মাদ্রাজে স্বামীজীকে দর্শন করতে যেসব অগণিত নরনারী আসতেন, তাঁদের মধ্যে একজনের কথা বলা আবশ্যক। দক্ষিণ দেশের প্রসিদ্ধ তীর্থক্ষেত্র তিরুপতি থেকে আগত আগমবাদী বৈখানস-সম্প্রদায়-ভুক্ত একজন বৃদ্ধ স্বামীজীর গলায় মালা দিয়ে পায়ে ধরে সজল চোখে গদগদকণ্ঠে বলেছিলেন, ‘ইনি স্বয়ং বিখানস।’ এই সম্প্রদায়ের লোকেরা বিখানসকে বিষ্ণুর অবতার বলে বিশ্বাস করেন। এঁরা কর্মযোগেরও বিশেষ অনুরাগী এবং ঐ বিষয়ে আলোচনাও করেন। কিন্তু ইনি স্বামীজীর মুখে কর্মযোগের ব্যাখ্যা শুনে বলেছিলেন, “আমি আজন্ম কর্মযোগ ও বৈখানস পদ্ধতির মধ্যে লালিত-পালিত হইয়াছি বটে, তথাপি আপনি উহার তত্ত্ব অনেক বেশি অবগত আছেন।” শ্রীযুক্ত সুন্দররাম আয়ারের পুত্র শ্রীযুক্ত রামস্বামী শাস্ত্রী তখন বি. এ. পাস করে মাদ্রাজে বি. এল. পড়তেন এবং সর্বদাই স্বামীজীর নিকট যাতায়াত করতেন।
তিনি মাদ্রাজের একটি ঘটনা বিবৃত করেছেন। একদিন এক প্রাচীনপন্থী পণ্ডিত হঠাৎ আগন্তুকদের মধ্যে দাঁড়িয়ে স্বামীজীকে জিজ্ঞাসা করলেন, “শুনলাম আপনি ব্রাহ্মণ নন; আর শাস্ত্রানুযায়ী আপনার সন্ন্যাসগ্রহণ চলে না। আপনি কি করে তাহলে গেরুয়াবস্ত্র ধারণ করলেন এবং সন্ন্যাসীদের পবিত্র সঙ্ঘে প্রবেশ করলেন?” এরকম ব্যক্তির সঙ্গে বাদানুবাদে প্রবৃত্ত হওয়া অযৌক্তিক জেনে স্বামীজী তাঁকে নীরব করবার জন্য বললেন, “প্রত্যেক ব্রাহ্মণ সন্ধ্যা করতে বসে যে চিত্রগুপ্তের নিকট প্রার্থনা করে থাকেন, আমি তাঁরই জাতে জন্মেছি। অতএব ব্রাহ্মণদের যদি সন্ন্যাসে অধিকার থাকে তো, আমার অধিকার ততোধিক।” স্বামীজী তারপর পালটা আক্রমণ করে পণ্ডিতকে বললেন, “আপনার সংস্কৃত প্রশ্নে এমন একটা ভুল উচ্চারণ ছিল, যা অমার্জনীয়। ‘ন ম্লেচ্ছিতং বৈ নাপভাবিষতং বৈ’ এই কথা বলে পাণিনি এর নিন্দা করেছেন। অতএব এইরকম আলোচনায় আপনার অধিকার নেই।” পণ্ডিত দেখলেন সুবিধা হচ্ছে না, আর শ্রোতারা স্বামীজীরই পক্ষপাতী, অতএব তিনি ধীরে ধীরে চলে গেলেন।
শ্রীযুক্ত সুন্দররাম আয়ারের স্মৃতিলিপি থেকে আরো একটি মজার ঘটনা জানতে পারা যায়। জনৈক বৈষ্ণব পণ্ডিত সংস্কৃত ভাষায় বেদান্ত সম্বন্ধে কোন এক কূট প্রশ্ন তুললেন। স্বামীজী ধৈর্যসহকারে শুনলেন, কিন্তু কোন উত্তর না দিয়ে উপস্থিত শ্রোতৃবর্গকে ইংরেজীতে বললেন, মতবাদ সম্বন্ধীয় যেসব কূটচালে বিষয়ের সঙ্গে জীবনসমস্যার কোন সাক্ষাৎ সম্বন্ধ নেই, সেইসব নিয়ে তিনি বৃথা তর্কে সময় নষ্ট করতে চান না। পণ্ডিত তবু স্বামীজীকে প্রশ্ন করলেন, “আমাকে স্পষ্ট করে বলুন, আপনি দ্বৈতবাদী, না অদ্বৈতবাদী।”


