Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

সাত খুন মাফ

সাত খুন মাফ
  • ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ ০০:০০
Prefer us on Google
সাত-আট মাস আগে, শেখ হাসিনার ‘বিতাড়ন পর্বে’ বাংলাদেশের জেল ভেঙে শতাধিক কট্টর জঙ্গিকে মুক্ত করে দেওয়া হয়। পরে অন্তর্বর্তী সরকারও বেকসুর মুক্তি দিয়েছে একগুচ্ছ শীর্ষ জঙ্গি নেতাকে—তারা জেএমবি, এবিটি এবং হাট সংগঠনভুক্ত—এবং মৃত্যুদণ্ড কিংবা আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত। অনির্বাচিত সরকারের প্রধান মহম্মদ ইউনুস এরপরই সদর্পে ঘোষণা করেন, তাঁর প্রশাসন বাংলাদেশে কোনওরকম জঙ্গিমূলক কাজকর্ম বরদাস্ত করবে না! আর এই প্রেক্ষিতেই ১৩ ফেব্রুয়ারি ‘আয়নাঘর’ পরিদর্শনে গিয়েছিলেন ইউনুস সাহেব। তাঁর পূর্বসূরি হাসিনার আমলে দেশের নাগরিক সমাজের উপর সেনা-পুলিস জুটির ‘নির্যাতন’ কোন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, তার বিস্তারিত জানতেই সপার্ষদ তাঁর ওই বিশেষ ‘পর্যটন’। পড়শি দেশে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ অর্জনের পরই ‘আবিষ্কৃত’ হয় হাসিনার ‘স্বৈরতান্ত্রিক’ জমানার ‘নির্যাতন’ এবং ‘মানবাধিকার হত্যা’র হাজারো কাহিনি। সেসব কে শুনিয়েছে ইউনুস সাহেবকে? গুলাম সারওয়ার রাহাত। কার্যত রাহাতকেই ‘বগলদাবা’ করে ‘কুখ্যাত’ আয়নাঘর ঘুরে বেড়িয়েছেন মহম্মদ ইউনুস। কিন্তু কে এই ‘মহামানব’? সেসব ইতিমধ্যেই ছবিসহ এক্স হ্যান্ডেলে পোস্ট করেছেন হাসিনাপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়। নির্বাচিত সরকারের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী-পুত্রের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট নিয়ে স্বভাবতই তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। শুধু বাংলাদেশে নয়, ভারতেও। কারণ রাহাত শুধু বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ এবং গণতান্ত্রিক শক্তির শত্রু নয়, তীব্র ভারত-বিরোধী, ভারতের ক্ষতি করার ব্রত নিয়েই সে উগ্র মৌলবাদী রাজনীতি করে থাকে। এই দুর্বৃত্ত ঘোষিত নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবি’র সেকেন্ড-ইন-কমান্ড। খাগড়াগড় বিস্ফোরণ কাণ্ডের মূল চক্রী সে’ই। গোয়েন্দা সূত্রের খবর, বস্ত্রব্যবসার আড়ালেই সে জঙ্গি কার্যকলাপের চাঁই। রাহাতেরই আর্থিক সাহায্যে পূর্ব বর্ধমানের খাগড়াগড়, শিমুলিয়া এবং মুর্শিদাবাদের মুকিমনগরে জেএমবি মডিউল চালু হয়। 
Advertisement
প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালে ময়মনসিংহের ত্রিশালায় জেল থেকে আদালতে যাওয়ার পথে প্রিজন ভ্যানে একটি হামলার ঘটনা ঘটে। দু’দেশেরই গোয়েন্দা নথিতে রয়েছে, ওই ঘটনায় পুলিস খুন করে জঙ্গি ছিনিয়ে নেওয়ার মাস্টার মাইন্ড এই রাহাত। হাসিনা প্রশাসন তাকে গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতার সামনে ‘ত্রাস’ বলেই জানত। ময়মনসিংহের অপারেশন সারতে সে ১.৩০ কোটি টাকা খরচ করেছিল।  তার মদতে প্রিজন ভ্যান থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয় সালাউদ্দিন সালেহান, জাহিদুল ইসলাম ওরফে বোমা মিজান এবং রাকিবুল হাসান নামক ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ জঙ্গিদের। তারা প্রত্যেকেই দুই বাংলার গোয়েন্দাদের মাথাব্যথার কারণ বলে আজও বিবেচিত। উল্লেখ্য, পরে র‌্যাবের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে হাসান নিহত হয়। তবে সালেহান এবং বোমা মিজান যোগ দেয় জেএমবির পশ্চিমবঙ্গের মডিউলে। সুখবর এই যে, পরে বোমা মিজানকে এনআইএ দক্ষিণ ভারত থেকে পাকড়াও করে। কিন্তু ছদ্মবেশ ধারণে ওস্তাদ সালেহান এখনও নিপাত্তা। সালেহান এবং বোমা মিজানের এপারে অনুপ্রবেশ থেকেই পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশি জঙ্গিদের ‘উত্থান’ শুরু হয়। ময়মনসিংহের অপারেশনে রাহাতের নির্দেশেই কাজ করেছিল নারায়ণগঞ্জের মাসুম মিয়াঁ। খাগড়াগড় পর্বে সে এদেশে ‘শেখ সাজিদ’ নাম ব্যবহার করত। এনআইএ তার নামে ১০ লক্ষ টাকার ইনাম ঘোষণা করেছিল। সাজিদ ওরফে মাসুম পরে বিধাননগর পুলিসের জালে আটকা পড়ে। 
‘নিরীহ নির্যাতিত নাগরিক’ সেজে যে রাহাত হাসিনার জমানার আদ্যশ্রাদ্ধ করছে সে কিন্তু সাতজনকে খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত। অভিযোগ অনুসারে, একের পর এক নরহত্যার ওই নৃশংসতা সে ঘটিয়েছিল ঢাকা ও চট্টগ্রামে। ২০১৩ সালের ২১ ডিসেম্বর ঢাকার গোপীবাগ রামকৃষ্ণ মিশন রোডে একটি আবাসনে এক ‘হুজুর’, তাঁর ছেলে এবং চার অনুগামীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তার আগে চট্টগ্রামে গলা কেটে খুন করা হয় এক ‘ব্লগার’কে। প্রতিটি নারকীয় কীর্তিতে নাম জড়িয়ে রয়েছে এই রাহাতের। মোট ৪৩ মাস কারাবাসও করেছে সে। হাসিনার আমলে রাহাতের উপর নাকি লাগাতার ‘সাতদিন’ অকথ্য অত্যাচার চলেছিল। জেএমবি’র সেকেন্ড-ইন-কমান্ডের কাছ থেকে তার রোমহর্ষক বিবরণ শুনে ইউনুস সাহেবের ‘দরদি’ প্রতিক্রিয়া মিলেছে, ‘আপনার মতো এরকম হাজার হাজার মানুষ অত্যাচারিত। সব দেখা হবে।’ একটি বাংলা প্রবাদ আক্ষরিক অর্থেই সত্য হয়েছে মহম্মদ ইউনুসের ‘মানবিক’ প্রশাসনের বদান্যতায়—সাত সাতটি খুনের আসামিকে মাফ করে দেওয়া হয়েছে—অর্থাৎ রাহাতের সাত খুন মাফ! কাকতালীয় হলেও তা সত্যি। এরপর বুঝতে বাকি থাকে না, এই ক্ষমতালোভী অনির্বাচিত প্রশাসন বাংলাদেশকে কোন নরকে টেনে নামাতে তৎপর। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে বৈরিতা বৃদ্ধির নীতিতেই যে তারা শান দেবে, তাও খোলসা করে দিচ্ছেন নোবেলজয়ী ‘পণ্ডিত’। উগ্র মুসলিম মৌলবাদীদের মারাত্মক খপ্পরে পড়ে যাওয়া বাংলাদেশ কীভাবে উদ্ধার পাবে, তা সেদেশের নাগরিকরাই ঠিক করবেন। তবে এপার বাংলাসহ সারা ভারতের সুরক্ষার স্বার্থে আমাদের সদাসতর্কই থাকতে হবে।
Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ