নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: পার্ক সার্কাসের সোহরাবর্দি অ্যাভিনিউয়ের নাম বদলে দিল কলকাতা পুরসভা। নতুন নাম ‘গোপাল মুখার্জি রোড’। ইতিহাসে তিনি ‘গোপাল পাঁঠা’ নামেই পরিচিত। এই ঘোষণা করেছেন কলকাতা পুরসভার প্রশাসক তথা কমিশনার স্মিতা পান্ডে। আর রবিবার এই ইস্যুতেই শুরু হল বিতর্ক! বিজেপির দাবি, ‘দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’য়ের খলনায়ক অবিভক্ত বাংলার ‘প্রধানমন্ত্রী’ হোসেন শাহিদ সোহরাবর্দির নামেই এই রাস্তার নামকরণ করা হয়েছিল। কিন্তু তথ্য বলছে, বাস্তব সেটা নয়। কারণ, এই ‘সোহরাবর্দি’র সঙ্গে দাঙ্গার কোনো সম্পর্ক নেই। যাঁর নামে খোদ কলকাতা পুরসভাই এই রাস্তার নামকরণ করেছিল, তিনি ছিলেন স্যর হাসান সোহরাবর্দি। ১৯৩০-৩৪ সাল পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন তিনি। যোগসূত্র বলতে, এই দুই সোহরাবর্দির রক্তের সম্পর্ক। স্যর সোহরাবর্দি ছিলেন শাহিদ সোহরাবর্দির মামা (কোনো মতে কাকা)। প্রশ্ন উঠছে, তাহলে কি বিজেপি ইতিহাস বিকৃত করছে? মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কিন্তু এই রাস্তার নামবদলকে ‘ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন’ বলে দাবি করেছেন। পালটা তৃণমূলের তরফে কুণাল ঘোষ বলেছেন, ‘মুখ্যমন্ত্রীকে অনুরোধ, পুরসভা আবার তথ্যপরীক্ষা করুক।’
মুখ্যমন্ত্রী সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করে বলেছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবসের শুভক্ষণে সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউর নাম পরিবর্তন করে স্বর্গীয় গোপাল মুখার্জীর নামে নামকরণ করার জন্য কলকাতা পুরসভাকে সাধুবাদ। দীর্ঘদিন ধরে কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে এমন এক ব্যক্তির নাম বহন করা হয়েছে, যাঁর ভূমিকা বিভাজন ও রক্তক্ষয়ের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত।’ বিজেপি নেত্রী কেয়া ঘোষও সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘১৯৪৬ সালের গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংয়ের পিছনে ছিলেন এই ব্যাক্তি সোহরাবর্দি! আর গোপাল মুখোপাধ্যায়, যিনি কলকাতায় সেই দাঙ্গার সময় মুসলিমদের হাত থেকে হিন্দুদের বাঁচিয়েছিলেন।’
বিভিন্ন প্রামাণ্য নথি কিন্তু বলছে, ‘দাঙ্গাকারী’ প্রধানমন্ত্রী হোসেন শাহিদ সোহরাবর্দি নামে ওই রাস্তার নামকরণ হয়নি। কলকতা পুরসভা ১৯৩৩ সালে ২০ এপ্রিল পার্ক সার্কাস থেকে কসাইপাড়া লেন পর্যন্ত ১০০ ফুট লম্বা রাস্তাটি সোহরাবর্দি অ্যাভিনিউ হিসাবে নামকরণ করে। সেখানে স্যর হাসান সোহরাবর্দির বাড়িও রয়েছে। ১৯৩২-৩৩ সালের ‘ক্যালকাটা মিউনিপ্যাল গেজেট’ নোটিফিকেশনের ৭৩৪ নম্বর পেজে উল্লেখ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যর হাসান সোহরাবর্দির নামে রাস্তাটির নাম দেওয়া হয়েছে। তিনি ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম উপাচার্য ও বিশিষ্ট চিকিৎসক। অন্যদিকে, কলকাতার রাজপথের চর্চাকার পি টি নায়ারের লেখা ‘আ হিস্ট্রি অব ক্যালকাটাস স্ট্রিটস’ বইয়ের ৮৬৬ ও ৮৬৭ নম্বর পাতাতেও সেই উল্লেখ মেলে।
তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ বলেন, ‘এই নাম বাদের ইস্যুতে তথ্যপরীক্ষা দরকার। কারণ, বাস্তবে এই বিতর্কিত সুরাবর্দির নামে রাস্তা ছিল না। রাস্তা তাঁর কাকার নামে, তিনি স্যর ডাঃ হাসান সুরাবর্দি। তিনি ছিলেন শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, পূর্ব রেলের মুখ্য স্বাস্থ্য অফিসার, সামরিক বাহিনীর চিকিৎসক। পরে বাংলার লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য হন। রাস্তা তাঁরই নামেই। কুণালের দাবি, নামবিভ্রাটের কারণে একজন বিতর্কিতের বদলে তাঁর কাকা বিশিষ্ট আর একজনের নাম বাদ দেওয়া কি যুক্তিযুক্ত?’ বিভ্রাটের এই নামবদলে গভীর ক্ষোভ জানিয়েছেন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমও। তিনি বলেছেন, ‘এই সিদ্ধান্ত ইতিহাস বিকৃতির বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত।’
ওয়াকিবহালের মহলের দাবি, গোপাল মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি ছিল বউবাজার ও কলেজ স্ট্রিট এলাকায় মঙ্গলা লেনে। তাঁকে শ্রদ্ধা জানানোর হলে তো সেখানকার কোনো রাস্তার নামবদল করা যেতেই পারত!