


বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: মৌচাকে কি ঢিল পড়েছে? জাল ওষুধ চক্রের বিরুদ্ধে লাগাতার অভিযানে নামার পর এবার তটস্থ হওয়ার পালা ড্রাগ কন্ট্রোলের তদন্তকারী আধিকারিকদের। কারণ, ফোন এসেছে খাস দিল্লি থেকে। বক্তব্য স্পষ্ট, ‘অনেক হয়েছে। এবার জাল ওষুধের তদন্ত বন্ধ করুন।’ অর্থাৎ, একের পর এক হানা, হরিয়ানায় জাল ওষুধ প্যাকেজিংয়ের কারখানার হদিশ, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র পর্যন্ত ছড়ানো শিকড়ের খোঁজ... যাবতীয় সাফল্য এবং তদন্তের অগ্রগতি এখন প্রশ্নচিহ্নের মুখে। শুরু হয়েছে প্রভাব খাটানো। সূত্রের খবর, যে ওষুধ ব্যবসায়ীর দোকানে সম্প্রতি হানা দিয়ে হরিয়ানার জাল কারবারের সূত্র মিলেছিল, তাঁর বিরুদ্ধে তদন্তকারীদের নিরস্ত করতেই ফোন এসেছে এক শীর্ষমহল থেকে। দিল্লির এক প্রভাবশালীর সঙ্গে নিজের সম্পর্ক কতটা গভীর, সেকথা জানিয়ে হিমশীতল গলায় ফোনে এক ব্যক্তি তদন্তকারীকে শাসিয়েছেন, ‘ও (ওষুধ ব্যবসায়ী) আমাদের ঘনিষ্ঠ। অনেক তদন্ত হয়েছে। এইবার থামান।’
ইনসপেক্টর অব ড্রাগ কন্ট্রোল পদমর্যাদায় ওই অফিসার খোঁজখবর করে জানতে পারেন, নম্বরটি হরিয়ানার। তটস্থ হয়ে তিনি বিষয়টি জানান ঊর্ধ্বতন কর্তাদের। তাঁরা ওই নম্বরটি সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেছেন। রাজ্য ড্রাগ কন্ট্রোলের এক পদস্থ কর্তা বলেন, ‘আমরা চাপের মধ্যে কাজ করায় অভ্যস্ত। তবে যে ধরনের ব্যক্তি ফোন করেছেন, তা যদি সত্যি হয়, বিষয়টিতে কর্তাদের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। সত্যিটা কী, যাচাই করে নেওয়া উচিত। তবে আমরা এইসব চাপের সামনে মাথা নোয়াব না।’ ইতিমধ্যেই স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণস্বরূপ নিগমকে ড্রাগ কন্ট্রোলের শীর্ষকর্তার তরফে গোটা ব্যাপারটা জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্যসচিব বলেন, ‘বিষয়টির দিকে নজর রয়েছে।’
সূত্রের খবর, কিছুদিন আগে খবর আসে অন্তঃকর্ণের সংক্রমণ, ভার্টিগো, টিনিটাস, ব্যালান্সের সমস্যা—এইসবে অত্যন্ত কার্যকর একটি জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের ওষুধ জাল হচ্ছে। আসছে হরিয়ানা থেকে। অভিযোগ জানিয়েছিল খোদ নির্মাতা সংস্থাই। এরপরই গোপন সূত্রে উল্টোডাঙার এক ওষুধের দোকানের খোঁজ পান তারা। সেই দোকানে হানা দিয়ে জাল ওষুধ পাওয়া না গেলেও কেনাকাটার বিল মেলে। খবর দেওয়া হয় হরিয়ানার এফডিএকে। এরপরই তদন্তকারীর কাছে আসে ‘প্রভাবশালী মহলের ফোন’। রাজ্যের দেওয়া খবরের সূত্র ধরে জাল ওষুধের বিরুদ্ধে অভিযানে কিন্তু সফল হয়েছে হরিয়ানা সরকার। উদ্ধারও হয়েছে ভেজাল ওষুধ প্যাকেজিংয়ের প্রচুর হাইটেক সরঞ্জাম।
জাল ওষুধের এই রমরমা কিন্তু উঠে এসেছে সংসদেও। বিরোধী তরফে তো বটেই, রাজ্যসভায় বিজেপির সদস্য শমীক ভট্টাচার্যও প্রশ্নোত্তর পর্বে কিছু জিজ্ঞাস্য রাখেন কেন্দ্রের সামনে। তিনি জানতে চান, গত তিন বছরে পশ্চিমবঙ্গ থেকে কত পরিমাণ ও অর্থের জাল ওষুধ বাজেয়াপ্ত হয়েছে? কেন্দ্রীয় (সিডিএসসিও) ও রাজ্য ড্রাগ কন্ট্রোল কতবার হানা দিয়েছে ও ব্যবস্থা নিয়েছে? সবচেয়ে বেশি কী কী ওষুধ জাল হচ্ছে? এবং পশ্চিমবঙ্গ ফার্মাসিউটিক্যালের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হল? স্বাস্থ্যমন্ত্রক আলাদাভাবে পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে উত্তর দেয়নি। গোটা দেশের নিরিখে তারা জানিয়েছে, ২০২১-২২, ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে মোট ৮৮ হাজার ৮৪৪, ৯৬ হাজার ৭১৩ ও ১ লক্ষ ৬ হাজার ১৫০টি ওষুধের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮ হাজার ৫৮৬টি নিম্নমানের এবং ১ হাজার ৮৫টি নমুনা ভেজাল বলে প্রমাণিত হয়েছে। জাল ওষুধ নিয়ে তিন বছরে মামলা হয়েছে ১ হাজার ৮৫৯টি।