Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

হারানো রান্নার গল্প

রান্না সংক্রান্ত কথা আর রেসিপি নিয়ে চলছে হারানো রান্নার গল্প। এই বিভাগে একটি পদ বিষয়ে  একটা গল্প শোনান রন্ধনবিশেষজ্ঞ ও গবেষক শুভজিৎ ভট্টাচার্য, সঙ্গে থাকে সেই রান্নাটির রেসিপি। আজকের পর্বে ঝোল বড়ার ঝোল।

হারানো রান্নার গল্প
  • ২১ জুন, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

রান্না সংক্রান্ত কথা আর রেসিপি নিয়ে চলছে হারানো রান্নার গল্প। এই বিভাগে একটি পদ বিষয়ে  একটা গল্প শোনান রন্ধনবিশেষজ্ঞ ও গবেষক শুভজিৎ ভট্টাচার্য, সঙ্গে থাকে সেই রান্নাটির রেসিপি। আজকের পর্বে ঝোল বড়ার ঝোল।

Advertisement

আষাঢ় মাসের ৭ থেকে ১০ তারিখ অম্বুবাচীর সময়। এবছর ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী তারিখগুলো ২২ থেকে ২৫ জুন। এখনকার প্রজন্ম হয়েতো হিন্দু এই প্রথাটি সম্পর্কে ততটা অবগত নয়। কিন্তু একটা সময় ছিল যখন হিন্দুর ঘরে বিধবারা এই রীতি কঠোরভাবে মেনে চলতেন। অম্বুবাচীর সময় ধরিত্রী রজস্বলা হন। অঙ্কুর উদ্‌গমের সময় এটি। সে তো উৎসবে মুখরিত হওয়ার দিন। কিন্তু না, হিন্দু ঘরের বিধবাদের কাছে সময়টা ছিল বড়ই কঠিন, বড়ই করুণ। আঁচে রাঁধা জিনিস তাঁরা খেতে পারতেন না। পায়ে চটি বা জুতো গলাতে পারতেন না। ফলার করে ভারি কষ্টে এই কয়েকটা দিন কাটত তাঁদের। অথচ আষাঢ়ের প্রথম দিবস থেকেই বঙ্গে বর্ষা আসার কথা থাকলেও, সে শুধুই খাতায় কলমে। এবছরের মতো ব্যতিক্রমী সময় বড় একটা আসে না। জুন মাস তীব্র দাবদাহে জ্বলে যায় পৃথিবী। আর তারই মধ্যে আরও কঠিন নিয়মে অম্বুবাচী পালন করতে হতো সেকালের বিধবাদের। সেই কঠিন নিয়ম নিবৃত্ত হতো তিন দিনের শেষে। অম্বুবাচী শেষ হলে এক নিরামিষ ঝোল রান্না করার রীতি ছিল বাঙালি হিন্দু বিধবাদের মধ্যে। নরম পাতলা সুস্বাদু ঝোল। হয়তো সব ঘরে এমন ঝোল রান্না হতো না, তবে এই ঝোলটি স্নিগ্ধ বলে অনেকেই কঠোর নিয়ম পালনের পর শরীর ঠান্ডা করতে তা খেতেন। গরমের পক্ষেও ঝোলটি  ছিল অতি উপাদেয়। নাম তার ঝোল বড়ার ঝোল। বড়াগুলো ঝোলে ফেলে সেদ্ধ করা হয় বলেই  দু’বার ঝোল শব্দের প্রয়োগ। বেঁচে থাকা, ফেলে দেওয়া উপকরণও এই ঝোল রাঁধতে ব্যবহার করতেন অনেকেই। হারিয়ে যাওয়া পদটির রেসিপি আজ আপনাদের সামনে তুলে দিলাম। এই ধরনের নানা পদের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে বঙ্গজীবনের ঐতিহ্য।

উপকরণ: কুমড়ো পাতা ১ মুঠো, মটর ডাল ২০০ গ্রাম, আলু ডুমো করে কাটা ২ মুঠো, বেগুন লম্বা করে কাটা ৫-৬ টুকরো, পটোল লম্বা করে কাটা ১ মুঠো, ঝিঙে টুকরো করে কাটা ১ মুঠো, কুমড়ো লম্বা ফালি করে কাটা ১ মুঠো, ডাঁটা ১ মুঠো, বরবটি টুকরো করে কাটা ১ মুঠো, কাঁচালঙ্কা ৪টে, শুকনো লঙ্কা ৩টে (ঝাল নিজের আন্দাজ মতোও দিতে পারেন), হলুদ গুঁড়ো সামান্য, কালো জিরে ১ চা চামচ, নুন স্বাদমতো, চিনি সামান্য, সর্ষের তেল পরিমাণ মতো।

পদ্ধতি: মটর ডাল সারা রাত ভিজিয়ে রেখে দিন। তারপর তা অল্প জল দিয়ে বেটে নিন। তার সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী নুন আর মিষ্টি মিশিয়ে মেখে নিন। এই সময় প্রয়োজনে অল্প জল দিতে পারেন। তবে ডাল বাটা যেন তরল না হয়ে যায় সে দিকে খেয়াল রাখুন। এবার কড়াই আঁচে বসিয়ে তাতে জল গরম করুন। জল ফুটতে শুরু করলে তাতে ১ চা চামচ হলুদ মিশিয়ে গুলে নিন। এরপর আলু ও সজনে ডাঁটা দিয়ে রান্না করুন তিন থেকে চার মিনিট। তারপর তাতে পটোল দিয়ে খানিক নেড়ে নিন। তারপর বরবটি দিয়ে দিন। মিনিট পাঁচেক রাঁধার পর তাতে কুমড়ো ও বেগুন দিয়ে দিন। এর সঙ্গে কুমড়োশাক ও অল্প কিছু কুমড়ো শাকের ডাঁটাও এই সব্জির সঙ্গে যোগ করুন। তারপর অল্প চিনি মেশান ও নুন দিন। খুন্তি দিয়ে নেড়ে সব সব্জি ও নুন মিষ্টি মিশিয়ে দিন। তারপর তা ঢাকা দিয়ে পাঁচ মিনিট মতো রান্না করুন। এরপর তাতে কাঁচালঙ্কা মেশান। এবার ঝোল বড়া রান্নার পালা। আগে থেকে বেটে রাখা মটর ডাল হাতে নিন। তা অল্প অল্প করে ফুটন্ত ঝোলের মধ্যে ছাড়ুন। খেয়াল রাখবেন দুটো বড়া কাছাকাছি দেবেন না। এবং এই সময় কখনওই ঝোল নাড়বেন না। কয়েকটি বড়া দেওয়া হলে কড়াই ঢাকা দিয়ে মিনিট পাঁচেক রান্না করুন। তারপর ঢাকা খুলে দেখুন বড়াগুলো অনেকটাই জমে গিয়েছে। একইভাবে তখন আরও কিছু বড়া ঝোলে ছাড়ুন। এবং আবারও তা ঢাকা দিয়ে জমতে দিন। তারপর ঢাকা খুলে দেখুন সব্জি সুসিদ্ধ হয়েছে এবং সব বড়াই জমে এসেছে। এবার এই কড়াই আঁচ থেকে নামিয়ে নিন ও রান্নার শেষ পর্যায়ে চলে যান। তার জন্য অন্য একটা কড়াই আঁচে বসিয়ে তাতে চার টেবিল চামচ সর্ষের তেল ঢেলে দিন। তা গরম হলে তাতে শুকনো লঙ্কা ও কালোজিরে ফোড়ন দিন। ফোড়নের সুগন্ধ বেরলে আগে থেকে করে রাখা ঝোল এই তেলে ঢেলে দিন। রান্নাটাকে খুব সাবধানে আলতো হাতে নেড়ে নিন। ফুটে উঠলে অল্প চিনি মেশান। নিরামিষ রান্না বলে হালকা মিষ্টি স্বাদ এতে মানাবে ভালো। চিনি মিশিয়ে আবারও সামান্য নেড়ে দিন। একবার ফুটিয়ে নামিয়ে নিন রান্নাটি। গরম ভাতের সঙ্গে এই স্নিগ্ধ ঝোল গ্রীষ্মের প্রখর দুপুরে খুবই উপাদেয়।  

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ