সন্ধ্যা ৭.২০ মিনিট নাগাদ স্বামী বিশুদ্ধানন্দ মহারাজ মাঠে চেয়ারে বসেছিলেন। তিনি গঙ্গাধর মহারাজের কথা বলতে লাগলেন। বললেন, “মহারাজ, স্বামী শিবানন্দ আর স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ—এই তিন জনের সঙ্গে আমি বেশি মিশেছি। আর ইনি (গঙ্গাধর মহারাজ) তো এখানেই থাকতেন।
সন্ধ্যা ৭.২০ মিনিট নাগাদ স্বামী বিশুদ্ধানন্দ মহারাজ মাঠে চেয়ারে বসেছিলেন। তিনি গঙ্গাধর মহারাজের কথা বলতে লাগলেন। বললেন, “মহারাজ, স্বামী শিবানন্দ আর স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ—এই তিন জনের সঙ্গে আমি বেশি মিশেছি। আর ইনি (গঙ্গাধর মহারাজ) তো এখানেই থাকতেন।
“আমি একদিন মহারাজের গা টিপে দিচ্ছি। তাঁর শরীর নাদুস-নুদুস। খুব শক্ত, কুস্তি-টুস্তি করতেন তো। টিপতে টিপতে এলে গিয়েছি। ছোট থেকেই আমি একটু দুর্বল ছিলাম, খেলা-টেলা এড়িয়ে চলতাম। ঘেমে গিয়েছি, আর ভাবছি কখন মহারাজ বলবেন—থাক। এমনসময় মনে মনে ভাবতে লাগলাম—মহারাজ ঠাকুরের মানসপুত্র, তাঁর সেবা করছি। এই ঘাম সাধুসেবার জন্য হচ্ছে। সংসারী লোকেরা সংসারের জন্য দিনরাত কত মাথার ঘাম ফেলে। আমি কত সুকৃতির ফলে আজ মহারাজের সেবা করতে পারছি। অমনি ক্লান্তি সব চলে গেল। যেমন জোরে আরম্ভকরেছিলাম, তেমনি জোরে আবার টিপতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পরে মহারাজ বললেন—থাক।”
সেবক: আমি ভাবি, যখন আপনাকে ছুঁয়ে আছি তখন মাকেও স্পর্শ করে আছি।
প্রেমেশ মহারাজ: নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই। তোমার যদি বিশ্বাস থাকে তবে নিশ্চয়ই তা-ই। মা আমাকে দুটো মন্ত্র দিয়েছিলেন। এখন হলে বলতাম—অত হাঙ্গামায় কী দরকার, একটা হলেই তো হয় (হাসলেন)। আগে তো দীক্ষা নিয়েছিলাম, জপ করতাম। সেই মন্ত্রের সিদ্ধি হওয়াতে মায়ের দর্শন পাই। আবার দীক্ষা নেওয়ার কী প্রয়োজন ছিল তখন বুঝিনি, এখন বুঝছি। মাকে তখন বললেই হতো—মা তোমাকে তো পেলাম, এখন তোমাতে বিশ্বাস থাকলেই হলো।
সেবক: মা বলেছেন যে, যারা তাঁর কাছে আসবে, ঠাকুর অন্তত শেষসময়ে এসে তাদের হাত ধরে নিয়ে যাবেন। মায়ের যাঁরা শিষ্য—যেমন আপনারা, তাঁদের তো মুক্তির কোনো ভাবনা নেই; কিন্তু আমরাও তো মায়ের কাছে এসেছি। এটা সত্যি কি না?
মহারাজ: যদি তুমি ভাব যে, মায়ের কাছে এসেছ, তাঁর কাছে আছ—তবে তা-ই। তুমি মা বলতে কী বোঝ? মা মরে গিয়েছেন নাকি? মায়ের কাছে কেউ এসে যদি মুক্তি চায় তবে তো সে পাবে। নইলে মা যদি জোর করে দেন তবে তো অত্যাচার করা হলো।
আমি: মায়ের যাঁরা শিষ্য—সন্ন্যাসী বা গৃহী, তাঁরা মুক্ত তো?
মহারাজ: তাঁরা মুক্ত বটে, তবে যাঁরা মায়ের স্নেহ পেয়েও মানের জন্য কাঙাল, তাঁদের আরো দু-এক জন্ম লাগবে বইকি। Fame is the last infirmity of the noble mind.
আশ্রমের একজন সাধু হয়তো বসে বসে খাচ্ছেন, আরেক জন Magistrate কত বুদ্ধিমান, কত কাজ করছেন! কিন্তু সেই সাধু Magistrate-এর চাইতে বেশি বুদ্ধিমান; কারণ, তিনি মিথ্যা-সংসার ছেড়ে সরে দাঁড়িয়েছেন। দু-এক জন্মেই তাঁর মুক্তি হবে। যত পণ্ডিতই হোক, সহজে ঠাকুর ও তাঁর পার্ষদদের চিনতে পারা কঠিন। মহারাজ সেবককে একদিন বলছেন, “তুমি ইচ্ছা করছ ঈশ্বরে মন দেওয়ার, কিন্তু পারছ না; কারণ পূর্বজন্মের সংস্কার—কাম, ক্রোধ, মোহ। তবে কী জান, ভগবানের কাছে প্রার্থনা করলে একটু কমে যায়। তাছাড়া, আমি তো রাতারাতি মুক্তপুরুষ হতে পারব না—আমার যা শক্তি আছে, আমাকে তো সেভাবেই এগোতে হবে।
স্বামী সুহিতানন্দ সঙ্কলিত ও সম্পাদিত ‘সারগাছির স্মৃতি’ থেকে