কাদের বলা হয় চিরন্তন সুপারস্টার? যাঁরা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এবং পরবর্তী ১০০ বছর ধরেও থেকে যান সমান প্রাসঙ্গিক! উত্তমকুমার তেমনই একজন। বরাবর নাম্বার ওয়ান!
কাদের বলা হয় চিরন্তন সুপারস্টার? যাঁরা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এবং পরবর্তী ১০০ বছর ধরেও থেকে যান সমান প্রাসঙ্গিক! উত্তমকুমার তেমনই একজন। বরাবর নাম্বার ওয়ান!
সমৃদ্ধ দত্ত
• কতজন উত্তমকুমার আছেন? চারজন। তার মধ্যে একজন উত্তমকুমার বহুকাল আগেই অদৃশ্য হয়েছেন। তাঁকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। সেই উত্তমকুমারের নাম ছিল কখনও অরুণকুমার, কখনও অরূপকুমার। ১৯৫৪ সালে ‘অগ্নিপরীক্ষা’ নামক একটি বিস্ফোরণের পর তাঁকে বাঙালি বিস্মৃত হয়েছে। সেই অদেখা, অচেনা, অজানা উত্তমকুমারকে দেখা গিয়েছিল ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তির ঠিক পরেই। কিন্তু সেই মানুষটি ছিলেন গুটিপোকা। ‘মায়াডোর’, ‘মর্যাদা’, ‘কামনা’, ‘দৃষ্টিদান’, ‘নষ্টনীড়’, ‘ওরে যাত্রী’, ‘সহযাত্রী’—যে দর্শকরা দেখেছিলেন, তাঁরা একদিকে ছিলেন ভাগ্যবান! তাঁদের চোখের সামনেই একজন রোগা, ভীরু, নিচু কণ্ঠস্বরে কথা বলা তরুণ, যাঁর নাম ও ছবি প্রথম দিকের সিনেমাগুলিতে দেখা যেত না বলে বাড়ি ফিরে কান্নায় বালিশ ভেজাতেন এবং পরমুহূর্তেই দাঁতে দাঁত চেপে শপথ নিতেন কলকাতার প্রতিটি ল্যাম্পপোস্ট আর দেওয়ালে একদিন শুধু তাঁর নামেই সিনেমার পোস্টার দেখা যাবে, তিনি নিজের স্বপ্নপূরণ করেছেন। এহেন এক তরুণের বঙ্গসংস্কৃতি সাম্রাজ্য-বিজয়ের সংগ্রামের প্রতিটি অধ্যায় সেই দর্শকরা চাক্ষুষ করেছিলেন সিনেমার পর্দায়। তাঁদের অনেকেই তখন নিশ্চয়ই উপলব্ধি করেননি যে, এই ছেলেটি আগামী দিনে বাংলা সিনেমায় সর্বপ্রথম একটি অভীধা রচনা করবেন... ‘গুরু’! এহেন অরুণকুমার, অরূপকুমারের ছবিগুলি দীর্ঘকাল হল হারিয়ে গিয়েছে। বাঙালি আত্মবিস্মৃত জাতি। ইতিহাসবিমুখ জাতি। অতএব স্বাধীন ভারতের সর্বোত্তম সাংস্কৃতিক বিপ্লবটির সূত্রপাত কীভাবে হল, সেটা জানা যায় না। যাবেও না। এই ছবিগুলি দেখলে কিছুটা আন্দাজ করা যেত কিংবা গবেষণায় কাজে আসত যে, ভবানীপুরের এক তরুণ সামান্য পোর্ট কমিশনার অফিসের ২২৭ টাকা বেতনের কর্মী, যাঁর একটু আধটু থিয়েটারের শখ আছে, যিনি আসলে নিজের মধ্যে ভবিষ্যৎ বাঙালি সংস্কৃতির এক বৃহৎ আগ্নেয়গিরি নিয়ে ঘুরছেন, তাঁর প্রাথমিক প্রস্তুতি পর্বটি ঠিক কেমন ছিল? এখন তা জানার কোনও উপায় নেই।
‘ওরে যাত্রী’ সিনেমার শুটিং ফ্লোরে ওই তরুণ প্রবেশ করার পর কেউ বলেছিল, ‘ওরে, কলির ভীমের পায়ে শিকল বেঁধে রাখ, নয়তো উড়ে যাবে!’ কখনও বলা হয়েছিল, ‘হিয়ার কামস নিউ দুর্গাদাস!’ গোটা স্টুডিও হেসে উঠেছিল। সেই চারের দশকে প্রবল জনপ্রিয় ছিলেন দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রমথেশচন্দ্র বড়ুয়ারা। প্রথমজন সুদর্শন এবং রীতিমতো পেশিবহুল এক পুরুষ। আর দ্বিতীয়জন ধুতি পাঞ্জাবিতে রোমান্টিক বাঙালি পুরুষের প্রতিভূ হয়ে দেখা দিয়েছিলেন পর্দায়। উত্তমকুমার রোগা ছিলেন। তাই এই ঠাট্টা। বিখ্যাত প্রভা দেবী রোগী, তিনি ডাক্তার। প্রভা দেবী পরিচালককে হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ‘ও রাজেনবাবু, এ কাকে ধরে আনলেন! ও আমার হাত দেখবে কী? ওর নিজের হাতই তো কাঁপছে।’ সকলে হেসেছিল উচ্চস্বরে। কিন্তু অন্য ফ্লোরে নিজের ছবির শুটিং করার ফাঁকে পরিচালক দেবনারায়ণ গুপ্ত কিছুক্ষণের জন্য এই ফ্লোরে এসেছিলেন। তিনি কয়েকটি দৃশ্যের শুটিং দেখে, যাওয়ার আগে রাজেন চৌধুরীকে বলে গেলেন একটি আশ্চর্য ভবিষ্যৎবাণী। বাংলা সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ জ্যোতিষী হতে পারতেন দেবনারায়ণ গুপ্ত। কারণ তিনি বলেছিলেন, ‘ভদ্রলোকের অভিনয় বেশ ভালো লাগল। দুর্গাদাসের পর মনে হল ইনি দ্বিতীয় নায়ক হতে পারবেন। টিকে থাকলে বাংলাদেশের ছবির জগতে নায়কের অভাব ইনিই পূরণ করতে পারবেন।’
এই অরুণকুমারকে পরবর্তীকালের দর্শক দেখতে পেল না আর। কারণ ছবিগুলিই আর পাওয়া যায় না। এটা বাংলা সিনেমার ইতিহাসের এক চরম দুর্ভাগ্য। জহুরি ছিলেন আরও কয়েকজন। ‘সহযাত্রী’ সিনেমার আগে পাহাড়ি সান্যাল নিজেই উদ্যোগী হয়ে বিভূতি লাহাকে বলেছিলেন, ‘উত্তমকে নাও! শিখিয়ে পড়িয়ে নিলে ভালোই করবে। দেখছ না বেশ লম্বা। চেহারাও সুন্দর!’ কিন্তু কীভাবে সেই উত্তমকুমার নিজেকে তৈরি করছিলেন, তার সামান্য আভাসও কি পাওয়া যাবে না? যাবে! ১৯৪৮ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত তিনি প্রাথমিক সংগ্রামের সময়কাল পার করেছিলেন এবং ফ্লপ হিরোর আখ্যা পেয়েছিলেন। সেই ভাগ্যের সামান্য বদল হয়েছিল ১৯৫২ সালের এপ্রিল মাসে ‘বসু পরিবার’ নামক সিনেমায়। যদিও এই ছবিতে তিনি নায়ক নন। ‘বসু পরিবার’ পরবর্তীকালে বহু আলোচিত। তাই এই ছবির কথা আপাতত থাক। বরং সেই বছরই স্বাধীনতা দিবসের দিন অর্থাৎ ১৫ আগস্ট উত্তরা, পূরবী, উজ্জ্বলা সিনেমায় মুক্তি পাওয়া একটি ছবির আলোচনা করা যেতে পারে। বর্তমান যুগের অনুসন্ধিৎসু দর্শক ও গবেষকরা যদি জানতে চান যে, প্রথম যুগে অত্যন্ত ধীরে ধীরে কীভাবে এই মানুষটি নিজেকে অন্যদের থেকে পৃথক করে নিচ্ছিলেন? কিংবা কোন অভিনয়শৈলীকে ক্রমেই নিজের স্টাইলে পরিণত করে অত্যন্ত গোপনে সূক্ষ্মভাবে একটি ভিন্ন ব্যক্তিত্বের মাত্রা যুক্ত করছিলেন? তাঁদের জন্য একটি ছবি রয়েছে, যা এখনও পাওয়া যায় দেখতে। সেই ছবির নাম ‘কার পাপে?’ অসিতবরণ, ছবি বিশ্বাস, মঞ্জু দে’র মতো প্রথিতযশাদের সামনে উত্তমকুমার সাবলীল একটি স্থান করে নিয়েছিলেন। ছবিটি যথারীতি ফ্লপ করে। কিন্তু আমরা সেখানে কী লক্ষ করলাম? তা হল, সংলাপ পরিবেশনকে পালটে দেওয়া। সেটাই পরবর্তীকালে দ্বিতীয় উত্তমকুমার এবং সর্বশ্রেষ্ঠ উত্তমকুমার হয়ে ওঠার চাবিকাঠি। কম কম বলা। উচ্চকিত উচ্চারণ নয়। খুব আবেগঘন কিংবা উত্তেজনার মুহূর্তে কয়েকটি বাক্য উচ্চারণ করেই কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা। ওই নীরবতা এবং অন্য পক্ষের বলা সংলাপের মধ্যে আকস্মিক চোখ নামানো, ঘাড়টা দ্রুত তুলে সামনে তাকানো। অর্থাৎ যখন আমার সংলাপ থাকবে তখনই শুধু নয়, সহ অভিনেতার সংলাপের সময় পর্যন্ত অভিব্যক্তি যাতে এমন হয় যে, দর্শক পর্দায় আমাকেও দেখতে বাধ্য হন। সাধারণ নিয়ম হল, যে সংলাপ বলছে, দর্শকের চোখ তাঁর দিকে থাকে। সেই সময় সহ অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সেই সময় চুপ করে নিছক যেন সেই সংলাপ শোনাই রীতি। তিনি কিন্তু নীরব থেকেও অভিনয় করে চললেন অবিরত। অপ্রয়োজনে উচ্চকিত উচ্চারণ, উচ্চ কণ্ঠস্বরে নাটকীয়তা নিয়ে এসে দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টাই নেই ওই স্টাইলে। ওই স্টাইলই উত্তমকুমারের একান্ত আপন হয়ে রইল এবং বাংলা সিনেমার পরবর্তী নায়ক ও পরিচালকদের ওই স্টাইল অনুসরণ করতে বাধ্যও করলেন।
এই যে নিচু তারে বাঁধা অভিনয়, এই যে নাটকীয়তাহীন সংলাপ পরিবেশন... এই বৈশিষ্ট্য নিয়ে তাঁকে পর্দায় কবে দেখবে বাঙালি দর্শক? অনেক বছর পরে। উত্তমকুমার যখন উত্তমকুমার হয়ে গিয়েছেন। তাঁকে নামভূমিকায় রেখে সত্যজিৎ রায় যে সিনেমা করেছিলেন, সেই ‘নায়ক’ ছবিতে ঠিক এই কথাগুলিই অরিন্দমরূপী উত্তমকুমারকে দিয়ে বলিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। প্রথম দিনের শুটিং ছিল অরিন্দমের। দেবী চৌধুরাণীর একটি চরিত্র। তাঁর ভূমিকা ব্রজেশ্বরের। পিতার সঙ্গে কথোপকথনের দৃশ্য। পিতারূপী দাপুটে অভিনেতা মুকুন্দ লাহিড়ি সকলের সামনে ধমক দিয়েছিলেন। কারণ, ব্রজেশ্বর অত্যন্ত নিচু স্বরে কথা বলছে। মুকুন্দবাবু বলেছিলেন, ‘বিড়বিড় করছ কেন?’ অরিন্দম উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আজ্ঞে বঙ্কিম লিখেছেন যে, সেকালে ছেলেরা বাপের সামনে গলা তুলত না।’ মুকুন্দ থমকে গেলেন কয়েক নিমেষ। কারণ, ছবি করতে এসে পড়াশোনাও করেছে এই ছেলে! অর্থাৎ হোমওয়ার্ক করা, যা উত্তমকুমারেরও স্বভাব ছিল। ‘শ্যামলী’ নাটক করার আগে আশাপূর্ণা দেবীর উপন্যাস নিয়মিত পড়তেন। উত্তমকুমারের এই অভ্যাসের কথা জেনেই কি সত্যজিৎ রায় এই সংলাপ নির্মাণ করেছিলেন? অরিন্দমকে মুকুন্দ লাহিড়ি আরও বলেছিলেন, ‘কণ্ঠস্বর অবহেলা করার জিনিস নয়।’ অর্থাৎ তিনি আত্মপক্ষ সমর্থনে বলেছিলেন, উচ্চকিতভাবেই কথা বলতে হবে। কিন্তু অরিন্দম ছবি মুক্তির আগের দিন মুকুন্দ লাহিড়িদের অভিনয় সম্পর্কে বন্ধুকে বলেছিলেন, ‘এদের কাছে চরিত্র-ফরিত্র বলে কিছু নেই। যে কোনও পার্ট দিলেই এরা সেই একই ছাঁচে ফেলে দেবে। সেই একই ম্যানারিজম, এক কণ্ঠস্বর, এক অভিনয়।’ বিরক্ত গলায় অরিন্দম এও বলেছিলেন, ‘আরে ধুর ধুর ধুর! এটা কোনও ফিল্ম অ্যাকটিংই নয়। ক্যামেরার সামনে অতি অভিনয় চলে না। একটু বাড়িয়েছো কি দশগুণ বাড়িয়ে দেবে!’ এই সিনেমা মুক্তি পেয়েছে ১৯৬৬ সালে। অথচ চিন্তা করলে দেখা যাবে যে, অবিকল এই ভাবনাই সিনেমাজীবনের প্রথম থেকেই তাঁকে সম্ভবত চালিত করেছিল। কারণ ঠিক এই মনোভাবই অনুসরণ করে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী অভিনয়ে প্রবেশ করেছিলেন উত্তমকুমার। তাই হয়তো অরিন্দমের মতো শুরুর দিকে, বহু আগে নিজেই নিজেকে বলেছিলেন, আমি যেটা করছি, সেটাই থাকবে, অন্যগুলো এখন আর চলে না। অচল। আর তাই ‘আই উইল গো টু দ্য টপ... দ্য টপ...দ্য টপ!’
১৯৫২ সালের ‘বসু পরিবার’ অথবা ‘কার পাপে’র ঠিক পরের বছর যে সিনেমাটি ধরাধামে আবির্ভূত হল ‘সাড়ে চুয়াত্তর’। ছবিটি প্রবলভাবে জনপ্রিয় হলেও সেখানে বঙ্গসিনেমার দুই মহানক্ষত্র বাকিদের ম্লান করে দেবেন, সেটা তো স্বতঃসিদ্ধ। মলিনা দেবী এবং তুলসী চক্রবর্তী। এই দুই সূর্য-চন্দ্রের সামনে দুই তরুণ-তরুণী প্রাণপণে নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণ করে গেলেন। কিন্তু তাঁদের বিশ্বজয় করতে আরও এক বছর অপেক্ষা করতে হবে।
১৯৫৪ সালে টালিগঞ্জ সিনেমাপাড়ার উপর যে কোন দেবতার ভর হয়েছিল, সেটাও এক রহস্যময় গবেষণা। ‘অগ্নিপরীক্ষা’র দুই যুবক-যুবতী এবং ‘গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু’র আবেশ সেই যে বাঙালিকে গ্রাস করল, ২০২৫ সালেও তারা আর পরিত্রাণ পেল না সেই আবেশ থেকে। সেই সিনেমা তো রূপকথা হয়ে গিয়েছে। কারণ, এই সিনেমার মাধ্যমে বঙ্গচলচ্চিত্র জগতের ‘আলেয়া’ এবং ‘নিশির ডাক’ চালু হয়েছিল। এই দুই যুবক-যুবতীর নাম ও ছবি পোস্টারে দেখতে পেলে সেই যে বাঙালি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে প্রবল এক তাড়না এবং অস্থিরতার সৃষ্টি হল, সেটি বস্তুত রয়ে যাবে দশকের পর দশক। কিন্তু ১৯৫৪ সালকে কেন অলৌকিক আশীর্বাদধন্য বলা হচ্ছে? কারণ জানতে সে বছর মুক্তি পাওয়া সিনেমার তালিকার দিকে তাকানো যাক। ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘অন্নপূর্ণার মন্দির’, ‘চাঁপাডাঙ্গার বউ’, ‘গৃহপ্রবেশ’, ‘মরণের পরে’, ‘মন্ত্রশক্তি’, ‘ওরা থাকে ওধারে’...। এর মধ্যে পাঁচটি ছবির পোস্টারেই দু’জনের নাম, উত্তম-সুচিত্রা। ঠিক এই বছর থেকে দ্বিতীয় উত্তমকুমারের জন্ম হল। ছিন্নমূল বাঙালি, বাঙাল বাঙালি, ঘটি বাঙালি, ধনী বাঙালি, দরিদ্র বাঙালি, কংগ্রেস বাঙালি, কমিউনিস্ট বাঙালি, বেকার, এগজিকিউটিভ প্রত্যেক বাঙালি পুরুষের ব্যক্তিগত অস্তিত্ব পরবর্তী বছরগুলিতে অন্তর্হিত হয়ে গেল। কেউ আর নিজেকে স্বনামে ভাবতে চায়নি। সকলেই প্রকাশ্যে অথবা গোপনে নিজেকে উত্তমকুমার ভাবতে শুরু করেছে। পাড়ার জলসায় যখন কেউ গাইতেন ‘জানি না ফুরাবে কবে এই পথ চাওয়া...’, সেই গান শুনে তরুণ-তরুণীরা তৃষিত নয়নে চেয়ে থাকতেন একে অন্যের দিকে। রেডিওতে যখন বাজত ‘আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা থাকে...’, তখন বাঙালি যুবতী মনে মনে ভাবতেন এ গান তাঁকে লক্ষ্য করেই কি আসলে গায় না প্রত্যুষদা? ১৯৫৪ থেকে ১৯৬২, আট বছরের একটি সময়কাল বাঙালি জীবনকে চিরতরে পালটে দিল। সিনেমা বহু এসেছে। বঙ্গসিনেমার জগতে সত্যজিৎ রায় নামক এক ধ্রুবতারার জন্ম হয়েছে। কিন্তু এই সময়কাল আদতে উত্তম-সুচিত্রা যুগ। এবং এই হল উত্তমকুমারের দ্বিতীয় সত্তা এবং তাঁর উত্তমকুমার হয়ে ওঠার শ্রেষ্ঠ সত্তা এই আট বছরই।
১৯৬২ সালে বাঙালি জেনে গেল আজীবনের শ্রেষ্ঠ রোমান্টিক বাক্য কী , শ্রেষ্ঠ রোমান্টিক গানই বা কী! ‘এই পথ যদি না শেষ হয়... তবে কেমন হতো তুমি বলো তো!’ কিন্তু তখনও পর্যন্ত বাঙালি চলচ্চিত্র প্রেমীদের কাছে দুঃস্বপ্নেও কোনও ধারণা ছিল না যে, ঠিক এক বছর পর থেকে কী হতে চলেছে। প্রতি বছর যেখানে একাধিক ছবি মুক্তি পাচ্ছে এই দুই স্বপ্নকুমার ও স্বপ্নকুমারীকে কেন্দ্র করে, ঠিক তখন ১৯৬৩ সালে শুধুই ‘বিপাশা’। এবং ১৯৬৪ সালে একটিও নয়। উত্তমকুমার এবং সুচিত্রা সেনের মধ্যে ঠিক কী হয়েছিল? কোনও ঝগড়া, ইগো, মান অভিমান, তৃতীয় পক্ষের প্ররোচনা? এটা সাধারণ বাঙালি জানে না। কিন্তু বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো এই সময় থেকেই তাঁরা দু’জনে আর পরস্পরের সঙ্গে ছবি করলেন না।
প্রেমিক উত্তমকুমার রইলেন বটে। তবে আরও ম্যাচিওরড, ধীরস্থির, পরিণত এবং সোশ্যাল ইস্যুকে চিত্রনাট্যে নিয়ে আসার তৃতীয় উত্তমকুমারের আগমন হল। প্রধান সঙ্গী হলেন সুপ্রিয়া দেবী। একের পর এক সিনেমা করছেন তাঁরা দু’জনে। এবং অবিস্মরণীয় সব চিত্রনাট্য। উত্তমকুমার নিজেকে মেলে ধরছেন। লখনউয়ের শিল্পপতির গায়ক পুত্র হয়েও কলকাতায় এসে ড্রাইভার সাজছেন। আবার সেই তাঁকেই দেখা যাচ্ছে সত্যজিৎ রায় এবং তপন সিংহের ছবিতে। অর্থাৎ উত্তমকুমার উত্তমকুমার থাকছেন বটে, আবার ধীরে যেন তাঁর মধ্যে এক অন্য অস্থিরতার জন্ম হচ্ছে। সুচিত্রা সেনের নাম আর কি এই সময়ে দেখা যাবে না তাঁর সঙ্গে? যাবে। ১৯৬৭ সালে হয়ত একটি ‘গৃহদাহ’ হবে। কিন্তু এই বিচ্ছিন্নতা তাঁদের দু’জনেরই কি ক্ষতি করল না? তাঁরা দু’জনেই কি ক্রমেই বিভ্রান্ত হয়ে গেলেন না? হয়তো হলেন। তবে উত্তমকুমারের এই সময়কালের জনপ্রিয়তা ক্রমেই বেড়ে যেন আকাশ স্পর্শ করল। একের পর এক ছবিতে সুঅভিনেতা হিসেবে নিজেকে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করলেন। সুচিত্রা সেনকে সঙ্গে নিয়ে তিনি বাঙালিকে শিখিয়েছিলেন ‘এই পথ যদি না শেষ হয়...’। কিন্তু মাধবী চক্রবর্তীকে পাশে নিয়েও তাঁর রোমান্টিক ক্লাস চলল, ‘কে প্রথম কাছে এসেছি’ মন্ত্র উচ্চারণ করে। ১৯৬৪ থেকে ১৯৭০—এই ছ’বছরে অসংখ্য সুপারহিট ছবি দিলেন তৃতীয় উত্তমকুমার। হেমন্তবাবু ছাড়া তিনি গ্রহণযোগ্য নয়, এই মিথ ভেঙে মান্না দে, শ্যামল মিত্রকেও প্রতিষ্ঠা করলেন নিজের কণ্ঠে। এবং প্রতিটি গান ভুবনকে ভরিয়ে দিল!
ঠিক এরকম সময় উত্তমকুমার প্রথম ভুল করা শুরু করলেন। অন্যতম ভুল হিন্দি চলচ্চিত্রেও সুপারস্টার হওয়ার আকাঙ্ক্ষা। সে তো হতেই পারে! কিন্তু নিজের সর্বস্ব অর্থ সম্পদ লগ্নি করে তিনি বিশ্বাস করলেন একের পর এক প্রতারক ও অযোগ্য মানুষকে। আর সেই ‘ছোটি কি মুলাকাৎ’ ছবির ব্যর্থতা প্রথম তিন উত্তমকুমারকে যেন ছিন্নভিন্ন করে দিল।
সুচিত্রা পরবর্তী জীবনে ওই তৃতীয় উত্তমকুমারের যা অন্যতম প্রধান একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়াল, সেটি হল, হঠাৎ কয়েকজন নতুন যুবকের আবির্ভাব। উত্তমকুমার একে একে পরাজিত করতে পেরেছেন বসন্ত চৌধুরী, অসিত বরণ, নির্মল কুমারদের। কিন্তু বিশ্বজিৎ এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নামক দুই যুবককে যেন বেশি করে গ্রহণ করতে শুরু করলেন প্রযোজক ও পরিচালকরা। তাঁদের অবশ্য দোষ নেই। প্রথমত, বিনোদন জগৎ সর্বদাই নতুন কিছুর সন্ধান করে। দর্শকের মনও তাই। সেই কারণেই সম্ভবত তাঁদের স্বপ্নের জুটি ভেঙে যাওয়ায় প্রবল এক মানসিক আঘাত পেয়ে দর্শকও আর কোনও নায়িকাকে স্বীকৃতি দিলেন না উত্তমকুমারের সঙ্গে। অর্থাৎ যে নাম দু’টি একসঙ্গে এক নিঃশ্বাসে উচ্চারিত হতে পারে। আর দ্বিতীয়ত, উত্তমকুমার প্রবল ব্যস্ত এবং নিয়মিত বম্বে-কলকাতা করছেন। তাঁর ডেট পাওয়া বেশ সমস্যার। যদিও যে কোনও সময় তিনিই সকলের প্রথম পছন্দ। তাহলে কি ‘ছোটি সি মুলাকাতে’র জেরে তাঁর সর্বস্বান্ত হয়ে যাওয়া, সেই ঋণ পরিশোধ করতে অসংখ্য অপ্রয়োজনীয় সিনেমায় অভিনয় করতে বাধ্য হওয়া, কবে কোন ভোরের ময়দানে একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড দেখে ফেলায় বম্বে শহরে কয়েক মাসের জন্য চলে যাওয়া, সংগ্রামের সময়ের সঙ্গী গৌরী দেবীকে পিছনে ফেলে আসার মানসিক চাপ, পারিবারিক কলহ এবং আকস্মিক বদলে যাওয়া বাংলা সিনেমা জগৎ থেকে উত্তমকুমার নামক মহীরুহের নিঃশব্দে পতন ঘটল? সেটা কখনও সম্ভব নাকি!
সাতের দশকজুড়ে একঝাঁক অসহনীয় খারাপ সিনেমার চরিত্রাভিনেতা হয়ে বাঙালিকে হতাশ করেছেন তিনি। এই প্রবল ঝড় ও ভূমিকম্পগুলির মধ্যেও যদি কোনও মহাজাগতিক প্রতিভার চতুর্থ জন্ম না হয় এবং তারপর বিদ্যুৎ চমকের মতো ঝলসেই না ওঠেন, তাহলে তিনি উত্তমকুমার কেন? অতএব কখনও ‘সন্ন্যাসী রাজা’, কখনও ‘যদুবংশ’, কখনও ‘স্ত্রী’! তিনি যে নিভে যাননি তার প্রমাণ কারা দিল? ‘অমানুষ’, ‘আনন্দ আশ্রম’ এবং ‘ওগো বধূ সুন্দরী’! কাদের বলা হয় চিরন্তন সুপারস্টার? যাঁরা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এবং পরবর্তী ১০০ বছর ধরেও হয়তো থেকে যান সমান প্রাসঙ্গিক! চারজন উত্তমকুমার কখনও পিছনের সারিতে বসেননি। বরাবর নাম্বার ওয়ান!
উত্তমকুমার! বঙ্গসংস্কৃতির শেষ মহানায়ক!
• গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল
• সহযোগিতায় : সত্যেন্দ্র পাত্র