Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

থামুক গরিব মারা রাজনীতি

দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে মিলল কেন্দ্রের বঞ্চনার বিচার। হাইকোর্ট সাফ জানিয়ে দিল, ১ আগস্ট থেকে বাংলায় ফের মনরেগার (১০০ দিনের কাজের নিশ্চয়তা প্রকল্প) কাজ চালু করতে হবে।

থামুক গরিব মারা রাজনীতি
  • ২০ জুন, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে মিলল কেন্দ্রের বঞ্চনার বিচার। হাইকোর্ট সাফ জানিয়ে দিল, ১ আগস্ট থেকে বাংলায় ফের মনরেগার (১০০ দিনের কাজের নিশ্চয়তা প্রকল্প) কাজ চালু করতে হবে। বুধবার তাঁর নির্দেশে প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট করেন, মনরেগার মতো জনস্বার্থের প্রকল্প চিরতরে ঠান্ডাঘরে পাঠানো যায় না। বাংলার মানুষের স্বার্থে অতীত ও ভবিষ্যতের সীমারেখা নির্ধারণ করে কেন্দ্রকে এই প্রকল্পের কাজ ফের শুরু করতে হবে। এতে একত্রে রাজ্য সরকার এবং আন্দোলনকারী সংগঠনের তিনবছরের লড়াই মান্যতা পেল। বিচার পেল, শেষহাসি হাসল বাংলার মানুষ এবং অবশ্যই রামধাক্কা খেল ক্ষুদ্রস্বার্থের গেরুয়া রাজনীতি। শেষবার টাকা এসেছিল ২০২২ সালের ৯ মার্চ। তারপর থেকে মনরেগায় বাংলাকে কানাকড়িও দেয়নি মোদি সরকার। সেটাও মাত্র ৯.২০ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগকে ঢাল করে। এমনকী মনরেগা আইনের ২৭ ধারা প্রয়োগে বকেয়া অর্থ এবং পরবর্তী প্রতিটি অর্থবর্ষের শ্রমদিবস বরাদ্দ পর্যন্ত কেন্দ্র বন্ধ রাখে। তার ফলে কয়েক লক্ষ শ্রমদিবস সৃষ্টির সুযোগ বানচাল হয়ে গিয়েছে। এর প্রত্যক্ষ বিরূপ প্রভাব পড়েছে গ্রামীণ অর্থনীতির উপর। ব্যাহত হয়েছে দারিদ্র্যদূরীকরণ প্রক্রিয়া। অবশেষে বুধবার উচ্চ আদালত মারফত মিলল ন্যায়বিচার। পশ্চিমবঙ্গে মনরেগার কাজ বন্ধ তিনবছর দু’মাস যাবৎ। এর মধ্যে লাগাতার চলেছে দিল্লিতে দরবার, চিঠির পর চিঠি, বারবার অ্যাকশন টেকেন রিপোর্ট পেশ এবং মামলা। বুধবার প্রধান বিচারপতি টি এস শিবজ্ঞানম এবং বিচারপতি চৈতালি চট্টোপাধ্যায় দাসের ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়েছে, মনরেগার জন্য বরাদ্দ টাকা কোথায় কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, কোথাও দুর্নীতি হচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য কেন্দ্রের পর্যাপ্ত ক্ষমতা রয়েছে। কেন্দ্র সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করুক। কিন্তু কাজ চালু রাখতে হবে। কারণ এমজিএনআরইজিএ’তে কোথাও বলা নেই যে, অর্থের অনিয়ম হলে প্রকল্পের কাজ অনির্দিষ্টকাল বন্ধ থাকবে। 

Advertisement

মনরেগা ইস্যুতে সুবিচার চেয়ে মামলা করেছিল পশ্চিমবঙ্গ খেতমজুর সমিতি। তাদের অভিযোগ ছিল, ২০২১-এর ডিসেম্বর থেকে এরাজ্যে মনরেগার মজুরি দেওয়া হচ্ছে না। তাদের দাবি, যাবতীয় বকেয়া মজুরি অবিলম্বে মেটাতে হবে। তার সঙ্গে দিতে হবে টাকা বন্ধ রাখার জন্য কিছু সুদও। একই বিষয়ে হাইকোর্টে পৃথক মামলাও হয়। এদিনের রায়ের পর সমিতির তরফে অনুরাধা তলোয়ার বলেন, ‘এটা গ্রামীণ শ্রমিকদের এক উল্লেখযোগ্য ও ঐতিহাসিক জয়। এই রায় মনরেগার অধীনে তাঁদের কাজ পাওয়ার অধিকারের এক পুনর্ঘোষণা।’ উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, আদালতের নির্দেশে গঠিত চার সদস্যের কমিটি গত এপ্রিলে হাইকোর্টে একটি রিপোর্ট জমা দেয়। তাতে বলা হয়, মনরেগা দুর্নীতির ইস্যুতে চারটি জেলা থেকে ২.৪০ কোটি টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। তারপরই চূড়ান্ত পদক্ষেপ করল আদালত। হাইকোর্ট জানায়, এই প্রকল্পের বেআইনি সুবিধা প্রাপকদের রেয়াত নয়। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অর্থও উদ্ধার করতে হবে। কিন্তু এই মুহূর্তে, এরাজ্যে মনরেগার কাজ ফের চালু করা নিয়েই অবশ্য আদালত বেশি উদ্বিগ্ন। তাই কাজটি শুরু করতে হবে অবিলম্বে। অতীত দুর্নীতির তদন্ত চলুক। দুর্নীতির পুনরাবৃত্তি নিশ্চিতভাবে রুখতে বাংলার জন্য কোনও বিশেষ শর্ত, নিয়ন্ত্রণ বিধিনিষেধও জারি করতে পারে কেন্দ্র। কিন্তু বাংলার গরিব মানুষের স্বার্থে মনরেগার কাজ ১ আগস্ট থেকে চালু করতে হবে। মজুরির টাকা যাতে সরাসরি শ্রমিকদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পৌঁছয়, তা নিশ্চিত করবে কেন্দ্র। তার পাশাপাশি উদ্ধার হওয়া যে টাকা রাজ্যের অ্যাকাউন্টে রয়েছে, তা কেন্দ্রকে পাঠাতে হবে। ওই টাকা কীভাবে বণ্টিত হবে সেই বিষয়ে পরে সিদ্ধান্ত নেবে আদালত। পরবর্তী শুনানি ১৫ আগস্টের পর। অতীতের বকেয়াসহ যাবতীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে সেদিনই।
অত্যন্ত কার্যকরী কর্মসংস্থান প্রকল্পটি চালু রাখা নিয়ে রাজ্যের দীর্ঘদিনের বক্তব্য উচ্চ আদালতে মান্যতা পাওয়ায় তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। এই ইস্যুতে, বস্তুত সুর সপ্তমেই চড়ান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নবান্নে এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আজকের রায়ের সমস্ত দিক আমরা খতিয়ে দেখছি। কিন্তু আমার প্রশ্ন হল, আগের বকেয়া অর্থের কী হবে? এই প্রকল্পে যাঁরা কাজ করেছেন, তাঁদের বকেয়া মজুরির পরিমাণটা বিপুল। সেই টাকা আগে দিক কেন্দ্র। প্রায় সাড়ে তিনবছর প্রকল্প চালানোর টাকাটারই-বা কী হবে? বন্ধ কাজ আমরাই চালিয়ে গিয়েছি। কেন্দ্রের এরিয়ার দেওয়া উচিত। আমাদের টাকা অন্য রাজ্যকে দেওয়া হয়েছে। এটা ক্রিমিনাল অফেন্স।’ কেন্দ্রের উচিত, উচ্চ আদালতের রায় মেনে অবিলম্বে পদক্ষেপ করা। এনিয়ে তারা ফের আইনি প্যাঁচ কষার রাস্তায় গেলে তা হবে আরও দুর্ভাগ্যজনক। গরিব মারা রাজনীতির এখানেই ইতি দেখতে চায় বাংলা।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ