Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

স্বামীজী

মাদ্রাজ হয়ে ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দের ২৮ জানুয়ারি জাহাজ কলকাতার বন্দরে এসে তার শেষ গন্তব্যস্থলে পৌঁছল। স্বামী বিবেকানন্দ মার্গারেটকে অভ্যর্থনা করবার জন্য জেটিতে অপেক্ষা করছিলেন।

স্বামীজী
  • ১৯ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

মাদ্রাজ হয়ে ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দের ২৮ জানুয়ারি জাহাজ কলকাতার বন্দরে এসে তার শেষ গন্তব্যস্থলে পৌঁছল। স্বামী বিবেকানন্দ মার্গারেটকে অভ্যর্থনা করবার জন্য জেটিতে অপেক্ষা করছিলেন। তাঁকে দেখে মার্গারেট অনেক আশ্বস্তবোধ করলেন। এই অপরিচিত দেশে তখন একমাত্র স্বামীজীই তাঁর পরিচিত। কলকাতার চৌরঙ্গী অঞ্চলের এক হোটেলে মার্গারেট প্রথমে অবস্থান করেন। স্বামীজী তাঁর বাংলা শেখার ব্যবস্থা করলেন। কলকাতার দ্রষ্টব্য স্থানগুলি দেখা হল—মিউজিয়াম, ফোর্ট, বটানিক্যাল গার্ডেন ইত্যাদি। তখনকার চৌরঙ্গীর সঙ্গে বর্তমান চৌরঙ্গীর বহু পার্থক্য। তখন ওই অঞ্চল জন-বিরল, পরিষ্কার, সুসজ্জিত ইংরেজ-পল্লি। চৌরঙ্গী দেখে প্রকৃত কলকাতা ও তার অধিবাসীদের অবস্থা হৃদয়ঙ্গম করা সম্ভব ছিল না। মার্গারেট এসেছেন এদেশের সেবায় আত্মনিয়োগ করতে। তাঁর উৎসাহ ইংরেজ-পল্লিতে নয়, ‘নেটিভ পাড়ায়’। তাই তিনি একলাই ঘোড়ার গাড়ি করে ওইগুলি আবিষ্কার এবং ভারতবাসীদের জীবনযাত্রা সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতেন। ওই বছরেই ৮ ফেব্রুয়ারি আরও দুজন পাশ্চাত্য মহিলা মিসেস সারা বুল ও মিস জোসেফিন ম্যাকলাউড আসেন ভারত-ভ্রমণের উদ্দেশ্যে। মঠ তখন বেলুড়ে নীলাম্বর মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে। বর্তমান বেলুড় মঠের জমি কেনার পর গঙ্গাতীরে অবস্থিত পুরোনো বাড়িটির কিছু কিছু সংস্কার করা হয় এবং মিসেস বুল ও মিস ম্যাকলাউডের সঙ্গে মার্গারেট কিছুদিন ওই বাড়িতে বাস করেন। মিসেস সারা বুল ছিলেন নরওয়েবাসী বিখ্যাত বেহালাবাদক ওলি বুলের স্ত্রী। আমেরিকায় বস্টন শহরে এঁর বাড়িতে স্বামীজী আতিথ্যগ্রহণ করেন। বেদান্ত-প্রচারকার্যে তিনি স্বামীজীকে বহু সাহায্য করেন। পরে বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক জগদীশচন্দ্র বসুর বিজ্ঞান গবেষণার কাজেও নানাভাবে সাহায্য করেছিলেন। স্বামীজী তাঁর নাম দিয়েছিলেন ‘ধীরামাতা’ এবং ‘মা’ বলে তাঁকে সম্বোধন করতেন। মিস জোসেফিন ম্যাকলাউড ছিলেন স্বামীজীর পরম সুহৃদ। স্বামীজী তাঁর নাম রেখেছিলেন ‘জয়া’ এবং পত্রে বহু সময় ‘জো’ বলে সম্বোধন করতেন। ভারতে আগমনের পর মিস ম্যাকলাউড স্বামীজীকে একদিন জিজ্ঞাসা করেন, “স্বামীজী, কীভাবে আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারি?” স্বামীজী তৎক্ষণাৎ উত্তর দেন “ভারতবর্ষকে ভালবাসো”।

Advertisement

বেলুড়ে গঙ্গাতীরে যে জীর্ণ ক্ষুদ্র বাড়িটিতে ধীরামাতা, জয়া ও মার্গারেট প্রায় দুইমাস অবস্থান করেন, তার পরিবেশ ছিল যথার্থই স্বর্গীয়। অপর তীরে দক্ষিণেশ্বরের মন্দির ও বৃক্ষশীর্ষগুলি দেখা যেত। স্বামীজী প্রতিদিন সকালে পাশ্চাত্য শিষ্যাগণের সঙ্গে প্রাতরাশে যোগ দিতেন। সেই মহাপুরুষের আগমনে বাড়িখানি যেন তীর্থে পরিণত হতো। প্রাতরাশের পর বৃক্ষতলে বসে বহুক্ষণ ধরে চলত স্বামীজীর কথা। তন্ময় হয়ে তিনি ভারতবর্ষের কথা বলে যেতেন। জীবনের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি, বেদান্ত মতবাদ, ইতিহাস, উপকথা, সাহিত্য, কাব্য, জাতীয়ভাব, দৈনন্দিন জীবনের আচার-অনুষ্ঠান প্রভৃতি সুললিত কণ্ঠে তিনি বর্ণনা ও ব্যাখ্যা করে যেতেন। মার্গারেট ও তাঁর সঙ্গিনীরা স্থান, কাল বিস্মৃত হয়ে তন্ময় হয়ে শুনতেন। তাঁদের চোখের সামনে ভেসে উঠত ভারতমাতার প্রাচীন মহিমময় মূর্তি।
প্রব্রাজিকা অমলপ্রাণা প্রকাশিত ‘ভগিনী নিবেদিতা’ থেকে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ