দর্শনযোগ্য বা শ্রবণযোগ্য প্রতীকের ব্যবহার ধর্মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে এটি প্রচলিত। প্রতীক তার নিজের ভাব ছাড়াও আরো কিছুর দ্যোতক। এটি কোন বিমূর্ত ভাব বা পদ্ধতি বা মূর্ত বস্তু হতে পারে। অন্ধদের নির্ভর করতে হয় শ্রবণযোগ্য প্রতীকের উপর, বধিরদের দর্শনযোগ্য প্রতীকের উপর। অধিকাংশ দেশেই পতাকা হচ্ছে জাতীয়তাবোধ এবং বিজয়ের প্রতীক, মুকুট সার্বভৌমত্বের প্রতীক, দণ্ড শাসকের প্রতীক, তরবারি শান্তিমূলক বিচারের প্রতীক। মানবমন স্বাভাবিক কারণেই আলোকে জ্ঞান এবং আনন্দের প্রতীক রূপে এবং অন্ধকারকে অজ্ঞান এবং দুঃখের প্রতীকরূপে গ্রহণ করে। পবিত্রতার প্রতীক সাদা, প্রেম-ভালবাসার প্রতীক লাল, শান্তির প্রতীক সবুজ, শোকের প্রতীক কালো। বিনা কারণে পায়রাকে শান্তি-দূতের প্রতীক রূপে এবং বাজ পাখিকে যুদ্ধ-দূতের প্রতীক রূপে ভাবা হয় না। বিভিন্ন দেশে এবং জাতিতে একই রকমের প্রতীকের ব্যবহার প্রমাণ করে প্রতীক এবং সেটি যে ভাবের দ্যোতক তার মধ্যে স্বাভাবিক সাদৃশ্য আছে। মানুষের ভাষায় প্রতীকের সবচেয়ে বেশী ব্যবহার। প্রতি শব্দ একটি প্রতীক, লিখিতই হোক আর মৌখিকই হোক এর একটি অর্থ আছে। এটি কোন মূর্ত বস্তুও বোঝাতে পারে, আবার বিমূর্ত ভাবও বোঝাতে পারে অথবা কোন কাজ বোঝাতে পারে। জাতিবাচক বিশেষ্য—যেমন গাছ, মানুষ, স্থান—মূর্ত বস্তুকেও বোঝায় আবার তার অন্তর্নিহিত ভাবও বোঝায়। ভাববাচক বিশেষ্য—যেমন দয়া, প্রেম, বীরত্ব—গুণ বোঝায়। ক্রিয়াপদ—যেমন বলা, করা, থাকা—কাজ বোঝায়।
“গাছ” এই শব্দটি গাছ নামক বস্তুটি বোঝায় আর সেই সঙ্গে গাছের ধারণাও দেয়। গাছ জাতীয় প্রতিটি বস্তুর ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য। সামগ্রিকভাবে গাছ জাতিকেও এটি বোঝায়। একটি গাছের ধারণার সঙ্গে সঙ্গে ঐ বিশেষ গাছের একটি ছাপ মনের মধ্যে পড়ে আর সেই সঙ্গে গাছ জাতির সম্বন্ধে একটি সাধারণ ধারণাও মনের মধ্যে আসে। ‘গাছ’ শব্দটি গাছের কল্পমূর্তি বোঝায় না, গাছের ধারণা বোঝায়। সেই জন্যই শিশুরা একটি গাছ চিনলে, গাছ জাতির সমস্ত কিছুকেই গাছ বলে চিনতে পারে। অনুরূপে ‘মানুষ’ শব্দটি প্রতিটি মানুষকে বোঝানোর সঙ্গে সঙ্গে মানব জাতিকে বোঝায়। ছাত্রের কাছে মানুষ সম্বন্ধে ধারণাও দেয় এই শব্দটি। ফলে একটি মানুষ চিনলে মনুষ্য প্রজাতির প্রতিটি অঙ্গকে চেনা যায়। শব্দ এবং তার ধারণার মধ্যে সম্পর্কটি স্বাভাবিক। এটি খেয়ালখুশিমত বা রীতিমাফিক কোন ব্যাপার নয়। বিশেষ একদল মানুষের মধ্যে সাধারণ চুক্তির মাধ্যমে এটি নির্দ্ধারিত হয় না। অবশ্য কিছু কিছু পারিভাষিক শব্দ আছে যেগুলিকে বিশুদ্ধ রীতিমাফিক বলা যেতে পারে। এ প্রসঙ্গে আমাদের এখানে আলোচনার প্রয়োজন নাই। মানুষের ভাষায় স্বাভাবিক ভাবে যে শব্দগুলি ব্যবহৃত হয় সেই প্রসঙ্গ এখানে আলোচ্য। একটি শব্দের অনেক অর্থ থাকতে পারে, কিন্তু প্রতিটি অর্থই শব্দের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্কযুক্ত। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়—কোন ব্যক্তির অনেকগুলি সন্তান থাকতে পারে, কিন্তু প্রতিটি সন্তানের সঙ্গেই তার স্বাভাবিক সম্পর্ক থাকে। মানবজাতির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক পদ্ধতিতেই মানুষের ভাষা উন্নতি লাভ করেছে। বিমূর্ত ধারণাকে মূর্ত কোন বস্তুর মাধ্যমে ধরার প্রয়োজন মানুষ অনুভব করে। বিমূর্ত ভাবের মূর্ত প্রকাশ ঘটলে ভাবটি পরিষ্কার এবং সুস্পষ্টরূপে ফুটে ওঠে। ভক্তিসহকারে পূজার একটি ছবি ভক্তিকে বাস্তবে ফুটিয়ে তোলে।
স্বামী সৎপ্রকাশানন্দের ‘ধ্যান সাধনা সিদ্ধি’ থেকে