নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: দপ্তরের ছাড়পত্র (নো অবজেকশন সার্টিফিকেট বা এনওসি) ছাড়া কোনও সরকারি ডাক্তার প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে পারবেন না। এ নির্দেশ আজকের নয়, দীর্ঘদিনের। তবে কার্যক্ষেত্রে যেটা হতো, নিয়ম বলবৎ করার বদলে স্বাস্থ্যকর্তাদের একটি বড় অংশের চোখে কালো কাপড় বেঁধে বসে থাকা! এনওসি না নিয়েই বাধাহীনভাবে চলত প্র্যাকটিস। প্রভাব খাটিয়ে এবং পারস্পরিক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে ‘বাধ্যতামূলক’ নিয়মকেই কার্যত ‘অপশনাল’ বানিয়ে ফেলে চিকিৎসক মহলের একাংশ। স্বাস্থ্যভবনও তাই ঘাঁটাত না। কিন্তু আর জি কর আন্দোলন সরকারকে চরম অস্বস্তিতে ফেলায় সরকারও অধিকাংশ চিকিৎসকের প্রাইভেট প্র্যাকটিসের ব্যাপারে নিজের নরমপন্থী অবস্থান থেকে সরে আসে। কড়া নির্দেশ জারি হয়, এনওসি না পেলে কোনওভাবেই প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে পারবেন না সরকারি চিকিৎসক।
বিষয়টি নিয়ে সরকার যে আর কোনও শিথিলতা দেখাবে না, তাও এবার বুঝিয়ে দিল রাজ্য। বহু সরকারি চিকিৎসকের প্রাইভেট প্র্যাকটিসের আবেদন খারিজ করে দিল তারা। জেনারেল ডিউটি মেডিক্যাল অফিসার এবং স্পেশালিস্ট মেডিক্যাল অফিসার মিলিয়ে ৭৩ জন সরকারি চিকিৎসকের প্রাইভেট প্র্যাকটিসের আবেদনে ‘না’ করে দিয়েছে রাজ্য। ১ সেপ্টেম্বর পরপর দু’টি নির্দেশনামায় এই কথা জানিয়েও দিয়েছে স্বাস্থ্যদপ্তর। মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি, ইএনটি, শিশু, প্যাথোলজি, অ্যানাসথেসিওলজি, চোখ, অর্থোপেডিকস এবং ত্বক বিভাগের বিশেষজ্ঞ মেডিক্যাল অফিসাররা আছেন তালিকায়। বাঁকুড়া, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, নদীয়া, দুই বর্ধমান, পশ্চিম মেদিনীপুর, হুগলি, বীরভূম, কোচবিহার, মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুর ও দার্জিলিং জেলার চিকিৎসকদের আবেদন খারিজ হয়েছে।
প্রসঙ্গত, প্রাইভেট প্র্যাকটিসই মুখ্য, আর সব গৌণ—যত দিন যাচ্ছে এই প্রবণতা বাড়ছে। ৪টের পর অধিকাংশ মেডিক্যাল কলেজের সিনিয়র শিক্ষক- চিকিৎসকদের কর্মস্থলে পাওয়া যায় না। এর জলজ্যান্ত উদাহরণ দেখা গিয়েছিল মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজের স্যালাইন-কাণ্ডে। এমনকী, অভয়া কাণ্ডের প্রতিবাদে হাসপাতালে কর্মবিরতি করেছিলেন যে জুনিয়র ডাক্তাররা, দেখা যায়, তাঁদের একাংশ সেই সময়েও চুটিয়ে প্র্যাকটিস করেছেন স্বাস্থ্যসাথী কার্ডে। লক্ষ লক্ষ টাকা রোজগার করেছেন। কিন্তু এক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে, চিকিৎসকদের প্র্যাকটিসের অধিকার তো রাজ্য কেড়ে নেয়নি। তাহলে কোন নিয়মে এতজন চিকিৎসকের আবেদন খারিজ বা সরকারি ভাষায় ‘রিজেকশন অব এনওসি’ হল? দপ্তর সূত্রের খবর, বাম জমানার একটি নিয়মের বলেই এটা হয়েছে। ১৯৯৩ সালের ৩ মার্চ জারি করা ‘ক্যালকাটা গেজেট এক্সট্রা অর্ডিনারি নোটিফিকেশন’ শীর্ষক নির্দেশে বলা হয়েছিল, প্রাইভেট প্র্যাকটিসের জন্য এনওসি পেতে গেলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে কোনও নতুন কাজ বা অ্যাসাইনমেন্টের শুরুতেই তা চাইতে হবে। অর্থাৎ, চাকরিতে যোগদান বা প্রমোশন অথবা বদলির সময় ছাড়পত্র চাইতে হবে। এই ৭৩ জন সেই নিয়মনীতিকেও থোড়াই কেয়ার করেছেন। নয়া অ্যাসাইনমেন্টের শুরুতে নয়, ২ থেকে ১২ বছর পরেও আবেদন করেছেন তাঁরা! স্বভাবতই বাম জমানার নিয়ম দেখিয়ে তাঁদের আবেদন সঙ্গে সঙ্গে বাতিল করে দিয়েছে স্বাস্থ্যভবন। এখন তাঁদের পরবর্তী প্রমোশন বা বদলির অপেক্ষায় থাকতে হবে!