উনিশ শতক যেন বাঙালির কাছে দীর্ঘ নিদ্রার পর জাগরণের পালা। একই সময়ে এত মনীষীর উত্থান এর আগে বা পরে আর কখনো আমাদের ভাগ্যে ঘটেছে বলে মনে হয় না। আরও একবার আমরা ফিরে তাকাব আমাদের অতীতের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়ের দিকে।
উনিশ শতক যেন বাঙালির কাছে দীর্ঘ নিদ্রার পর জাগরণের পালা। একই সময়ে এত মনীষীর উত্থান এর আগে বা পরে আর কখনো আমাদের ভাগ্যে ঘটেছে বলে মনে হয় না। আরও একবার আমরা ফিরে তাকাব আমাদের অতীতের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়ের দিকে।
রাজা ভট্টাচার্য
ঘুম ভেঙে উঠে বসে কয়েক মুহূর্তের জন্য হকচকিয়ে গেলেন অবনীন্দ্রনাথ। এটা তো তাঁর অভ্যস্ত শোয়ার ঘরটি নয়! বিছানাটিও আলাদা!
পরমুহূর্তেই ঘরে ঢুকে পড়ল একজন চাকর। বিছানায় বসে থাকা অবনীন্দ্রনাথের হাতে ধূমায়মান গড়গড়ার নলটা ধরিয়ে দিয়ে সে দু’হাত কপালে ঠেকিয়ে বলল, ‘প্রাতঃপ্রণাম, বাবু।’ বলে দ্রুত বেরিয়ে গেল।
প্রায় যন্ত্রের মতো সেই নলে ঠোঁট ছোঁয়াতেই অবনীন্দ্রের মনে পড়ে গেল, তিনি মোটেই জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে নেই। গত পরশু তিনি এসেছেন নাটোরে। এবারের প্রভিন্সিয়াল কনফারেন্স এখানেই হচ্ছে। সেই উপলক্ষ্যে তিনি একা নন, ঠাকুরবাড়ির অনেকেই, এবং এই মুহূর্তে বাংলার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বললে যাঁদের কথা মনে পড়ে, তাঁরা প্রায় সকলেই এসেছেন এখানে। নাটোরের মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায় এবার রিসেপশন কমিটির সভাপতি হয়েছেন। কাজেই রাজকীয় ব্যবস্থাপনা শুরু হয়েছে সেই কলকাতা থেকেই। চলছে এখানেও। অবনীন্দ্র যে ঘুম থেকে উঠেই একবার গড়গড়ার নলে ঠোঁট না ছুঁইয়ে থাকতে পারেন না, সে খবরটুকুও চলে গেছে যথাস্থানে, ব্যবস্থাও হয়ে গিয়েছে সেই অনুযায়ী। এর নাম রাজকীয় আতিথ্য।
এই রে! আজ সকালেই একটা বৈঠক আছে না?
কথাটা মনে পড়তেই তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে নেমে পড়লেন অবনীন্দ্রনাথ। রবিকাকা একটা গোপন মিটিং ডেকেছেন আজ সকালে। তিনি নিজে বিছানা ছাড়েন ব্রাহ্মমুহূর্তে। ঠিক সূর্যোদয়ের সময় পূর্বাস্য হয়ে উপাসনা করা তাঁর কৈশোরের অভ্যেস। অবনের এসব নেই। ফলে ইতিমধ্যেই তিনি দেরি করে ফেলেছেন।
চটপট তৈরি হয়ে নিলেন অবন।
নাটোরের রাজবাড়ির পাশে অশেষ ঐতিহ্যবাহী জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িটাকেও নিছক এলেবেলে বলে মনে হয়। জগদিন্দ্র নিজে এসে অবনীন্দ্রনাথকে গতকাল নিয়ে গিয়েছিলেন রানি ভবানীর মহলের দিকে। দেড়শো-দুশো বছরের পুরানো প্রাসাদ, নাটমন্দির, কাছারি, শিবমন্দির— সব এখনও আছে। জরাজীর্ণ দশা অবশ্য। তাঁর বংশধরেরা পরবর্তীকালে নতুন নতুন প্রাসাদ তৈরি করে নিয়েছেন। কিন্তু সেই পুরানো মহলের জীর্ণ ধ্বংসস্তূপে এমন এক গাম্ভীর্য আছে যে, অবনীন্দ্রনাথ সারাটা দিন ছবি এঁকেই কাটিয়ে দিয়েছেন সেখানে।
কিন্তু আজ আর ছবি আঁকা নিয়ে বসে থাকলে চলবে না। আজ বিকেলেই শুরু হবে মূল সম্মেলন। ঠাকুরবাড়ির থেকেই এসেছেন অন্তত পাঁচজন। অবনীন্দ্রনাথ তো আছেনই, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ছাড়াও আছেন প্রথম বাঙালি আইসিএস— অবনীন্দ্রনাথের মেজো জ্যাঠামশাই সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, বড়ো জ্যাঠামশাই দ্বিজেন্দ্রনাথের ছেলে দীপেন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রের ন-পিসেমশাই জানকীনাথ ঘোষাল। এসেছেন কংগ্রেসের প্রথম সভাপতি উমেশচন্দ্র। যিনি নিজের নাম লেখেন ডব্লু সি বোনার্জি। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় আছেন, এসেছেন ন্যাশনাল কংগ্রেসের লালমোহন ঘোষ। এককথায় যাকে বলে চাঁদের হাট।
কিন্তু আজকের সকালের মিটিংটা হবে শুধু অল্পবয়সিদের মধ্যে। অবনীন্দ্রকে অবশ্য ঠিক অল্পবয়সি বলা চলে না, চৌত্রিশ বছর বয়স হল তাঁর। কিন্তু সেই ‘ছেলের দল’-এর সর্দার যদি হন খোদ রবিকাকা, তাহলে অবনকে ঠেকিয়ে রাখা অসম্ভব। রবিকা-র সমস্ত কাজে অবনের উপস্থিতি যেন সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের মতো নিশ্চিত।
নির্দিষ্ট ঘরটায় ঢুকে অবনীন্দ্র দেখলেন, বাকি সকলে ইতিমধ্যেই এসে পড়েছেন। রবীন্দ্রনাথ বোধহয় কিছু একটা বলছিলেন। অবনকে দেখে চোখের ইশারায় একটা গদি-মোড়া চেয়ার দেখিয়ে দিলেন। অবনীন্দ্র সামান্য লজ্জিত মুখে তাড়াতাড়ি সেটায় বসে পড়লেন।
‘‘আমার কথা এই— আমরা যে আন্দোলন করতে নেমেছি, তার নামই হল ‘স্বদেশি আন্দোলন।’ নামের মধ্যেই এর প্রকৃত পরিচয় লুকিয়ে রয়েছে।’’ আবার বলতে শুরু করলেন রবীন্দ্রনাথ, ‘দেশের অজস্র বৈশিষ্ট্য আছে, সে কথা আমি একবারও অস্বীকার করছি নে। কিন্তু গোড়ার কথাটি হল— স্বদেশের কথাটি যে ভাষায় আপনি থেকে বাণীমূর্তি ধরে, তা হল মাতৃভাষা। তাকে বাদ দিয়ে এই আন্দোলন গড়ে তোলার কোনো অর্থই নেই— এই আমার মত।’
‘আমিও সেই কথাই বলছি।’ বললেন দীপেন্দ্রনাথ, ‘আমরা দেশের কাজ করছি, অথচ সেই কাজের কথাটি আলোচনা করব শাসকের ভাষায়— এ কেমন কথা? দেশের মানুষই যদি তার উদ্দেশে বলা কথাটির অর্থ বুঝতে না পারে, তাহলে তো বলাই বৃথা!’
‘কিন্তু একটা কথা ভুললে চলবে না।’ আর একজন বললেন, ‘সভায় নানা প্রদেশের মানুষ আসবেন। তাঁদের ভাষা আলাদা। ইংরেজিতে বক্তৃতা হলে সকলে বুঝতে পারবেন। বাংলায় বললে তো কেবল বাঙালিরাই...।’
‘একটা কথা বল দেখি!’ বাধা দিয়ে বললেন রবীন্দ্রনাথ, ‘আজকের সভায় কতজন অবাঙালি উপস্থিত থাকবেন?’
অবনীন্দ্র বলে উঠলেন, ‘একজনও না। অন্তত আজকের কনফারেন্সে যাঁরা বক্তৃতা দেবেন ও শুনবেন, তাঁরা প্রত্যেকে বাঙালি।’
‘এবং সেটাই স্বাভাবিক।’ রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘ভুলে গেলে চলবে না, এটা প্রভিন্সিয়াল কনফারেন্স। প্রাদেশিক সভা। তাহলে সেখানে কেন ন্যাশনাল কংগ্রেসের সভার মতো ইংরেজি বলতে হবে?’
অকাট্য যুক্তি। উপস্থিত সকলে চুপ করে রইলেন। বাস্তবেই এই সম্মেলনে কোনো অবাঙালি উপস্থিত থাকবেন না, যাঁর খাতিরে ইংরেজিতে ভাষণ দেওয়ার দরকার হয়।
এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শোনা গেল। পরক্ষণেই ঘরে ঢুকলেন মহারাজা জগদিন্দ্র স্বয়ং। হালকা গলায় তিনি বললেন, ‘মনে হচ্ছে কোনো জরুরি আলোচনা চলছে। বাধা দিতে হল। কেউ কিছু মনে করবেন না দয়া করে। আমাদের কাজটাও জরুরি বলেই এভাবে...।’
‘কী ব্যাপার নাটোর?’ জিজ্ঞাসা করলেন রবীন্দ্রনাথ।
মৃদু হেসে মহারাজা বললেন, ‘কই রে, নিয়ে আয় দেখি!’
এইবার এক বিচিত্র দৃশ্য দেখা গেল। একজন লোক ঘরে ঢুকে সোজাসুজি অবনীন্দ্রর দিকে এগিয়ে এসে তাঁর সামনে রাখা টেবিলের উপর রাখল একটা মস্ত বাহারি কারুকাজ করা প্লেট। তাতে আছে সন্দেশ। সেই সন্দেশ থেকে এখনও ধোঁয়া উঠছে।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আরও একজন পরিচারক ঢুকে সন্দেশের প্লেটের পাশে রেখে দিল এক কাপ চা। দুর্মূল্য দার্জিলিং চায়ের অপরূপ গন্ধে ভরে উঠল ঘরটা।
‘এসব কী হচ্ছে বলুন দেখি নাটোর?’ বিস্মিত গলায় জিজ্ঞাসা করলেন রবীন্দ্রনাথ, ‘এমন গরম সন্দেশ আপনি কোথা থেকে আনাচ্ছেন?’
‘আজ আর আনানোর কোনো ব্যাপার নেই রবিবাবু,’ হাসতে হাসতে বললেন মহারাজা জগদিন্দ্র, ‘‘একেবারে ঘরের বাইরে হালুইকর বসিয়ে দিয়েছি। কাল অবনীন্দ্র বলছিলেন, ‘কী সন্দেশ খাওয়াচ্ছেন! আনতে আনতে ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। ভেবেছিলুম গরম গরম সন্দেশ দিয়ে চা খাব।’ আজ তাই একেবারে হাতে-গরম সন্দেশের ব্যবস্থা করে ফেলেছি।’’
রবীন্দ্রনাথ বড়ো বড়ো চোখ করে একবার প্রিয়তম ভাইপোর দিকে তাকালেন। এরকম বিচিত্র আবদার একমাত্র অবনই করতে পারে। কিন্তু সেই আবদার পালন করার জন্য যে কেউ সত্যিই এমন আশ্চর্য ব্যবস্থাও করে বসতে পারেন, এ-কথা এমনকি রবীন্দ্রনাথও ভাবতে পারেননি।
এবার বোঝা গেল, অবনীন্দ্র নিজেও একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছেন। সেটা সামলে নেওয়ার জন্য তিনি অতিরিক্ত গাম্ভীর্যের সঙ্গে সত্যি সত্যি চামচ দিয়ে সেই গরম সন্দেশ খেতে লাগলেন, আর তার সঙ্গে চুমুক দিতে লাগলেন চায়ের পেয়ালাতে।
সেদিনের রাউন্ড টেবিল কনফারেন্সে অবশ্য ব্যাপারটা ঠিক এতটা মধুর থাকল না।
রবীন্দ্রনাথের মুখের কথাও এক শোনার মতো ব্যাপার। কিন্তু প্রয়োজন হলে তিনি যে সম্পূর্ণ ভিন্ন মূর্তি ধারণ করতে পারেন, তা এবার বোঝা গেল। মিটিংয়ের শুরুতেই তিনি স্পষ্ট করে বলে উঠলেন, ‘আমার মনে হয়, এবারের প্রাদেশিক সম্মেলনের সমস্ত কাজকর্ম— বক্তৃতা থেকে শুরু করে লেখালিখি পর্যন্ত বাংলায় করলেই ভালো হয়। আমরাই যদি নিজের ভাষাকে সম্মান না করি, বিদেশি শাসক আমাদের সম্মান করবে কেন?’
জানকীনাথ বা উমেশচন্দ্রর মুখ দেখেই বোঝা গেল, তাঁরা অসম্ভব অবাক হয়েছেন। লালমোহন ঘোষ তো বলেই বসলেন, ‘দ্যাটস নট পসিবল, মিঃ টেগোর! সভার কিছু রুলস্ অ্যান্ড রেগুলেশনস্ থাকে। আমার তো মনে পড়ছে না, কখনো কোনো কনফারেন্সে ইংলিশ ছাড়া অন্য কোনো ল্যাংগুয়েজ ইউজ করা হয়েছে।’
জানকীনাথ পর্যন্ত বলে উঠলেন, ‘না হে রবি, এ তোমাদের অন্যায় আবদার। আমি তো কনফারেন্স শব্দটার বাংলা পর্যন্ত জানি নে! আস্ত একটা বক্তৃতা কি বাংলায় দেওয়া সম্ভব?’
রবীন্দ্রনাথ সঙ্গে সঙ্গে অসম্ভব ধারালো গলায় বললেন, ‘আজ্ঞে কনফারেন্স শব্দটার বাংলা হল সম্মেলন। আর প্রভিন্সিয়াল মানে হল প্রাদেশিক। আমরা এখানে একটা প্রাদেশিক সম্মেলন করতেই একত্র হয়েছি। আর সেই প্রদেশের ভাষা বাংলা। কাজেই সেই প্রাদেশিক সম্মেলনের সমস্ত কাজকর্ম বাংলা ভাষাতে হবে, সেটাই তো স্বাভাবিক!’
উমেশচন্দ্র ঘাড় নাড়তে নাড়তে বললেন, ‘সেটা অত্যন্ত খারাপ দেখাবে রবিবাবু। চিরকাল কনফারেন্সের কাজ ইংরেজিতেই হয়ে
এসেছে।’
রবীন্দ্রনাথ আবার বললেন, ‘চিরকালের পথ ছাড়ব বলেই তো এই পথে এসেছি, উমেশবাবু!’
খুব সম্ভবত আজ পর্যন্ত কেউ উমেশচন্দ্র ব্যানার্জিকে এই সম্বোধন করেননি। বরাবর তাঁকে সকলে মিঃ বোনার্জি বলেই ডেকে এসেছেন। তাঁর সমস্ত মুখভঙ্গিতে সেই অস্বস্তি ফুটে উঠল।
সেদিন বিকেলের অধিবেশনেই এই বিভাজন একেবারে স্পষ্ট হয়ে উঠল। প্রথমে গান হবে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ নিজের সদ্য তৈরি হওয়া একটি গান গাইবেন। সেই গান শুরু করার আগে তিনি মৃদু গলায় বলে নিলেন, ‘আমার গান তো আর ইংরেজিতে হতে পারে না। তাই বাংলাতেই গান গাইছি।’
এইবার সম্মেলনের প্যান্ডেল ভরে গেল এক অলৌকিক দিব্য কণ্ঠস্বরে। এমন গান কেউ কখনো শোনেননি। রবীন্দ্রনাথ চোখ বন্ধ করে গেয়ে চলেছেন, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।’
ধ্রুপদ-ধামার নয়, নিতান্ত মেঠো বাউলের সুরে ভরে উঠছে মঞ্চ। কোট-প্যান্ট পরে চেয়ারে বসে থাকা নেতাদের মধ্যে সেই মেঠো সুর যেন গেরুয়া পোশাক পরে একতারা হাতে ঘুরে বেড়াতে লাগল।
এইবার শুরু হল আসল লড়াই। এমন বিচিত্র লড়াই কেউ কখনো দেখেননি। যে মুহূর্তে কোনো নেতা ইংরেজিতে ভাষণ শুরু করতে যাচ্ছেন, অমনি অবনীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে একদল যুবক গলা ছেড়ে চেঁচিয়ে উঠছেন, ‘বাংলা! বাংলা!’ ঘাবড়ে গিয়ে থেমে যাচ্ছেন ডব্লু সি বোনার্জি বা সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জির মতো অভিজ্ঞ নেতারাও। তাঁরা কখনো এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হননি। সভায় মতান্তর হয়, শিষ্টভাবে তীব্র প্রতিবাদ আসে, যুক্তি আর প্রতি-যুক্তিতে মুখর হয়ে ওঠে সভা— এসবই তাঁদের জানা আছে। কিন্তু একদল যুবক মাতৃভাষার জন্য গলা ছেড়ে চিৎকার করছে, এমন ঘটনা এর আগে কখনো কোথাও ঘটেনি। মঞ্চের একপাশে স্থির হয়ে বসে আছেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর ঠোঁটে ফুটে উঠেছে রহস্যময় হাসি। তিনি জানেন— ঠাকুরবাড়ির ছেলেরা যে কেবল নাটক করে, গান গায় আর ছবি আঁকে, এই ধারণা আজকের পর থেকে এই নেতারা ত্যাগ করতে বাধ্য হবেন।
দু-তিনবার চেষ্টার পর হাল ছেড়ে দিলেন দুঁদে নেতারাও। তারপর বলতে উঠলেন লালমোহন ঘোষ। কয়েক মুহূর্তের জন্য সামনে বসে থাকা শ্রোতাদের দিকে তাকিয়ে তিনি বলে উঠলেন, ‘প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আজ আমরা এখানে সমবেত হয়েছি...।’
তার পরের কথাগুলো অবশ্য আর শোনা গেল না, কারণ ততক্ষণে তুমুল হর্ষধ্বনিতে ডুবে গিয়েছে তাঁর কণ্ঠস্বর। সমস্ত প্যান্ডেল মুখরিত হয়ে উঠেছে হাততালি আর জয়ধ্বনিতে। লালমোহন হাসি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে রইলেন ধৈর্য ধরে। তারপর আড়চোখে একবার তাকালেন রবীন্দ্রনাথের দিকে।
সেই দেবোপম মুখে এখন আরও স্পষ্ট হয়েছে হাসির রেখা। দুই চোখে সন্তুষ্টির স্পষ্ট চিহ্ন। বাংলা ভাষার জন্য প্রথম লড়াইটা আজ তাঁরা জিতে গিয়েছেন।
অবনীন্দ্র পাশে বসা দীপেন্দ্রনাথকে বললেন, ‘চাঁইদেরও অবশেষে ঘাড় পাততে হল তাহলে, অ্যাঁ? আজ রাতে পাঁঠার মাংস আর লুচি খাব।’