সংবাদদাতা, রামপুরহাট: মাথার ওপর ঝুলছে চাকরি হারানোর খাঁড়া, অন্যদিকে ঘাড়ের ওপর চেপেছে গ্রামে গ্রামে ঘুরে জনগণনার দায়িত্ব। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে চাকরি বাতিল হওয়া এসএসসি-র ‘যোগ্য’ শিক্ষকদের কাছে এখন সংসার চালানো আর আইনি লড়াই সামলানোর পাশাপাশি এক পাহাড়প্রমাণ মানসিক চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারি আদেশ। এই অবস্থায় প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন এই শিক্ষকদের একাংশ।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চাকরি রয়েছে শিক্ষকদের। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা এই শিক্ষকদের ওপরই সম্প্রতি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে জনগণনার কাজের দায়িত্ব। শিক্ষকদের একাংশের মতে, মানসিক দুশ্চিন্তার মধ্যে এই কাজ তাঁদের চাপ আরও বাড়িয়ে তুলেছে। শিবাজি মাহাতো, প্রীতি কর্মকাররা বলেন, কোনো সুপারিশ নয়, মেধা ও যোগ্যতার জোরে চাকরি পেয়ে এতদিন স্কুলের পঠনপাঠন, মাধ্যমিকের খাতা দেখা থেকে শুরু করে এসআইআরের কাজ, সমস্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব তাঁরা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন। কিন্তু আজ যখন জীবিকার স্থায়িত্বই প্রশ্নের মুখে, তখন কীভাবে তাঁরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে জনগণনার কাজ করবেন?
পাইকরের এদরাকপুর হাইস্কুলের জীবনবিজ্ঞানের শিক্ষক প্রসেনজিৎ সরকার বলেন, যারা নতুন করে পরীক্ষায় পাশ করে ইন্টারভিউর কল পেয়েছে, তাঁরা তাও কিছুটা নিশ্চিত। কিন্তু আমরা যারা কোনো কল পাইনি, আমাদের মানসিক অবস্থা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে আপাতত আগামী আগস্ট মাস পর্যন্ত চাকরি থাকলেও, পরবর্তী কোনো নোটিস আসেনি। ৩১ আগস্টের পর চাকরি থাকবে কি না জানি না। রাতে ঘুম নেই। বাড়িতে অসুস্থ বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী ও ১৩ বছরের ছোট মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রতি মুহূর্তে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। এই মানসিক অস্থিরতার মধ্যেই চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে জনগণনার দায়িত্ব।
গত শুক্রবার এমন কয়েকজন অসহায় শিক্ষক জনগণনার ডিউটি থেকে অব্যাহতি চেয়ে মুরারই ২ ব্লকের বিডিওর কাছে ডেপুটেশন দিয়েছেন। প্রসেনজিৎ বলেন, বিষয়টি বিডিওকে জানালে তিনি বলেন, ডিউটি এসেছে যখন করতে হবে। যখন যা হবে দেখা যাবে। কার্যত তাঁদের জনগণনার ট্রেনিং নিতে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ। নইলে শোকজ চলে আসবে। সেই ভয়ে তাঁরা ট্রেনিং নিয়েছেন।
মুরারই ২ ব্লকের বিডিও সুদীপকুমার সরেন বলেন, এই ব্লকে যতজনের জনগণনার ডিউটিতে নাম এসেছে তাঁরা সকলেই ট্রেনিং নিয়েছেন। তাছাড়া এই সংক্রান্ত কোনো সরকারি নির্দেশ আমার কাছে আসেনি। প্রশাসনের একাংশের দাবি, চাকরির মেয়াদ থাকা পর্যন্ত সরকারি নিয়ম মেনে ডিউটি করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই শিক্ষকদের প্রশ্ন, যে চাকরির ভবিষ্যত আর কিছুদিন পর পুরোপুরি অনিশ্চিত, সেখানে সামাজিক অস্বস্তি ও মানসিক উদ্বেগ নিয়ে এই ধরনের কাজ তাঁরা কীভাবে সামলাবেন? সব মিলিয়ে, আইনি জট ও প্রশাসনিক নির্দেশের যাঁতাকলে পড়ে মানসিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন বহু ‘যোগ্য’ শিক্ষক।