মেহেবুব হাসান, তপন: জমিদারি নেই। নেই সেই পুরনো জৌলুস। বদলে গিয়েছে পুজোর জায়গা। বদলেছে আয়োজনের ধরন। তবু সময়ের স্রোতে হারিয়ে যায়নি মনোহলির জমিদার বাড়ির দুর্গাপুজো। জমিদার পরিবারের হাত ধরে শুরু হওয়া সেই পুজো এখন সম্পূর্ণ ভাবে গ্রামবাসীর উদ্যোগে পরিচালিত হয়। পুরনো জমিদার বাড়ির জরাজীর্ণ কাঠামো আজ অতীতের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও নতুন মন্দিরে এখন নিয়ম মেনে অনুষ্ঠিত হয় দুর্গোৎসব।
দক্ষিণ দিনাজপুরের তপন ব্লকের মনোহলি গ্রামের এই পুজোর ইতিহাস বহু প্রাচীন। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে তারাচাঁদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে কাছারিবাড়িতে দুর্গাপুজোর সূচনা হয়েছিল বলে স্থানীয় ভাবে জানা যায়। পরবর্তীতে জমিদারবাড়ি নির্মাণের পর পুজোর পরিসর বাড়ে। জমিদারি আমলে দুর্গাপুজো ছিল গ্রামের অন্যতম প্রধান সামাজিক উৎসব। আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ পুজো দেখতে আসতেন। পুজোর দিনগুলিতে ভোগ বিতরণের পাশাপাশি যাত্রাপালা, নাটক, মঙ্গলগান সহ নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকত।
জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর কয়েকবছর নিজেদের উদ্যোগে পুজো চালিয়ে যায় বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের পক্ষে আর আগের মতো বড় আয়োজন করা কঠিন হয়ে পড়ে। আর্থিক ও সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতার কারণে পুজোর দায়িত্ব ধীরে ধীরে স্থানীয় বাসিন্দাদের হাতে চলে আসে। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে গ্রামবাসীর উদ্যোগে বারোয়ারি পুজো হিসাবে তা নতুন ভাবে পথ চলা শুরু করে।
প্রথম দিকে জমিদারবাড়ির ভিতরের দুর্গামণ্ডপে প্রতিমা প্রতিষ্ঠা করা হত। পরে পুরনো মণ্ডপের কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ায় সেখান থেকে পুজো সরিয়ে বাড়ির সামনের অংশে নতুন মন্দির তৈরি করা হয়। বর্তমানে সেই মন্দিরে পুজোর আয়োজন হয়। চাঁদা সংগ্রহ থেকে শুরু করে পুজোর যাবতীয় ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় বাসিন্দারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
জমিদার পরিবারের বংশধর রণধীর বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, জমিদারি ব্যবস্থা উঠে যাওয়ার পর পরিবারের পক্ষে এককভাবে আগের মতো পুজো চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। সেই কারণে গ্রামবাসীদের হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়। তবে পরিবারের সঙ্গে পুজোর আবেগের সম্পর্ক এখনও অটুট রয়েছে। পরিবারের সদস্যরা বর্তমান মন্দিরের পুজোয় অংশ নেন।
গ্রামবাসী নিরঞ্জন বর্মন বলেন, পুজোটি এখন গ্রামের মানুষের। পুরনো দিনের অনেক আয়োজন হারিয়ে গেলেও স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী চাঁদা তুলে পুজো চালিয়ে যাচ্ছেন। নতুন প্রজন্মকে এই ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। একসময় জমিদারবাড়ির বিশাল আয়োজনকে কেন্দ্র করে যে উৎসবের পরিবেশ তৈরি হত আজ তার অনেকটা স্মৃতি। জরাজীর্ণ বাড়ির দেওয়াল সেই অতীতের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। কিন্তু পুজোর ক্ষেত্রে সেই ইতিহাস এখনও থেমে যায়নি। বরং জমিদার পরিবারের হাত থেকে সাধারণ মানুষের হাতে দায়িত্ব যাওয়ার মধ্য দিয়ে মনোহলির দুর্গোৎসব পেয়েছে নতুন পরিচয়। পুরনো ঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়ে প্রতি বছর নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণে এগিয়ে চলেছে এই পুজো। • জমিদার বাড়ি। - নিজস্ব চিত্র।