


নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি: ‘ডোর স্টেপ ডেলিভারি’ মানে গণবণ্টন ব্যবস্থায় এফসিআই গুদাম থেকে খাদ্যশস্য (চাল-গম) রেশন দোকান পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া। বাড়ি বাড়ি নয়। ‘দুয়ারে রেশন’-এর অস্তিত্বই নেই আইনে। সংসদ হোক বা সুপ্রিম কোর্ট—জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনের দোহাই দিয়ে মোদি সরকারের অনড় অবস্থান, চলবে না ‘দুয়ারে রেশন।’ এনডিএ শাসিত অন্ধ্রপ্রদেশে সম্প্রতি বন্ধ হয়েছে এই প্রকল্প। তাহলে কি ‘ডবল ইঞ্জিন’ রাজ্যের নিয়ম মেনে পশ্চিমবঙ্গেও বন্ধ হতে চলেছে ‘দুয়ারে রেশন’ ব্যবস্থা? বাংলায় পালাবদলের পর উঠছে এই প্রশ্ন।
২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুরু করেছিলেন ‘দুয়ারে রেশন।’ কিন্তু সেই ব্যবস্থার বিরোধিতা করে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা করেন রেশন দোকানদারদের একাংশ। হেরে যায় তৎকালীন রাজ্য সরকার। এরপর সরকার দ্বারস্থ হয় সুপ্রিম কোর্টে। ২০২২ সালে। সেই মামলায় ২০২৫ সালে যুক্ত হয় কেন্দ্রীয় সরকার। সম্প্রতি সংসদে কেন্দ্রীয় খাদ্যমন্ত্রী জানান, গ্রাহকের বাড়িতে গিয়ে, এমনকি ৬৫-ঊর্ধ্ব নাগরিক, বিশেষভাবে সক্ষমদের জন্যও এই ধরনের ব্যতিক্রমী কোনো ব্যবস্থা নেই। একই অবস্থান বজায় ছিল শীর্ষ আদালতেও। ২৭২ পাতার পিটিশন ফাইল করে মোদি সরকার জানিয়ে দেয়, দুয়ারে রেশন চলবে না। তাদের বক্তব্য ছিল, রাজ্য তার নিজের কোনো প্রকল্পে ইচ্ছে মতো খাদ্যশস্য বণ্টন করতে পারে। কিন্তু খাদ্য সুরক্ষা আইনে চলা ‘প্রধানমন্ত্রী গরিব কল্যাণ অন্ন যোজনা’য় নয়। দেশজুড়ে চালু রয়েছে ‘ওয়ান নেশন ওয়ান রেশন কার্ড’। অর্থাৎ, দেশের যে কোনো গ্রাহক যে কোনো রেশন দোকান থেকে খাদ্যশস্য নিতে পারেন। কিন্তু দুয়ারে রেশন ব্যবস্থায় তা সম্ভব নয়। তাই এই ব্যবস্থা বন্ধ তো বটেই, রাজ্য সরকারকে আর্থিক জরিমানারও আর্জি জানানো হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টে।
রাজ্য, কেন্দ্র, রেশন ডিলার— গত ফেব্রুয়ারি মাসে তিনপক্ষের শুনানি সমাপ্ত করে রায়দান রিজার্ভ রেখেছে শীর্ষ আদালত। তাই প্রশ্ন উঠছে, এখন কী করবে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকার? মোদি সরকারের বিরোধিতা? নাকি, সুপ্রিম কোর্টে নতুন করে আবেদন করে জানানো হবে ‘ডবল ইঞ্জিনের’ অবস্থান? কারণ, রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের ডিএ মামলাই হোক বা ওবিসি, শাসক দল বদলানোর পরেই সুপ্রিম কোর্টে অবস্থান বদলে গিয়েছে রাজ্যের। কোনোটিতে শুনানি পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন, কোনোটি আবার বাতিলই করতে চেয়েছে রাজ্য।
দেশের মধ্যে একমাত্র পশ্চিমবঙ্গে চলছে দুয়ারে রেশন। এই ব্যবস্থায় প্রত্যেক রেশন দোকানদার খাদ্যশস্য বণ্টনের নির্দিষ্ট কমিশন ছাড়াও প্রতি মাসে পান পাঁচ হাজার টাকা। দুয়ারে পৌঁছে দিলে কুইন্টাল প্রতি অতিরিক্ত ৭৫ টাকা। রাজ্যে রয়েছেন ২০ হাজার ২৬১ জন রেশন ডিলার। কিন্তু এতে কোনো লাভ হয় না বলেই মন্তব্য অল ইন্ডিয়া ফেয়ার প্রাইস শপ ডিলার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বিশ্বম্ভর বসুর। তাঁর দাবি, ‘চালক, জ্বালানি, খাদ্যশস্য তোলা-নামানো সহ নানা খাতে মাসে ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। রাস্তায় দুর্ঘটনা বা প্রাকৃতিক কারণে খাদ্যশস্য নষ্ট হলে, দায় দোকানদের উপরই চাপায় রাজ্য। ফলে দুয়ারে রেশন ব্যবস্থা বন্ধ হওয়া উচিত। এতে বছরে ১২১ কোটি টাকা বাঁচবে।’ রেশন দোকানদারদের দাবি মেনে বন্ধ হয়েছে আটা সরবরাহ। এবার কি দোকানিদের দাবি মেনে দুয়ারে রেশনও?
কিন্তু তিন বছর ধরে শুনানি, এমনকী রায়দান রিজার্ভ রাখার সময়ও সুপ্রিম কোর্টে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য ছিল, ‘এটা তো রেশন ব্যবস্থার ব্লিঙ্ক ইট!’ তাহলে? কী করবে এখন ডবল ইঞ্জিন পশ্চিমবঙ্গ?