‘টাকা মাটি মাটি টাকা’—বলেছিলেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ। কিন্তু ঠাকুরের একজন পরমতম ভক্তের পক্ষেও তা মেনে চলা সম্ভব কি? প্রয়াগরাজে সদ্য সমাপ্ত হল ‘মহাকুম্ভ’। এই মেলাকে ধর্মীয় গণ্ডি অতিক্রম করাবার লক্ষ্য ছিল লক্ষণীয়। বিশ্বাস, সংস্কৃতি আর বাণিজ্যকে সরকারিভাবে একসূত্রে গেঁথে দেওয়ার ব্র্যান্ডিং করল মোদি-যোগীর যৌথ উদ্যোগ। হলই-বা বিশ্বের বৃহত্তম ধর্মীয় সমাবেশ—মুক্ত বাণিজ্যের অঙ্গীকার তো আজ ভারতেরও। তাহলে প্রাচীন গড্ডলিকায় ভেসে থেকে এই মওকা কেন হাতছাড়া করা হবে? মোটেই না, বণিক মহলকে ২ লক্ষ কোটি টাকার বাণিজ্যের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হল। মধ্যবর্তীকালে একাধিক অবাঞ্ছিত বিষাদের ঘটনার সাক্ষী থেকে মহাকুম্ভ নাকি আরও বেশি ‘গোল’ দিয়েছে—বাণিজ্যের পরিধি নাকি তিন লক্ষ কোটি টাকার! সোজা কথায়, অর্থের দুনিয়া আরও বেশি করে টাকার কব্জায় চলে গিয়েছে। সমাজের প্রতিটি মানুষকে এই দ্রুত পরিবর্ধিত বৃত্তের অংশ করে নেওয়াই আজকের অর্থনীতির দর্শন ও লক্ষ্য। ধনী, মধ্যবিত্ত শ্রেণি তো বটেই, গরিব এমনকী অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েরাও ‘ফিনান্সিয়াল ইনক্লুশন’ তত্ত্বের অংশ।
Advertisement
তবে এই তত্ত্বের বাস্তব প্রয়োগ তখনই সুন্দর হতে পারে যখন গোটা প্রক্রিয়া চলবে যথাসম্ভব স্বচ্ছতার ভিত্তিতে। আর্থিক স্বচ্ছতার নীতির প্রাণভোমরা হল সুষ্ঠু ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা। ব্যাঙ্কের পরিষেবা যদি সব নাগরিককে স্পর্শ এবং প্রাণিত করে, তবেই তা সুষ্ঠু আখ্যা পেতে পারে। মানুষের আয়, কর প্রদান, সঞ্চয়, বিনিয়োগ, ভোগব্যয়, সামাজিক দায়িত্বপালন প্রভৃতি সব ক্ষেত্রেই যদি ব্যাঙ্কগুলি গ্রাহক-বান্ধব হয়ে না ওঠে, তবে যাবতীয় আয়োজন, ঘোষণা, তত্ত্বকথা বৃথা। মোদি সরকার এই ব্যাপারে অনেক গালভরা প্রকল্প গ্রহণ এবং ঘোষণা করেছে। কিন্তু সেসব সুষ্ঠু রূপায়ণের হাতিয়ার যে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা, তার কী হাল? ২০১৪ সালে মোদি জমানার আগে দেশে ব্যাঙ্ক শাখার সংখ্যা ছিল ১ লক্ষ ১৮ হাজারের কাছাকাছি। সংখ্যাটি ২০২৪-এ ১ লক্ষ ৬১ হাজারে পৌঁছেছে। এর মধ্যে লক্ষাধিক শাখা গ্রাম ও আধা শহরাঞ্চলে। এগুলির ভিতরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। কিন্তু সেখানে কর্মী সংখ্যা কত? সংসদেই মিলল তার সরকারি জবাব। অর্থমন্ত্রক জানিয়েছে, ২০১৭ সালে দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিতে কর্মী ছিল প্রায় ২ লক্ষ ৬৯ হাজার জন। গত ১ জানুয়ারি সংখ্যাটি ২ লক্ষ ৪৮ হাজারে নেমে এসেছে। অর্থাৎ সাতবছরে কর্মীসংখ্যা কমেছে ২০ হাজারের বেশি। ২০১৭ সালে চতুর্থ শ্রেণির কর্মী সংখ্যা ছিল ১ লক্ষ ১৯ হাজার মতো। সেটা এখন মাত্র ৮৯ হাজারের আশপাশ! অর্থাৎ এখানে কর্মী কমেছে হাজার তিরিশেক। ২০০৭ সালের তুলনায় লক্ষাধিক কর্মী কমিয়েছে দেশের ব্যাঙ্কিং সেক্টর। গ্রাহক পরিষেবার শক্তি যে ব্যাঙ্ককর্মীরা তাঁরাই ক্রমে ব্রাত্য হয়ে উঠছেন। তার দরুন সরাসরি ভোগান্তি বাড়ছে গ্রাহকদের—কারণ পরিষেবা ক্রমে শিকেয় ওঠার অবস্থা। গ্রাহকদের ক্ষোভের লক্ষ্য হয়ে উঠছেন গুটিকয়েক ব্যাঙ্ককর্মী। কর্মীসংখ্যার প্রশ্নে অবশ্য বেসরকারি ব্যাঙ্কগুলির ছবিটা তুলনায় ভালো—কর্মীপিছু গ্রাহকের গড় ৩০০ জন। কেন্দ্রীয় তথ্য অনুসারে, স্টেট ব্যাঙ্কে ২,১২০ জন গ্রাহক পিছু কর্মী বরাদ্দ মাত্র একজন! ইউনিয়ন ব্যাঙ্কের পরিস্থিতি তো আরও ভয়াবহ—২,৭৭৮ জন গ্রাহকের দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে এক একজন কর্মীকে! সরকারি আর্থিক প্রকল্পগুলির চাপ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিতেই সর্বাধিক।
দুর্বল পরিষেবার কারণে বাংলাসহ দেশের নানা প্রান্তে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের শাখাগুলিতেই গ্রাহকের হাতে কর্মী নিগ্রহের অবাঞ্ছিত ঘটনাগুলি ঘটে চলেছে। অল ইন্ডিয়া ব্যাঙ্ক এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের সর্বভারতীয় সভাপতি রাজেন নাগর ক্ষোভের সঙ্গে জানান, সমস্যাটি সরকারের গোচের বারবার এনেও সুরাহা মেলেনি। তাঁদের সাফ কথা, প্রয়োজনীয় সংখ্যায় কর্মী নিয়োগ ছাড়া ক্রমবর্ধমান গ্রাহক পরিষেবার দায় সামলানো অসম্ভব। কেন্দ্রীয় সরকারের টনক নড়াতে সংগঠন এমাসে দু’দিনের ব্যাঙ্ক ধর্মঘট ঘোষণা করতেও বাধ্য হয়েছে। এই নীতিতে ব্যাঙ্কিং সেক্টরে শুধু চাকরিই কমছে না, লেনদেনে আর্থিক স্বচ্ছতার নীতিও জলাঞ্জলি যাচ্ছে। ‘সব কা বিকাশ’ এবং বৈষম্য হ্রাসের প্রত্যাশাকে গলা টিপে ধরতে সর্বক্ষণ উদ্যত যে কালো টাকার সমান্তরাল অর্থনীতি, এতে শক্তিবৃদ্ধি হচ্ছে তারই। আগামী দিনে মানুষ আরও বেশি করে চিটফান্ড এবং শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের নামে প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়ে সর্বস্বান্ত হবে।
দুর্বল পরিষেবার কারণে বাংলাসহ দেশের নানা প্রান্তে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের শাখাগুলিতেই গ্রাহকের হাতে কর্মী নিগ্রহের অবাঞ্ছিত ঘটনাগুলি ঘটে চলেছে। অল ইন্ডিয়া ব্যাঙ্ক এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের সর্বভারতীয় সভাপতি রাজেন নাগর ক্ষোভের সঙ্গে জানান, সমস্যাটি সরকারের গোচের বারবার এনেও সুরাহা মেলেনি। তাঁদের সাফ কথা, প্রয়োজনীয় সংখ্যায় কর্মী নিয়োগ ছাড়া ক্রমবর্ধমান গ্রাহক পরিষেবার দায় সামলানো অসম্ভব। কেন্দ্রীয় সরকারের টনক নড়াতে সংগঠন এমাসে দু’দিনের ব্যাঙ্ক ধর্মঘট ঘোষণা করতেও বাধ্য হয়েছে। এই নীতিতে ব্যাঙ্কিং সেক্টরে শুধু চাকরিই কমছে না, লেনদেনে আর্থিক স্বচ্ছতার নীতিও জলাঞ্জলি যাচ্ছে। ‘সব কা বিকাশ’ এবং বৈষম্য হ্রাসের প্রত্যাশাকে গলা টিপে ধরতে সর্বক্ষণ উদ্যত যে কালো টাকার সমান্তরাল অর্থনীতি, এতে শক্তিবৃদ্ধি হচ্ছে তারই। আগামী দিনে মানুষ আরও বেশি করে চিটফান্ড এবং শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের নামে প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়ে সর্বস্বান্ত হবে।


