গ্রেপ্তারি ও পথ দুর্ঘটনায় কী কী অবাক করা আইন রয়েছে? জানালেন আইনজীবী রাজর্ষি রায়চৌধুরী।
গ্রেপ্তারি ও পথ দুর্ঘটনায় কী কী অবাক করা আইন রয়েছে? জানালেন আইনজীবী রাজর্ষি রায়চৌধুরী।
ভারতের আইনব্যবস্থা বেশ কড়া। সামান্য ভুলচুক হলেই মিলতে পারে কঠোর শাস্তি। তবে সব দেশেই আইনের বইয়ের সঙ্গে বাস্তব সবসময় হুবহু মেলানো যায় না। কিছু ছাড় দিতেই হয়। আবার এই আইনের বইতেই এমন কিছু আইনকানুন ও নিয়ম লেখা হয়েছে, যার বেশ কিছু তথ্য আমরা অপেক্ষাকৃত কম জানি। জনমানসে এসব আইন নিয়ে ধারণা কম। আজ তেমন কিছু আইনের দিকেই নজর দেওয়া যাক বরং।
প্রথমেই আসা যাক গ্রেপ্তারির নিয়মে।
কম প্রচারিত গ্রেপ্তারি আইন
ভারতে গ্রেপ্তার নিয়ে বেশ কিছু আইন ও অধিকার রয়েছে, যা জানা থাকলে নিজের আইনি অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকা যায়। এর মধ্যে কিছু আইন সম্পর্কে আমরা অনেকেই জানি। কিছু আইন একটু কম প্রচলিত।
প্রথমেই জেনে রাখা ভালো, ডিজিটাল অ্যারেস্ট বলে কিছুর অস্তিত্ব আমাদের দেশে নেই। এটি সম্পূর্ণ ভুয়ো ও জালিয়াতদের অস্ত্র। কাজেই যে কোনো যুক্তি বা ভয় দেখানো হোক, পাত্তা দেবেন না।
গ্রেপ্তারের কারণ জানানো বাধ্যতামূলক। অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে কী কারণে তিনি গ্রেপ্তার হচ্ছেন তা জানার অধিকার অভিযুক্তের আছে।
নিজের আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগের সম্পূর্ণ অধিকার আছে অপরাধীর। আইনি পরামর্শ নেওয়া থেকে তাঁকে বঞ্চিত করতে পারে না পুলিশ প্রশাসন।
গ্রেপ্তার হওয়ার পর অভিযুক্তের আত্মীয়, বন্ধু বা মনোনীত ব্যক্তিকে পুলিশকে অবহিত করতে হয়। প্রয়োজনে ধৃত ব্যক্তিও সেই খবর দিতে পারেন।
হাতে হাতকড়া পরাবে, তখন বুঝবি! — ঠাট্টাছলে হলেও অনেক সময় একথা শোনা যায়। কিন্তু আসল আইন কী জানেন? ভারতে সব ক্ষেত্রে হাতকড়া পরানো যায় না। অভিযুক্ত দাগীও পালিয়ে যেতে পারে এমন ঝুঁকি থাকলে তবেই হাতকড়া ব্যবহার করা যায়। এ নিয়ে সুস্পষ্ট বিধি ও নিষেধাজ্ঞা আইনের বইগুলিতে আছে।
মহিলাদের গ্রেপ্তার নিয়েও বিশেষ নিয়ম রয়েছে আমাদের দেশে। সাধারণত, সূর্যাস্তের পরে এবং সূর্যোদয়ের আগে কোনো মহিলাকে গ্রেপ্তার করা যায় না। শুধুমাত্র বিশেষ পরিস্থিতি এলে তবেই এই আইন শিথিল হয়। এছাড়া মহিলা অভিযুক্তকে সাধারণত মহিলা পুলিশকর্মী দ্বারা গ্রেপ্তার করা হয়।
আমাদের দেশের নিয়ম অনুসারে, গ্রেপ্তার হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অভিযুক্তকে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হবে। যাতায়াতের সময় বাদ দিয়ে এই ২৪ ঘণ্টার হিসেব করা হয়। এর বেশি সময় আটকে রাখতে হলে আদালতের অনুমতি প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ পরিস্থিতি দেখিয়ে এই আগাম অনুমতি পুলিশ নিয়ে রাখে। যদি কোনো ব্যক্তিকে অন্য কোনো রাজ্য বা ভিন দেশ থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ও সেখান থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে পেশ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, সেক্ষেত্রে গ্রেপ্তার হওয়ার জায়গায় যিনি ম্যাজিস্ট্রেট আছেন, তাঁর সামনে অপরাধীকে পেশ করতে হবে ও পুলিশকে ট্রানজিট রিমান্ড নিতে হবে।
আমাদের দেশ অভিযুক্তের উপরেও জোর খাটাতে দেয় না। আইনের বই বলে, কেউ নিজেকে দোষী প্রমাণ করতে বাধ্য নন। জিজ্ঞাসাবাদের সময় নিজের বিরুদ্ধে স্বীকারোক্তি দিতে আইনত বাধ্য করা যায় না। যদিও পুলিশ জোর করে বা অত্যাচার করে বয়ান লিখিয়ে নিয়েছে এমন অভিযোগ করেন অনেকে। সেক্ষেত্রে পুলিশের জোরজবরদস্তি প্রমাণিত হলে পুলিশের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
এবার দেখে নিই দুর্ঘটনাক্ষেত্রে কিছু কম প্রচারিত আইন।
গুড সামারিটান নীতি: আমাদের দেশে অনেকে মনে করেন, আহতকে নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছলেই বুঝি আইন ও পুলিশি ঝামেলায় পড়তে হয়। আইন অনুসারে এমন ধারণা ঠিক নয়। বরং একজন সাধারণ নাগরিক আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়ে নিজের পরিচয় গোপন রাখার সুযোগ পান। তাঁকে কোনো আইনি ঝঞ্ঝাটে জড়াতে হয় না।
নিজের গাড়িতে নিজেই কেস: গাড়ি চালানোর সময় অনেকে মনে করেন অন্য কারও ক্ষতি না হলে আইনের বিষয় নেই। কিন্তু বেপরোয়া বা বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালিয়ে যদি নিজের গাড়িরও ক্ষতি করেন, তাহলে ট্রাফিক সার্জেন্টের চোখে পড়লে পুলিশ নিজেই আপনার গাড়ির ক্ষতির জন্য আপনাকে কেস দিতে পারেন!
রাস্তায় রেসিং বা স্টান্ট অপরাধ: অনেকে ভাবেন রাস্তায় বেরিয়ে গাড়ি নিয়ে রেস করলে বা রাস্তায় গাড়ির নানা স্টান্ট দেখালে সেটি শুধুই ট্রাফিক আইন ভঙ্গ। বাস্তবে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের সঙ্গে এটি ফৌজদারি অপরাধও।
মদ্যপানের সীমা: মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো চরম অপরাধ। একথা সকলেই জানেন। কিন্তু ঠিক কতটুকু মদ্যপানের মাত্রা পেরলে শাস্তি পেতে পারেন, তা নিয়ে অনেকেরই স্বচ্ছ ধারণা নেই। ভারতে ১০০ মিলি রক্তে অ্যালকোহলের মাত্রা ৩০ মিলিগ্রামের বেশি হলেই মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর অভিযোগ আনা যেতে পারে। এমনকি সুস্থ মস্তিষ্কে ঘটানো কোনো দুর্ঘটনার তুলনায় একই দুর্ঘটনা মদ্যপ অবস্থায় ঘটালে তার শাস্তিও অনেক বেড়ে যায়।
গাড়ির ভিতরও ‘পাবলিক প্লেস’: গাড়ির ভিতর কাচ ঢাকা অবস্থায় থাকলেই সেটি ব্যক্তিগত স্থান হয়ে যায় না। বরং কোনো ব্যক্তিগত গাড়ি যদি এমন কোনো স্থানে থাকে, যেখানে বাইরের মানুষের দৃষ্টিগোচর হয় বা কাচের ভিতরের অংশ বাইরে থেকে দেখা যায়, তাহলে ক্ষেত্রবিশেষে এটি পাবলিক প্লেস হিসেবেই গণ্য করা হবে।
ট্রাম ও গোরুর গাড়িতে ধাক্কা খাওয়ার আইন: ট্রাম নির্দিষ্ট লাইন মেনে চলে, সহজে দিক পরিবর্তন করতে পারে না। ট্রাম ও গোরুর গাড়ির গতি কম। তাই গোরুর গাড়ি বা ট্রামের সামনে হঠাৎ ঢুকে পড়া বা ট্রামলাইন অতিক্রম করার সময় অসতর্কতা দেখালে দুর্ঘটনাগ্রস্ত পথচারী বা অন্য যানের উপর দায় বর্তাতে পারে। যদি তদন্তে দেখা যায়, চালকেরই দোষ, তখন তাঁদের অভিযুক্ত করা হয়।
মনীষা মুখোপাধ্যায়