Bartaman Logo
৩১ মে, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

এভারেস্ট অভিযান

২০১০ সালে বাংলা থেকে চারবার এভারেস্ট অভিযান হয়েছিল। কিন্তু সাফল্যের মুখ প্রথম দেখেছিলাম আমরাই। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় আড়াই ডজন এভারেস্ট জয়ী পেয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। দেবাশিস বিশ্বাস।

এভারেস্ট অভিযান
  • ৩১ মে, ২০২৬ ০৪:০০

২০১০ সালে বাংলা থেকে চারবার এভারেস্ট অভিযান হয়েছিল। কিন্তু সাফল্যের মুখ প্রথম দেখেছিলাম আমরাই। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় আড়াই ডজন এভারেস্ট জয়ী পেয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। দেবাশিস বিশ্বাস।

Advertisement

মাউন্ট এভারেস্ট। হিমালয় পর্বতমালার পিক ফিফটিন। উচ্চতা ৮,৮৪৮ মিটার। হিসাব তো সেই উনিশ শতকের মাঝামাঝিই জানিয়ে দিয়েছিল, এই হল পৃথিবীর উচ্চতম শৃঙ্গ। ২৯ মে, ১৯৫৩ এভারেস্ট শীর্ষে দাঁড়িয়ে আকাশকে ছুঁয়েও ফেলেছে মানুষ। সেই থেকে এই দিনটি বিশ্বজুড়ে পরিচিত ‘এভারেস্ট ডে’ হিসাবে। তেনজিং নোরগে আর এডমন্ড হিলারির সেই অসাধ্য সাধনও কি কম দিন হল? তবু সাধ মেটেনি মানুষের। আজও তাই দলে-দলে মানুষ সেই রূপকথাই আবার লিখতে চায়। নতুন করে।
সেই রূপকথাই নিজেদের মতো করে লিখতে চেয়ে একদিন এভারেস্টের দিকে পা বাড়িয়েছিলাম আমরা। দিনটা ছিল পয়লা এপ্রিল, ২০১০। দু’জন ক্লাইম্বিং মেম্বার—বসন্ত সিংহ রায় ও আমি। তিনজন সাপোর্টিং মেম্বার—অশোক রায়, বিভাস সরকার ও সৌরভ সিঞ্চন মণ্ডল।
কলকাতা বিমানবন্দর থেকে কাঠমাণ্ডু। শেরপা বন্ধু পেম্বা নিতে এলেন এয়ারপোর্টে। তাঁর কাছ থেকেই মিলল একটা খারাপ খবর। তিব্বতের দিক থেকে আমাদের যাওয়ার অনুমতি মেলেনি। চীন সরকার কোনো ভারতীয়কে তিব্বতে ঢোকার অনুমতি দিচ্ছে না। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। এত আয়োজন, এত খরচ, এত স্বপ্ন—সব ব্যর্থ হবে শুধু প্রশাসনিক আর কূটনৈতিক কারণে? তবে আমাদের এজেন্সির চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত নেপাল থেকে এভারেস্টে যাওয়ার অনুমতি মিলল। তিব্বতের দিক থেকে, অর্থাৎ, নর্থ কল দিয়ে অভিযান হবে না। যেতে হবে, সাউথ কল দিয়ে। খরচ কিছুটা বাড়বে।
দু’-একদিন কেটে গেল আশেপাশে ঘুরে-বেড়ানো, পর্বতারোহণের যন্ত্রপাতি কেনাকাটার মধ্যে দিয়ে। ৫ এপ্রিল শুরু হল যাত্রা। ছোটো প্লেনে মাত্র আধঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম লুকলার হিলারি-তেনজিং এয়ারপোর্ট। উচ্চতা ২,৮৪২ মিটার। এই রুটের নামও হিলারি-তেনজিং রুট।
পরদিন, ট্রেকিং শুরু হল সকাল সোয়া আটটায়। উত্তরমুখে পথ। চওড়া রাস্তা, দুধকোশী নদী বরাবর। কখনো ব্রিজ ধরে বাঁদিক থেকে ডানদিক, কখনো আবার ডানদিক থেকে বাঁদিক হয়ে এগিয়ে চলা। ছিপলাং, নারনিং পার হয়ে পৌঁছালাম ফাকদিং (২,৬১০ মিটার)। সেখানে দুপুরে খাওয়া সেরে ফের পথ চলা। এরপর বেঙ্কার থেকে নদী পেরিয়ে কিছুটা চড়াই ভাঙতে হল। পথে পড়ল মঞ্জু নামে ছবির মতো সুন্দর এক গ্রাম। এখানেই সাগরমাথা স্যাংচুয়ারি পার্কের প্রবেশপথ। এরপর দড়ির ব্রিজ ধরে ফের দুধকোশী নদী পেরিয়ে পৌঁছলাম জোরসালে (২,৭৪০ মিটার)। পরদিন দুধকোশী নদীর ব্রিজ পার হয়ে শুরু হল টানা চড়াই। অনেকটা ওঠার পর চোখে পড়ল পাথর দিয়ে সাজানো কিছুটা চওড়া একটি জায়গা। নাম, এভারেস্ট ভিউ পয়েন্ট। সেখান থেকেই প্রথম দেখা মিলল সেই রূপকথার রানির—মাউন্ট এভারেস্ট। সেখান থেকে আরও অনেকটা উঠে পৌঁছলাম নামচে বাজারে (৩,৪৪০ মিটার)।
পরের দিন নামচে বাজার থেকে পৌঁছালাম স্যাংবোচে। এখানে রয়েছে ছোট্ট একটি এয়ারস্ট্রিপ। মাটি, বালি, নুড়ি-পাথরের মধ্যেই ওঠানামা করছে ছোটো ছোটো বিমান। এগুলি মূলত ব্যবহৃত হয় মালপত্র নিয়ে যাওয়ার জন্য। আর একটু উপরেই এভারেস্ট ভিউ হোটেল। এখান থেকে চোখে পড়ে এভারেস্ট, লোৎসে আর নুপৎসের চমৎকার দৃশ্য। ডানদিকে আমা দাবলাম। মনভোলানো রূপ তাদের। এই টানেই শত বিপদ অস্বীকার করে এতদূর ছুটে আসা। কিছুটা উঠে আসার পর অনেকটা নীচে দেখা গেল সুন্দর দু’টি গ্রাম—খুন্দে আর খুমজুং। একসময় গ্রামদু’টি নেহাতই ছোটো ছিল। তবে, এখন বেশ বর্ধিষ্ণু। গোটাটাই স্যর এডমন্ড হিলারির কৃতিত্ব। তাঁর হাত ধরেই এখানে গড়ে উঠেছে হাসপাতাল, স্কুল, বাজার। 
নামচে বাজার ছাড়িয়ে পথ উত্তর-পূর্ব অভিমুখে। চোখের সামনে এভারেস্ট, লোৎসে আর নুপৎসে, একটু ডানদিকে বিখ্যাত আমা দাবলাম, নীচে দুধকোশী নদী। আরও কিছুটা উঠে পৌঁছালাম তেসিং (৩৩৮০ মিটার)। ব্রিজ ধরে পের হতে হল দুধকোশী নদী। সামনে খাড়া চড়াই। কিছুটা এগতেই পড়ল এক চৌমাথা। কোন দিক থেকে আসা, আর গন্তব্যই বা কোনদিকে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দেয় এই চৌমাথা। আমরা এসেছি নামচে বাজার থেকে, বাঁ দিকের পথ এসেছে খুমজুং গ্রাম থেকে। সোজা উপরের দিকে গোকিও যাওয়ার পথ, আর ডানদিকে আমাদের গন্তব্য—ট্যাংবোচে। তেসিং থেকে খাড়া পথে পাহাড়ের একেবারে মাথায় এই ট্যাংবোচে (৩৮৬০ মিটার)। ট্যাংবোচে ছাড়িয়ে কিছুটা যাওয়ার পর আসে প্যাংবোচে। এখানে রয়েছে এই অঞ্চলের প্রাচীনতম বৌদ্ধগুম্ফা।
এবার উত্তর-পূর্ব দিকে ইমজা খোলা নদী বরাবর রাস্তা। এখান থেকে পথ আরও রুক্ষ। আর দেখা মেলে না বড়ো গাছগাছালির। ১২টা নাগাদ পৌঁছালাম ডিংবোচে। সেখানেই রাত্রিবাস। পরদিন ডিংবোচে ছাড়িয়ে আরও ওঠা। পথে নানা ধরনের প্রেয়ার ফ্ল্যাগ দিয়ে সাজানো অনেক চোর্তেন। ডিংবোচে থেকে দিক বদলে এবার উত্তর-পশ্চিম বরাবর যাত্রা। পথের সঙ্গী বলতে শুধু জুনিপারের ঝোপ আর পাথর-নুড়ি।য
এই পথ ধরে চলতে চলতে এল থোকলা (৪৬২০ মিটার)। ডানদিকে খুম্বু গ্লেসিয়ার। লোৎসের পায়ের কাছ থেকে শুরু হয়ে এই থোকলাতে এসেই শেষ হয়েছে খুম্বু গ্লেসিয়ার। এবার পথ খুম্বু-র ডান দিক ধরে প্রায় উত্তর মুখে। পরদিন থোকলা থেকে যাত্রা শুরু হল সকাল আটটায়। টানা লম্বা চড়াই। ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে পৌঁছালাম লেবুচে। পরদিন যাত্রা শুরু সকাল আটটায়। চারপাশে নামী-অনামী বিভিন্ন শৃঙ্গ। গাছপালা-ঝোপঝাড়ের কোনো চিহ্ন নেই। বরফের সঙ্গে পাথর, মাটি আর নুড়ি। বিভিন্ন ছোটো-ছোটো মোরেনের মধ্যে দিয়ে রাস্তা। 
সামনেই পুমোরি শৃঙ্গ (৭১৩৪ মিটার)। এর ডানপাশে লিংটার্ন (৬৭১৩ মিটার), আরও ডানে খুমবুৎসে (৬৬৩৯ মিটার)। তার পাশেই লোলা পাস। এর পিছনে তিব্বতের দিক থেকে উঁকি মারছে ছাংসে শৃঙ্গ। যাঁরা নর্থ কল দিয়ে এভারেস্ট আরোহণ করেন, তাঁদের এই ছাংসে শৃঙ্গকে ডানদিকে রেখে, বাঁ পাশ দিয়ে উঠে যেতে হয়। আর, লোলার ডানদিকের অংশটি আলাদা কোনও শৃঙ্গ নয়, এটি এভারেস্টেরই ওয়েস্ট শোল্ডার (৭২৬৮ মিটার)। এর পাশ থেকেই উঁকি মারছে নুপৎসে। এভারেস্টের ওয়েস্ট শোল্ডার আর নুপৎসের মাঝের ফাঁক দিয়ে কখনো-কখনো দেখা মেলে তার। যার উদ্দেশে এই দুর্গম যাত্রা। মাউন্ট এভারেস্ট!
ঘড়ির কাঁটা এগারোটা ছুঁতে ছুঁতেই পৌঁছে গেলাম গোরোকশেপ। সামান্য কিছু জলযোগ করেই ফের রাস্তায় পা। গন্তব্য—এভারেস্ট বেসক্যাম্প (৫৩৬৪ মিটার)। গোরোকশেপ থেকে বাঁদিকে, ঠিক উত্তরে কালাপাত্থর। এই কালাপাত্থরের পাশ কাটিয়ে উত্তর-পূর্ব দিকে এগিয়ে ঘণ্টা দুয়েকে পৌঁছালাম বেসক্যাম্পে। এই বেসক্যাম্পজুড়ে রয়েছে বিভিন্ন টিমের সুদৃশ্য সব তাঁবু। তার মধ্যেই নিজেদের অস্থায়ী ঘরদোর সাজিয়ে নেওয়া পালা শুরু হল। ক্যালেন্ডারের পাতায় সেটা ১৪ এপ্রিল। টাঙিয়ে নেওয়া হল তাঁবু। সঙ্গে কিচেন, টয়লেট টেন্ট। কিচেন টেন্টের পিছনেই দুই কুক লীলাবতী ও বুদ্ধি, আর সহযোগী সন্তোষ রানার জন্য তাঁবু। কিচেনের সামনে আরেকটি তাঁবু পেম্বা ও পাসাং শেরপার জন্য। এরপর তৈরি হল ডাইনিং টেন্ট। তার পাশেই মেম্বারদের জন্য তিনটি তাঁবু। মাঝের ফাঁকা চত্বরই আপাতত সবার আড্ডা, আলোচনার জায়গা। আর সব শেষে তৈরি হল মন্দির।
পাশ দিয়ে চলে গিয়েছে রাস্তা। শরীরটা ঝালিয়ে নিতে ১৮ তারিখ উঠলাম খুম্বু আইসফলে। চলল বিভিন্ন ধরনের শারীরিক কসরত, ক্লাইম্বিং প্র্যাকটিস। সেই প্র্যাকটিসও কম রোমহর্ষক নয়। কখনো খাড়াই বেয়ে উঠে যাওয়া, কখনো আবার ল্যাডার বেয়ে বরফের চওড়া ফাটল ক্রিভাস টপকানো। প্রতিটা ধাপ যেন হাঁ করে থাকা মৃত্যুকে অস্বীকার করে দুরন্ত ট্র্যাপিজে মেতে ওঠা। 
কিছুটা ঘাম ঝরানো, কিছুটা রপ্ত করে নেওয়ার চেষ্টা। পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রয়াস। সব মিলিয়ে পরিশ্রম মন্দ হল না। তাই বেসক্যাম্পে ফিরে এসে খাওয়া-দাওয়া ছিল খুব জরুরি। সঙ্গে মন হালকা রাখতে সহযাত্রী, শেরপা ও বাকিদের সঙ্গে আড্ডা। 
১৯ তারিখ হল পুজো। শেরপাদের কাছে এ এক অবশ্য পালনীয় বৌদ্ধিক উপাচার। লামারা এসে শুরু করলেন পুজোপাঠ। ঈশ্বরের কাছে সুস্থ যাত্রার প্রার্থনা শেষে টাঙানো হল প্রেয়ার ফ্ল্যাগ। পরদিন, ২০ এপ্রিল ক্যাম্প ওয়ানের দিকে রওনা দিল শেরপারা। ২১ তারিখ ভোর রাতে বেরিয়ে পড়লাম আমরা দু’জন। তিন সাপোর্টিং মেম্বার অশোক রায়, বিভাস সরকার ও সৌরভ সিঞ্চন মণ্ডল থেকে গেল বেসক্যাম্পে। খুম্বু আইসফলের মাঝ দিয়ে উঠে যাওয়া। চারিদিকে বিচিত্র সব আকৃতির বরফ। জগতের শ্রেষ্ঠ আর্কিটেক্টের আশ্চর্য সৃষ্টি। ঈশ্বরের নিপুণ ভাস্কর্য। সেসব পাশ কাটিয়ে এগিয়ে চলা। কখনো দড়ি টেনে এগনো, কখনো আবার মই বেয়ে ওঠা। মৃত্যুর হাতযশ এখানে নেহাত মন্দ নয়। তাই বাড়তি সতর্কতা। কিন্তু দম ধরে রাখাই যেন দায়। প্রায় দশ ঘণ্টার নিরলস যাত্রার পর পৌঁছালাম ক্যাম্প ওয়ান। নুপৎসের পায়ের কাছে এই ক্যাম্প ওয়ান (৬০০০ মিটার)। এখানেও রয়েছে দেশ-বিদেশের বহু পর্বতারোহীর তাঁবু। নানা রঙের, নানা রকমের। সামনে এক সুপ্রশস্ত ময়দান, সীমাহীন বরফ। এই এলাকাটিকে বলা হয়, ‘ভ্যালি অব সাইলেন্স’। এখানে একটি তাঁবুতে আমাদের থাকার বন্দোবস্ত হল। সেখানেই রান্না-খাওয়া। বরফ কেটে গরম করে তৈরি হল খাওয়ার জল।
একদিন পর, ২২ তারিখ নেমে এলাম বেসক্যাম্পে। পর্বতারোহণের এমনটাই নিয়ম। পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে, ওঠা-নামা যাতায়াতের খেলা নিরন্তর চলতে থাকে। পরের তিনদিন বেসক্যাম্পেই রইলাম। সেই সময়ের মধ্যেই শেরপা আর কুকের দল পাড়ি দিয়েছে ক্যাম্প টু আর থ্রি’র উদ্দেশে। লক্ষ্য, ক্যাম্প প্রস্তুত করে রাখা।
ফের যাত্রা শুরু হল ২৬ এপ্রিল। বন্ধুর পথ এখন অনেকটাই ‘বন্ধু’। তাই সময় লাগল কম। ঘন্টাছয়েকের মধ্যে আমরা পৌঁছে গেলাম ক্যাম্প ওয়ান। পরদিন যাত্রা শুরু হল ক্যাম্প টু’র উদ্দেশে। একটু দক্ষিণ ঘেঁষে পূর্বদিকে এগিয়ে যাওয়া। একদম বাঁদিকে এভারেস্ট ওয়েস্ট শোল্ডার, আর তারপরেই নেমে এসেছে মাউন্ট এভারেস্টের ঢাল। সোজা গিয়ে যেখানে মিশেছে খুম্বু গ্লেসিয়ার, ওইটাই লোৎসে। ৮৫১৬ মিটার, পৃথিবীর চতুর্থ উচ্চতম শৃঙ্গ। ডানদিকে গোটাটাই নুপৎসে গিরিশিরা। তিনদিক ঘেরা পাথুরে দেওয়ালে, মাঝে বরফের ময়দান। এটা ‘ওয়েস্টার্ন কুম’ নামে পরিচিত। এই পথেই উঠে ঘণ্টাদুয়েকের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম ক্যাম্প টু’তে (৬৪০০ মিটার)। এভারেস্টের ঢালের ঠিক পাশে। উত্তর-পশ্চিম দিক ছাড়া আর সবদিকই ঢাকা। উত্তর-পূর্ব দিকে এভারেস্ট, পূর্বে সাউথ কল। দক্ষিণ-পূর্বে লোৎসে আর দক্ষিণ থেকে পশ্চিম দিক পর্যন্ত নুপৎসের রিজ দিয়ে ঘেরা। বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এই ক্যাম্প টু। সেখানেও পড়েছে নানা দলের তাঁবু। তাদের পাশে লাগানো হল আমাদের তাঁবু আর কিচেন টেন্ট।
২৯ এপ্রিল। এবার ক্যাম্প টু ছাড়িয়ে উঠে যাওয়া ৭৩০০ মিটার উচ্চতায় ক্যাম্প থ্রি’র উদ্দেশে। সামনে অনেকটা বরফের ময়দান। হালকা চড়াই। ঘণ্টাদুয়েক চলার পর শেষ হল সেই ঢাল। এবার খাড়া বরফের ঢাল। লোৎসে ফেসের দেওয়াল বরাবর উঠে যাওয়া। পিছনে ফিরলেই চোখে পড়ছে ক্যাম্প টু এলাকা। সামনে অজানা ভবিষ্যৎ। দড়িতে জুমার লাগিয়ে ঠেলে-ঠেলে সাবধানে চলা। প্রতি মুহূর্তে দমবন্ধ করা আরোহণ। অনেকটা উঠে লাগানো হল ক্যাম্প থ্রি’র তাঁবু।
পরদিন আবার নেমে এলাম ক্যাম্প টু। পয়লা মে ফের বেসক্যাম্পে। এবার দীর্ঘ অপেক্ষা। ওয়েদার ফোরকাস্ট থেকে কবে মিলবে সবুজ সংকেত? শৃঙ্গে আরোহণের আদর্শ পরিবেশ। অবশেষে খবর মিলল, ১৬ থেকে ১৮ মে আবহাওয়া থাকবে আদর্শ। হাওয়া থাকবে কম। ১৬ তারিখের লক্ষ্য মাথায় নিয়ে বেসক্যাম্প থেকে বেরিয়ে পড়া হল চূড়ান্ত যাত্রায়। সেটা ১২ মে।
সেদিনই পৌঁছে গেলাম ক্যাম্প টু। পরদিনটা কাটল সেখানেই। ১৪ মে পৌঁছে গেলাম ক্যাম্প থ্রি। এখান থেকেই স্যাকে নিয়ে নেওয়া হল চার লিটারের একেকটি অক্সিজেন সিলিন্ডার। এরপর থেকেই লাগবে বাড়তি অক্সিজেন। দিনটা ১৫ মে। ফের বেরিয়ে পড়া। লক্ষ্য ক্যাম্প ফোর। উঠে যেতে হবে ৭,৯৫৫ মিটার উচ্চতার সাউথ কলে।
টানা বরফের ঢাল। লোৎসের গা বেয়ে অনেকটা উঠে আড়াআড়িভাবে উত্তর-পূর্ব দিকে এগিয়ে যাওয়া। এরপর পড়ল ইয়েলো ব্যান্ড—হলুদ পাথরের দেওয়াল। ফের বরফের ময়দান। এগিয়ে চলা আরও উত্তর-পূর্বে। তারপর এল কালো পাথরের এক দেওয়াল। জেনিভা’স স্পার। দেওয়াল টপকে, আরও আধঘন্টা চলার পর পৌঁছালাম সাউথ কল। সাউথ কলের উত্তরে মাউন্ট এভারেস্ট, আর দক্ষিণে লোৎসে। জায়গাটা প্রকৃত অর্থেই ‘ডেথ জোন’। বাতাসে অক্সিজেন নেই বললেই চলে। বসে থাকলেও শ্বাসকষ্ট হয়। একদিকে জয়ের আহ্বান, অন্যদিকে মৃত্যুর নিশিডাক।
ঠিক ছিল, তাঁবুতে কয়েক ঘণ্টা বিশ্রাম নিয়ে সেদিন রাতেই রওনা দেব শীর্ষ আরোহণের উদ্দেশ্যে। কিন্তু সন্ধ্যা থেকেই শুরু হল প্রবল হাওয়া। বাধ্য হয়ে সেদিন সাউথ কলে থেকে যেতে হল। পরদিন, ১৬ মে রাত আটটা নাগাদ রওনা হলাম চূড়ান্ত গন্তব্যের লক্ষ্যে। সঙ্গে লাগেজ বলতে পিঠের স্যাকে চার লিটারের অক্সিজেন সিলিন্ডার। হেড টর্চ। সামান্য ওষুধপত্র আর জলের বোতল। এবং অবশ্যই স্মৃতিকে আটকে রাখার অনিবার্য সঙ্গী ক্যামেরা। তাপমাত্রা মাইনাস পঁচিশ ডিগ্রির কাছে। সময় যত গড়াবে, উচ্চতা বাড়বে। আরও জাঁকিয়ে বসবে ঠান্ডা। কে জানত, বোতলের জলও আর মিলবে না! ততক্ষণে সব বরফ। এভাবেই সারা রাত পথ চলা। অতি সন্তর্পণে। দড়িতে জুমার লাগিয়ে, ঠেলে-ঠেলে। ভোর চারটে নাগাদ চারপাশে তৈরি হল একটা আলোক বলয়। কিছু পরে সূর্য উঠল। পশ্চিম আকাশের গায়ে ছায়া পড়েছে এভারেস্টের। এক অপূর্ব নিসর্গ। সামনেই সাউথ সামিট। এভারেস্টের দক্ষিণে ছোট্ট এক শৃঙ্গ। এরপর পড়ল ‘হিলারি স্টেপ’। সেটা টপকে হালকা ঢাল বেয়ে উঠে এলাম এভারেস্টের মাথায়। ঘড়িতে তখন সকাল সাতটা পঁয়তাল্লিশ। দক্ষিণ-পূর্বে মাকালু, দক্ষিণে লোৎসে। উপরে আকাশ ছাড়া আর কিছু নেই। নীচে গোটা পৃথিবী।
এখানে চীন ও নেপাল সরকার মিলে দু’টি ধাতব স্তম্ভ স্থাপন করেছে। তার উপরে বিভিন্ন প্রেয়ার ফ্ল্যাগ বা খাদা জড়ানো। যা দেখে চেনা যায় এটিই এভারেস্টের শীর্ষ, পৃথিবীর সর্বোচ্চ বিন্দু।
আমার সঙ্গেই ছিল পেম্বা, মিনিট চল্লিশ বাদে উঠে এলেন বসন্তদা। আরও আধ ঘণ্টা বাদে পাশাং শেরপা। এরপর পুজো দেওয়া হল। ন’টার সময় শুরু হল ফেরার পালা। একই রাস্তায় ফিরে বেলা একটায় পৌঁছে গেলাম ক্যাম্প ফোর। সেদিন ক্যাম্প ফোরেই বিশ্রাম। পরদিন নেমে এলাম ক্যাম্প টু। ১৯ মে চলে এলাম বেসক্যাম্প। পরবতী দু’দিন চলল প্যাকিং। ২২ তারিখ সকালে ফেরার পথ ধরা। নামচে হয়ে লুকলা পৌঁছালাম ২৪ মে। সেখান থেকে ছোটো প্লেনে পরদিন কাঠমাণ্ডু। ২৭ মে বিমানে নামলাম কলকাতা।
এই দমদম বিমানবন্দর থেকেই পয়লা এপ্রিল কাঠমাণ্ডু উড়ে গিয়েছিলাম আমরা পাঁচজন। যেখান থেকে শুরু হয়েছিল, সেখানেই শেষ হল এই কাহিনি। আর যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল ঈশ্বরের সেই সাধের নির্মাণ, মাউন্ট এভারেস্ট, সেও সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে অবিকল। শুধু মাঝের ক’টা দিন কেটে গিয়েছে স্বপ্নের মতো। মাঝের এতটা পথ জুড়ে লেখা হয়েছে একটা নতুন রূপকথা। অনেকে আজ যাকে ইতিহাস বলেন।
• গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল 
• সহযোগিতায় : বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী

সম্পর্কিত সংবাদ