


চলছে গরমের ছুটি। দীর্ঘ ছুটি মানেই হাতে প্রচুর সময়। পড়াশোনার ফাঁকে খেলা আর নিজের মতো সময় কাটানো। গরমের ছুটি কেমন কাটবে আগে থেকেই জানিয়ে রেখেছিল নাকতলা হাই স্কুলের পড়ুয়ারা। ছবিও আঁকল তারা।
কাঁচা আম মাখা
মে মাস মানেই অপেক্ষার শুরু। কবে পড়বে গরমের ছুটি! দিন গুনতে গুনতে অবশেষে পড়েই গেল গরমের ছুটি। কলকাতা শহরে যা গরম পড়ে! তাই গ্রীষ্মাবকাশ মানে দাবদাহ থেকে মুক্তি। এই প্রচণ্ড রোদে স্কুল যেতে হলে খুবই কষ্ট হত। প্রতি বছরই এই ছুটিতে টুকটাক ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান থাকে। গত বছর বাবা-মায়ের সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলাম। এবছরও গ্রামে যাওয়া হবে বলে বাবা জানিয়েছে। ওখানে আমরা দিন দশেক থাকব। গ্রাম মানেই সবুজে ভরা। চারদিকে গাছপালা। তাতে কত রকম ফুল-ফল। পুকুরে সাঁতার কাটা। প্রাণভরে শ্বাস নেওয়া যায়। গ্রামে আমার দাদু-ঠাকুরমা থাকেন। দাদু ছিপ দিয়ে মাছ ধরেন। ওখানে আমার কয়েকজন বন্ধু হয়ে গিয়েছে। তাদের সঙ্গে বিকেলে ফুটবল, ক্রিকেট খেলি। আর গ্রামের বাড়ি বললেই মনে পড়ে যায় কাঁচা আম মাখা। মাঝে মাঝেই মা কাঁচা আম মাখে। দুপুরে সেটা খাই। দারুণ লাগে। আমাদের গ্রামে বৈশাখী মেলাও হয়। তাই অপেক্ষায় আছি কবে যে গ্রামের বাড়ি যাব! —আদিত্য বণিক, সপ্তম শ্রেণি
পড়ার চাপ কম
গরমের ছুটি আর মামার বাড়ি আমার কাছে সমার্থক। প্রতি বছরই গরমের ছুটিতে মামার বাড়িতে বেশ কয়েকদিন কাটিয়ে আসি। কারণ পুজোর ছুটির পরই বার্ষিক পরীক্ষা থাকে, তাই তখন মামার বাড়ি যাওয়া যায় না। বছরের অন্য সময়ে যে মামার বাড়ি যাই না, তেমনটা নয়! তবে, গরমের ছুটিতে বেশ কিছুদিন থাকা যায়। এই সময়টাতে পড়ার চাপ কম থাকে। আমার কেন জানি না খালি মনে হয়, মামার বাড়ির তুলনায় আমাদের এদিকটা যেন একটু বেশিই গরম পড়ে। হয়তো কলকাতা শহরের দূষণের জন্য। আমি গেলেই দিদা প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন দু’-এক রকম পদ রান্না করেন। মায়ের কাছে যেটা আবদার করে খাওয়া যায় না, দিদাকে বললেই রান্না করে দেয়। তবে, আমার মা খুব সুন্দর শরবত ও আইসক্রিম তৈরি করতে পারে। গরমকালের সন্ধেবেলা ছাদে বসে আমরা সেগুলো জমিয়ে খাই। পড়ার চাপ কম থাকায় গরমের ছুটি আমিই দারুণ উপভোগ করি। —প্রীতম মণ্ডল, পঞ্চম শ্রেণি
কবিগুরুর জন্মোৎসব পালন
আমার কাছে গরমের ছুটির মজাই আলাদা। এই ছুটিতে আমি প্রতিবছরই আমি কিছু না কিছু নতুন কিছু শিখি। পাড়ার লাইব্রেরি থেকে প্রচুর গল্পের বই নিয়ে এসে পড়ি। এই সময় পড়ার চাপ তুলনামূলক কম থাকায় গল্পের বই, কমিকস পড়ার সময় পাওয়া যায়। আমি সাঁতার শিখি। ছুটির দিনগুলিতে যখন সুইমিং ক্লাসে যাই, অতটা তাড়াহুড়ো থাকে না। আর আমার কাছে গরমের ছুটি মানে কবিগুরুর জন্মোৎসব। আমাদের পাড়াতে রবীন্দ্র জয়ন্তী পালন করা হয়। প্রতি বছরই তাতে অংশগ্রহণ করি। এবছর ছুটির মধ্যেই পড়েছে ২৫ বৈশাখ। রবীন্দ্র জয়ন্তী মানে আমাদের পাড়ায় সাজ সাজ রব। অনেকদিন আগে থেকে রিহার্সাল শুরু হয়ে যায়। অবশ্য, সেই সময় ছুটি থাকে না। তবু ঠিক পড়ার ফাঁকে সময় বের করে মহলা দিতে যাই। পাড়ার বন্ধুরা মিলে নাটক। এবছর আমি ররি ঠাকুরের ‘ডাকঘর’ নাটকের নির্বাচিত অংশ ‘অমল ও দইওলা’তে অভিনয় করব। —তমোজিৎ কর্মকার, নবম শ্রেণি
পাহাড়ের নয়নাভিরাম দৃশ্য
পরিবেশ বদলাচ্ছে। দিন দিন তাপপ্রবাহ বাড়ছে। তাই ইদানীং গরমের ছুটিটা বেশ অনেকদিনই থাকে। প্রতিবছরই আমরা গরমের ছুটিতে কোথাও না কোথাও ঘুরতে যাই। চেষ্টা করি কোনো হিল স্টেশনে যাওয়ার। পাহাড় আমার খুব পছন্দের। গতবছর গিয়েছিলাম দার্জিলিং। টাইগার হিল আর কাঞ্চনজঙ্ঘার অপূর্ব রূপ দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। বাতাসিয়া লুপ, চা-বাগানের ছবি আমার হৃদয়ে অমলিন হয়ে রয়েছে। পাহাড়ি বাঁকে, কুয়াশার মধ্যে যেন আমি স্বপ্নের মধ্যে হাঁটছি। এবছরও আমরা উত্তরবঙ্গে বেড়াতে যাব, বাবা বলে দিয়েছে। এবার আমরা দাওয়াইপানি, সিটং সহ অনেকগুলো জায়গা দেখব। বেড়াতে গিয়ে আমার আঁকার খাতাটা সঙ্গে নিয়ে যাব। যা দেখব সন্ধেবেলা হোটেলে বসে সেগুলো আঁকব। —প্রিয়াংশু সর্দার, সপ্তম শ্রেণি
গল্পের বই আর ছবি আঁকা
গরমের ছুটি মানেই দীর্ঘ অবকাশ। আমার ছুটি কাটে গল্পের বই পড়ে আর ছবি এঁকে। গোয়েন্দা গল্প পড়তে আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে। ফেলুদা আমার প্রিয় গোয়েন্দা। ফেলুদা, তোপসে আর লালমোহন গাঙ্গুলি হলেন থ্রি মাস্কেটিয়ার্স। ফেলুদার কয়েকটি গল্প বার বার পড়ি। যেমন সত্যজিৎ রায়ের ‘সোনার কেল্লা’ আর ‘জয়বাবা ফেলুনাথ’ ছবি দুটো বহুবার দেখেছি। এবার বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চাঁদের পাহাড়’ বইটি হাতে পেয়েছি। ছুটিতে সেটাই পড়ব বলে ঠিক করেছি। শংকরের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ব
আফ্রিকা অভিযানে। আর ছুটির মধ্যে আমাদের পাড়ায় একটি রবিবার ‘রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত সন্ধ্যা’ আয়োজন করা হয়। সেই অনুষ্ঠানেও আমি অংশ নিই। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না। —অয়ন দাস, অষ্টম শ্রেণি
একপশলা বৃষ্টি
কাঠফাটা গরম। তপ্ত দুপুরে খাঁ খাঁ রোদ। শুরু হয়ে গিয়েছে গরমের ছুটি। ভাবলেই মন কেমন করে। প্রচণ্ড দাবদাহে আমরা যেমন আকাশের দিকে বৃষ্টির আশায় তাকিয়ে থাকি, পড়াশোনার চাপে আমার কাছে গরমের ছুটি একপশলা বৃষ্টির মতো। গভীর প্রশান্তি। একঘেয়ে জীবন থেকে মুক্তি। আমার কাছে গরমের ছুটি মানেই পাকা আম, মিষ্টি লিচু, তরমুজের শরবত, তালশাঁসের ঘ্রাণ। গরমের কারণে এই সময় বেশি ঝাল-ঝোল খাওয়া যায় না। তবুও ছুটিতে মাঝে মধ্যে একটু অন্য রকম রান্না হয়। জমিয়ে খাওয়াদাওয়া করি। আর মামার বাড়িতে সব ভাই-বোনেরা একসঙ্গে জড়ো হই। খুব হইহই হয়, খেলাধুলো করি। —রিভু হালদার, ষষ্ঠ শ্রেণি
প্রধান শিক্ষকের কলমে
শৃঙ্খলা, মানবিক মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা, খেলাধুলো, শরীরচর্চা ও মেধার বিকাশ ঘটানোর তীর্থস্থান নাকতলা হাই স্কুল। শুধুমাত্র ভালো রেজাল্ট নয়, সত্যিকারের ভালো স্কুল বলতে এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বোঝায় যেখানে একটি শিশুর শারীরিক, মানসিক ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটে। একটা নিরাপদ পরিবেশে শিশুটি নিজেকে ধীরে ধীরে বর্তমান সময়োপযোগী করে তুলতে পারবে। এমনই একটি বিদ্যালয় আমাদের নাকতলা হাই স্কুল। যেখানে সহানুভূতিশীল শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষাকর্মীদের সহায়তায় পড়ুয়াদের সার্বিক বিকাশ ঘটে।
১৯৫১ সালের ১৬ জানুয়ারি এই স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। এদিকে, দেশভাগের ফলে বহু মানুষ ছিন্নমূল হয়ে এই অঞ্চলে বসবাস শুরু করেন। ’৪৯ সালে নাকতলা এক নম্বর কলোনির পত্তন ঘটে। সেইসব ছিন্নমূল পরিবারের সন্তানদের জন্য তৈরি হয় এই স্কুল। প্রথম পরিচালক সমিতির সভাপতি ছিলেন ডি কে দাস, সহ-সভাপতি সুধীরমোহন বন্দোপাধ্যায়, সম্পাদক সুনির্মল সেন, প্রধান শিক্ষক মনমোহন বন্দোপাধ্যায়। আজ যে বিশাল ভবন তৈরি হয়েছে, শুরুতে তা ছিল টালির ছাউনি ও বাঁশের বেড়া ঘেরা ঘর। চারপাশে হোগলার জঙ্গল, শেয়ালের আস্তানা, বিষাক্ত সাপ ঘোরাঘুরি করত। আশপাশের কিছু বাড়িতেও ক্লাস করানো হত। প্রথম বছর পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণিতে মোট ছাত্রসংখ্যা ছিল মাত্র ৬০। আজ সেই সংখ্যা ১ হাজার ৭৫০। ১৯৫৩ সালে বিদ্যালয় দশম শ্রেণি পর্যন্ত সরকারি স্বীকৃতি লাভ করে। ’৫৪ সাল থেকে সরকারের আর্থিক অনুদান প্রদান শুরু হয়। ওই বছরই প্রথম ১৭ জন ছাত্র স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা দেয়। ১৯৫৮ সাল থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে কলা, বাণিজ্য ও বিজ্ঞান বিভাগ চালু করার সরকারি অনুমতি পায়। এই স্কুলের বহু কৃতী ছাত্র সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছে। ভারত সেরা ফুটবলার কৃশানু দে এই বিদ্যালয়েরই ছাত্র ছিলেন। সদ্য প্রয়াত অভিনেতা অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় (রাহুল) আমাদেরই ছাত্র। নন্দদুলাল গোস্বামী প্রধান শিক্ষক থাকাকালীন সময়ে বিদ্যালয়ের সার্বিক বিকাশ ঘটে। পরবর্তী সময়ে আমরা সেই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছি। —কালাচাঁদ দে, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক