শান্তনু দত্ত: নারি আঁকতে বসলে পাহাড়ে কী রং কর তোমরা? বাদামি। তাই তো? শেডের জন্য কালো আর সাদা মিশিয়ে নাও অনেক সময়। আচ্ছা কখনো অন্য কোনো রং দেওয়ার কথা ভেবেছ? নীল, লাল, হলুদ, সবুজ— আরও কত কী! নিশ্চয়ই না। তবে জানো কি, এমন পাহাড় কিন্তু বাস্তবে রয়েছে, যার রং বাদামি বা সাদায় মোড়া নয়। বিভিন্ন রঙে ঢাকা সেই পাহাড়। চল বিশ্বের এমন কয়েকটি পাহাড়ের বিষয়ে জেনে নিই—
পেইন্টেড হিলস, আমেরিকা
আমেরিকার ওরেগন অঞ্চলে অবস্থিত ‘পেইন্টেড হিলস’। এই পাহাড়গুলির গায়ে লাল, কমলা, হলুদ, সোনালি আর কালো রঙের স্তর দেখা যায়। দেখে মনে হবে, কেউ রংতুলি দিয়ে গোটা পাহাড় রাঙিয়ে দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, বহু বছর আগে এখানে আগ্নেয়গিরির ছাই ও নানা ধরনের মাটি জমে এই রঙিন স্তর তৈরি হয়েছিল। পরে বৃষ্টি ও বাতাসের জন্য পাহাড়ের ভিতরের স্তরগুলি ধীরে ধীরে বাইরে বেরিয়ে আসে। দিনের বিভিন্ন সময়ে সূর্যের আলো পড়লে পাহাড়ের রংও কিছুটা বদলে যায়। তাই সকালে ও বিকেলে এই পাহাড়গুলির সৌন্দর্য আরও বেশি চোখে পড়ে। মাটির গঠন আলাদা হওয়ায় এখানে খুব কম গাছপালা জন্মায়। প্রতিবছর বহু পর্যটক ও ফোটোগ্রাফার এই সুন্দর পাহাড় দেখতে আসেন।
মাউন্ট ব্রোমো, ইন্দোনেশিয়া
ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব জাভা অঞ্চলে অবস্থিত মাউন্ট ব্রোমো একটি বিখ্যাত আগ্নেয়গিরি। তেঙ্গের পর্বতশ্রেণির অংশ। পাহাড়টির চারপাশে বিশাল ধূসর বালির এলাকা রয়েছে, যাকে ‘সি অব স্যান্ড’ বলা হয়। কালো, ধূসর ও বাদামি রঙের এই অঞ্চল দূর থেকে দেখলে স্বর্গীয় মনে হবে। মাঝে মাঝে আগ্নেয়গিরি থেকে ধোঁয়াও বের হতে দেখা যায়। সূর্য ওঠার সময় মাউন্ট ব্রোমোর দৃশ্য সবচেয়ে সুন্দর লাগে। তখন আকাশের আলো পাহাড়ের ওপর পড়ে এক অসাধারণ পরিবেশ তৈরি করে। স্থানীয় তেঙ্গের জনগোষ্ঠীর কাছে এই পাহাড় খুবই পবিত্র। তারা প্রতি বছর এখানে বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করেন। পর্যটকেরা ঘোড়ায় চড়ে বা হেঁটে আগ্নেয়গিরির কাছে পৌঁছন। মাউন্ট ব্রোমো শুধু একটি পাহাড় নয়, এটি প্রকৃতির শক্তি ও সৌন্দর্যের এক অনন্য উদাহরণ। তাই এটি ইন্দোনেশিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র।
ঝ্যাংয়ে দানশিয়া, চীন
চীনের গানসু প্রদেশে অবস্থিত ঝ্যাংয়ে দানশিয়া পৃথিবীর রঙিন পাহাড়গুলির একটি। লাল, হলুদ, কমলা, সবুজ ও বাদামি রঙের স্তর দেখা যায় এখানে। বিশাল ক্যানভাসে নানা রঙের আঁচড় কাটলে যেমন লাগে, এই পাহাড়গুলি তেমনই। বিজ্ঞানীদের মতে, কয়েক কোটি বছর ধরে খনিজ পদার্থ জমে এবং বাতাস, বৃষ্টির প্রভাবে এই রঙিন পাহাড় তৈরি হয়েছে। এই অঞ্চলকে ‘দানশিয়া ল্যান্ডফর্ম’ বলা হয়। চীনের সরকার এই এলাকাকে সংরক্ষিত ঘোষণা করেছে। এখানকার রং সূর্যের আলো অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। সকাল ও বিকালে পাহাড়ের রং আরও উজ্জ্বল দেখায়। এই জায়গা ফোটোগ্রাফারদের কাছে খুব জনপ্রিয়। প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক এই আশ্চর্য প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে আসেন। প্রকৃতির সৃষ্টি যে কত সুন্দর হতে পারে, ঝ্যাংয়ে দানশিয়া তার অসাধারণ প্রমাণ।
হর্নোকাল, আর্জেন্তিনা
আর্জেন্তিনার আন্দিজ পর্বতমালায় অবস্থিত হর্নোকাল পাহাড়কে ‘চোদ্দো রঙের পাহাড়’ বলা হয়। পাহাড়টির গায়ে লাল, সবুজ, হলুদ, কমলা, সাদা ও বেগুনি রঙের স্তর দেখা যায়। এর নেপথ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের খনিজ ও পাথরের উপস্থিতি। বহু লক্ষ বছর ধরে ভূমিকম্প ও প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ফলে এই পাহাড় তৈরি হয়েছে। হর্নোকাল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৪ হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত। সূর্যের আলো পড়লে পাহাড়ের রং আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বিশেষ করে বিকালের দিকে এর সৌন্দর্য মনোমুগ্ধকর। পাহাড়টির আশপাশে খুব কম মানুষ বসবাস করেন। তবুও প্রতিবছর বহু পর্যটক এই আশ্চর্য পাহাড় দেখতে আসেন। অসাধারণ রং ও আকৃতির জন্য হর্নোকাল পৃথিবীর অন্যতম বিখ্যাত রঙিন পাহাড় হিসেবে পরিচিত।
রেনবো মাউন্টেন, পেরু
দক্ষিণ আমেরিকার পেরুর আন্দিজ পর্বতমালায় অবস্থিত রেনবো মাউন্টেন পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর প্রাকৃতিক বিস্ময়। এই পাহাড়ের আরেক নাম ভিনিকুনকা। পাহাড়টির গায়ে লাল, গোলাপি, সবুজ, হলুদ ও সাদা রঙের অসাধারণ স্তর দেখা যায়। লক্ষ বছর ধরে বিভিন্ন খনিজ পদার্থ জমে এমন রং তৈরি হয়েছে। লোহার উপস্থিতিতে লাল রং, তামার কারণে সবুজ এবং সালফারের কারণে হলুদ রং দেখা যায়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৭ হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই পাহাড়ে পৌঁছনো কিন্তু সহজ নয়। পর্যটকদের অনেকটা পথ হেঁটে উঠতে হয়। তবে উপরে পৌঁছলে চারপাশের দৃশ্য সকলকে মুগ্ধ করে। শীতের সময় পাহাড়ের ওপর বরফও দেখা যায়।
ভারতেও দেখা মেলে এমন রঙিন পাহাড়ের। লাদাখে বিশেষত শ্রীনগর-লাদাখ হাইওয়ে বরাবর দ্রাস যাওয়ার পথে চোসকার গ্রামের কাছাকাছি রঙিন পাহাড়ের দেখা পাবে। আবার, ঝাড়গ্রামের বেলপাহাড়িতেও রঙিন পাহাড় দেখা যায়। বেলপাহাড়ির প্রত্যন্ত এলাকা ওদলচুয়ায় রয়েছে সেই সুন্দর রঙিন পাহাড়। স্থানীয়রা একে খাদান ডুংরি বলেন। একেবারে রঙিন পাথর দিয়েই তৈরি হয়েছে এই পাহাড়।