বিষয়টাই শুক্রবার হলে এত বিতর্কই তৈরি হতো না! কিন্তু না, আমাদের সরকার ঠেকে শেখে। আর তারপর ড্যামেজ কন্ট্রোল করে। এক্ষেত্রেও তাই হল। 

Advertisement

ভারত কি তাহলে আফগানিস্তানের তালিবান সরকারকে স্বীকৃতি দিয়ে দিল? না, তেমন কিছু সরকারিভাবে হয়নি। কিন্তু আমাদের বিদেশমন্ত্রী জয়শংকর আফগান মন্ত্রীকে পাশে বসিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করলেন, ‘উচ্চ পর্যায়ে’র বৈঠক হল, কাবুলে ফের ভারতীয় দূতাবাস খোলার সিদ্ধান্ত, ভারতের দূতাবাসে তালিবান প্রতিনিধি আসা চূড়ান্ত হওয়া... এই সবের মধ্যে ইঙ্গিত তো একটা রয়েইছে। কী সেই ইঙ্গিত? আমরা পাশে আছি। অন্তত কূটনৈতিক স্বার্থে তো বটেই। সত্যি কথা বলতে, কূটনীতির দিক থেকে এটাই এই মুহূর্তে ভারতের জন্য সঠিক পদক্ষেপ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেভাবে এশিয়ার দিকে নজর ঘুরিয়ে বসে আছেন, তাতে ক্ষমতার বিভাজন স্পষ্ট। পশ্চিম এশিয়া এখন তাঁর স্ক্যানারে। কয়েকটি দেশকে কাছে টেনেই রেখেছে আমেরিকা। সৌদি আরব, কাতারের মতো দেশ তাদের পাশে। আর আমেরিকা ঘনিষ্ঠ মানেই ‘পাকিস্তানের সমর্থক’। দৌত্যের কাজটা তারাই করে। আর যুদ্ধ ও অস্থিরতা জিইয়ে রাখার কাজটা ইজরায়েল। ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি দাবি করে থাকেন, এর কিছুই তিনি জানেন না, পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলি যা করে নিজেদের সিদ্ধান্তে এবং আমরা যদি তা বিশ্বাস করি... তাহলে বাড়ির নেমপ্লেটের উপর ‘মূর্খের স্বর্গ’ লিখে দিলেই হয়। এখন মার্কিন প্রেসিডেন্টের নজর পড়েছে আফগানিস্তানের ছোট্ট শহর বাগরামের উপর। ওই জায়গা, ওই এয়ার বেস তাঁর আবার চাই। কেন? আফগানিস্তানের উত্তরে অবস্থিত ছোট্ট স্ট্র্যাটেজিক শহর বাগরাম। প্রাচীন ‘সিল্ক রুটে’র অন্যতম চাবিকাঠি। সড়কপথে চীন, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান হয়ে ইরান (পারস্য) যেতে হলে বাগরাম ছাড়া গতি নেই। এর উত্তরে উজবেকিস্তান, কিরঘিজস্তান, তুর্কমেনিস্তান। তারপরই রাশিয়া। পূর্বে পাকিস্তান, ভারত, চীন। ওখানকার বায়ুসেনা ঘাঁটি নিয়ন্ত্রণে থাকলে দক্ষিণ এশিয়ার মজ্জায় যে কোনও সময় আঘাত হানা সম্ভব। তালিবান সরকার এই ঘাঁটি আমেরিকাকে দিতে নারাজ। কারণ তারা জানে, এখানে একবার এন্ট্রি পেয়ে গেলে তাদের নিজস্ব ভিতটাই নড়বড়ে করে দেবে আমেরিকা। এমনিতেই ২০২১ সালে ক্ষমতা দখলের পর বড় দেশগুলি তাদের সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি। তার উপর খাইবার প্রদেশে সক্রিয় হয়ে উঠেছে পাকিস্তান। অর্থাৎ আইএসআই এবং জঙ্গি সংগঠনগুলি। শুধু লস্কর বা জয়েশ নয়, আফগানিস্তানে নাশকতার জন্য পাকিস্তান এবার ব্যবহার করছে আইএস জঙ্গিদের। উপমহাদেশে ইসলামিক স্টেটের সন্ত্রাস-পদ্ধতি খুব একটা পরিচিত নয়। তাই সেটা ঘাতক হয়ে উঠছে। একই ফর্মুলা পাকিস্তান প্রয়োগ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে ভারতেও। ফলে আমেরিকা এবং পাকিস্তানকে একযোগে আটকাতে গেলে আফগানিস্তানের যেমন নয়াদিল্লিকে পাশে চাই। তেমনই ভারতের ক্ষেত্রে বিষয়টা একই সিলেবাসের প্রশ্নের মতো। তালিবান সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলে মন্দার বাজারে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটা রুট খুলে যাবে। পাশাপাশি পাকিস্তানের উপর দু’দিক থেকে হানা দেওয়া যাবে। একদিকে কাশ্মীর, অন্যদিকে খাইবার। উপরন্তু আমেরিকার সামরিক ও কূটনৈতিক আগ্রাসনও ঠেকানো যাবে। তাই ভারত সরকার সতর্ক। মহিলা সাংবাদিকদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি, তাতে কী? খুব বেশি হলে কয়েকদিন লেখালেখি হবে, টিভিতে আলোচনাসভা বসবে। তারপর সবাই ভুলে যাবে। অত বিতর্ক গায়ে মাখলে চলে না। কিন্তু আমাদের মোদি সরকার ভুলে যাচ্ছে, অধিকার-স্বাধীনতার মননে পাথর মারা বা মারতে দেওয়াটা কাচের গায়ে ঢিল ছোড়ারই শামিল। ভাঙা কাচ কখনও জোড়া লাগে না। সংস্কৃতির গোড়ায় গ্যাংগ্রিন হতে দিলে তার চিকিৎসা বড় মুশকিলের। বছর ঘুরে যায়, দশকও। কিন্তু মানুষ মনে রেখে দেয়। তালিবান শাসকরা শরিয়তি আইনে বিশ্বাসী হতে পারে। তুমি তো নও! নারীর উচ্চশিক্ষা ওদের সমাজে নিষিদ্ধ হতে পারে, তুমি তো বেটি বাঁচাও বেটি পড়াওয়ের স্লোগান দাও। বোরখা ছাড়া বেরলে ওদের দেশে মৃত্যুদণ্ডও হতে পারে, তুমি তো তিন তালাক রদ করে নারী স্বাধীনতার প্রচার করো! তারপরও এই দেশে এমন ‘অনধিকারে’র খেলা চলতে দেওয়া হল? 
মিথিলায় গিয়েছেন কখনও? একটি জনপদ। বিহারের উত্তরভাগের বেশ কিছু অংশ, আর বাকিটা ভাগাভাগির পর এখন নেপালে। ওখানে গিয়ে জয় শ্রীরাম বললে উত্তর পাবেন, জয় সিয়ারাম। কারণ এই মিথিলা প্রদেশেই ছিল জনকপুর। জনকরাজের জনকপুর। সীতা মায়ের জনকপুর। আজ ভৌগোলিক প্যাঁচ পয়জারে তা নেপালে হতে পারে, কিন্তু মিথিলার মানুষ এখনও তাঁদের অঞ্চলকে সীতা মায়ের বাপের বাড়ি বলেই মনে করেন। তাই সীতা নাম তাঁদের কাছে রামের আগে আসে। এই দেশ সীতার।
এক বছর ধরে আমরা অপেক্ষায় থাকি তাঁর। বর্ষা নামলে তাকিয়ে থাকি আকাশের দিকে। কবে দেখা যাবে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ। রেল লাইনের ধারে কি কাশের দেখা পাওয়া গেল? রাতের অন্ধকারে কি শিউলির গন্ধ? মা আসছেন। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে চণ্ডীপাঠ শোনা মাত্র মনে শারদ হাওয়া লাগে। মা এলেন। এই দেশ দুর্গার। 
এই দেশের রাজধানীর বুকে এমন সাংবাদিক সম্মেলন আমরা তাই মানতে পারি না। যে শাসকের ক্ষমতায়ন তাদের দেশের মানুষই মানতে পারে না, তাদের ‘প্রোটোকল’ আমরা কেন মানব? যে আফগানিস্তানে ১৯১৯ সালে মহিলারা ভোটাধিকার পেয়েছিল, আমেরিকা এবং ইউরোপের তাবড় দেশেরও আগে... সেখানেই যে আজ নারীর অস্তিত্ব সংকট! তাও তাদের ‘প্রোটোকল’ মানতে হবে? যে দেশের দূতাবাস কর্মীরাই ‘গণতান্ত্রিক আফগানিস্তানে’র পতাকা হাতে নিঃশব্দ প্রতিবাদ জানান, যে দেশের দূতাবাসের বাইরে এখনও গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী ফ্ল্যাগই শোভা পায়, তাদের প্রোটোকল? আফগান মন্ত্রী সাংবাদিক সম্মেলনে বসার সময় ব্যাগ থেকে ছোট একটি তালিবান পতাকা বের করে টেবলের উপর রেখেছেন। এমনকী সামনের দরজা দিয়ে তিনি বেরনওনি। কারণ, ওখানেই উড়ছে ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব আফগানিস্তানে’র পতাকা। আর তারা এখন? ‘ইসলামিক এমিরেট অব আফগানিস্তান’। এমিরেট কথাটির উৎপত্তি ‘আমির’ থেকে। অর্থাৎ, এমিরেট হল মুসলিম শাসকের অধীনে থাকা রাষ্ট্র। গণতন্ত্র নয়। বেরনোর সময় একজন সাংবাদিক আমির খান মুত্তাকিকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘এই দূতাবাস কার? গণতান্ত্রিক আফগানিস্তানের? নাকি ইসলামিক এমিরেট অব আফগানিস্তানের?’ তালিবান মন্ত্রীর উত্তর ছিল, ‘ইয়ে হামারা হ্যায়।’ জটায়ুর ভাষায়, ‘এটা আমাআআআআর!’

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ