অর্ক দে, কলকাতা: গত দু’দশকে কলকাতার শারদোৎসব স্রেফ পুজো-অর্চনাতেই থেমে নেই। শিল্পের প্ল্যাটফর্মও বটে। গ্ল্যামার-গ্যাঞ্জারে ক্রমশ বেড়েই চলেছে বাঙালির প্রাণের উৎসব। থিমে একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার লড়াই চলছে জোরকদমে। আর এবার তারই কেন্দ্রবিন্দুতে দুই শিল্পী সুশান্ত শিবানী পাল এবং ভবতোষ সুতার। তাঁরা অবশ্য বিষয়টিকে ‘থিমোৎসবের যুদ্ধ’ হিসেবে দেখতে নারাজ। কিন্তু হাতিবাগান-গড়িয়াহাট মার্কেটের গন্ধ গায়ে মেখে পুজোপ্রেমীদের আলোচনা তা নিয়েই চলছে।
শহরের দুর্গাপুজোয় শিল্পীবদল নতুন নয়। তবে এবার টালা পার্ক প্রত্যয়ের সেন্টিনারিতে সুশান্ত নেই! গত বছর দশমীতে অবশ্য তাঁর নামই ঘোষণা কর হয়েছিল। কিন্তু তারপরেই ভোলবদল। অস্বস্তি কাটিয়ে ভবতোষ সুতারের সঙ্গে চুক্তি করে তারা। কিন্তু এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মুখে কুলুপ সংগঠকদের।
সুশান্ত এবং ভবতোষ— দু’জনই বড় শিল্পী। তাই টালা প্রত্যয়ে সুশান্তর অভাব পূরণ করা ভবতোষের কাছে নতুন চ্যালেঞ্জ। আর তা নিতে ভালোবাসেন বলেই শহরবাসীকে চিনিয়ে তিনি ছেড়েছেন বাগুইআটির অর্জুনপুরকে। এবার পুজোয় তাঁর একমাত্র ঠিকানা টালা প্রত্যয়।
অন্যদিকে, সুশান্ত পাল সামলাচ্ছেন কেন্দুয়া শান্তি সঙ্ঘ, বালিগঞ্জ কালচারাল এবং দমদম পার্ক ভারতচক্র। ভবর সঙ্গে ঠান্ডা লড়াই? না, না করে উঠে সুশান্তর যুক্তি, ‘কীসের লড়াই! এর আগে আমি টানা চার বছর নাকতলা উদয়ন সঙ্ঘে কাজ করার পর তা বর্তেছে ভবর উপর। মনে করে দেখুন, ২০০৫-২০০৮ পর্যন্ত আমি ছিলাম নাকতলায়। ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ভব সাজিয়েছে। ২০১৫ সালে শিবশংকর এই দুর্গাপুজোর দায়িত্ব পায়। ফের ২০১৬-১৮, টানা তিন বছর আমি নাকতলার পুজো সামলেছি। তারপর থেকে টালা প্রত্যয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। আমাদের মধ্যে কোনও মন কষাকষি নেই।’
টালা প্রত্যয়ের কাজ নিয়ে কি চাপে আছেন ভবতোষ? সুশান্তর সঙ্গে তাঁর দ্বৈরথ দেখছেন কোন আঙ্গিকে? শিল্পীর কণ্ঠস্বরে ঝরে পড়ল প্রত্যয়, ‘কোথাও কোন চাপ নেই। উল্টে গত ২৫ বছর ধরে যে চেষ্টা করেছি, সেটাই এবার পূরণ হয়েছে। টালা প্রত্যয়ের শতবর্ষ, আর আমার একটা পুজো। শান্তিতে তা নিয়েই ভাবছি। প্রতি বছর নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ থাকে। লড়াইটা তাই নিজের সঙ্গেই। আমি বা সুশান্ত, কেউ তো আর ভোটে দাঁড়াচ্ছি না। দু’জনেই শিল্পী, মননের চর্চা করি মাত্র।’
অন্যদিকে, টালা প্রত্যয়ের ‘হাইপ’ কি মিস করছেন সুশান্ত? উত্তরে কৌশলী ব্যাখ্যা শিল্পীর। বলেন, ‘পুজোর জায়গাটা সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। ফি বছর টালা প্রত্যয়ের পুজো প্রাঙ্গণের পরিধি বেড়েছে। গত বছর আমি ৩০ হাজার বর্গফুট এলাকায় শিল্পের ফুল ফুটিয়েছিলাম। কলকাতার অধিকাংশ পুজো কমিটির কাছে অত বড় জায়গা নেই।’ তবে তাঁর আত্মবিশ্বাস, ‘যেখানেই পুজোর কাজ করি না কেন, তার মান এবং চমক অবশ্যই আরও ভালো হবে। রেকর্ড ভেঙে তা গড়াই শিল্পীর লক্ষ্য।’
গত কয়েক বছরে দর্শনার্থীরা টালা প্রত্যয়ে এসে সুশান্তর ভাবনায় বিচরণ করেছেন কল্পলোকে। কোনও বছর ‘ঋতি’ থিমে মণ্ডপে চলেছে ভাঙাগড়ার খেলা। কখনও থিম ‘বিহীন’ আকর্ষণ করেছে পুজোপ্রেমীদের। অন্যদিকে, অর্জুনপুর আমরা সবাই ক্লাব এবং সল্টলেক এ কে ব্লকের দুর্গাপুজোয় ভবতোষের কাজ তাক লাগিয়ে দিয়েছে। তবে এর আগে ৪০ হাজার স্কোয়ার ফুট জায়গায় নিজের ভাবনা তুলে ধরার সুযোগ পাননি শিল্পী। তাই এবার তা কাজে লাগাতে বদ্ধপরিকর তিনি। আর পুজোপ্রেমীরা? সুশান্ত-ভবতোষের থিমোৎসবের প্রতীক্ষায় দিন গুনতে ব্যস্ত।