শ্রীশ্রীঠাকুর নিজের সম্পর্কে প্রায়ই বলতেন—“(১) রাজার ছদ্মবেশে নগর পরিভ্রমণ, (২) অচেনা গাছ, (৩) মুদির দোকান, (৪) রঙের গামলা, (৫) এর সম্বন্ধে (নিজের শরীরকে দেখিয়ে) খুব জানাজানি হলে তখন এই শরীর থাকবে না, (৬) অবতার দশ ছাড়া যুগ প্রয়োজনে অনেক হতে পারে, (৭) যখন দেখবে আমি যার তার হাতে খাচ্ছি, কলকাতায় রাত্রিবাস করছি, অগ্রভাগ আগে কেউ গ্রহণ করলেও সেটা আমি গ্রহণ করছি, তাহলে জানবে এই শরীর আর বেশিদিন থাকবে না। ঠাকুর শ্রীশ্রীমাকে বলেছিলেন, ‘আমি যাবার আগে হাটে হাঁড়ি ভেঙ্গে যাব।’ শ্রীশ্রীঠাকুরের কলকাতার শ্যামপুকুরে চিকিৎসার্থে অবস্থানের পিছনে মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্বামী সারদানন্দজী তাঁর ‘লীলাপ্রসঙ্গ’ গ্রন্থে লিখেছেন—“শ্রীরামকৃষ্ণ ভক্ত সঙ্ঘরূপ মহীরূহ দক্ষিণেশ্বরে অঙ্কুরিত হয়েছিল বলে নির্দিষ্ট হলেও শ্যামপুকুরে ও কাশীপুর উদ্যানে তা নিজ আকার ধারণ-পূর্বক এত দ্রুত বর্ধিত হয়ে উঠেছিল যে, ভক্তগণের অনেকে তখন স্থির করেছিলেন, ঐ বিষয়ের সাফল্য আনয়নই ঠাকুরের শারীরিক ব্যাধির অন্যতম কারণ।”
শ্রীশ্রীঠাকুরের ‘রঙের গামলা’য় মাহাত্ম্য ভক্তগণ দক্ষিণেশ্বরে ও অন্যান্য স্থানে কখনও কখনও সামান্য অনুভব করলেও শ্যামপুকুরে সে মাহাত্ম্য যেন স্থূলরূপ ধারণ করে শ্রীশ্রীঠাকুরের শরীরকে আশ্রয় করে এখন শত সহস্র ধারায় বাইরে প্রকাশ পেয়ে সমস্ত শ্রীরামকৃষ্ণ ভক্তগণের হৃদয় আনন্দ সাগরে নিমগ্ন করেছিল। এই আনন্দের উদ্দাম উল্লাসে ভক্তগণ তাঁদের স্বাভাবিক বিচার বুদ্ধির অনেক ওপরে উঠে তাঁরা দিব্যচক্ষে দর্শন করতে লাগলেন যে, এতদিন পর্যন্ত তাঁরা যাঁকে (শ্রীশ্রীঠাকুরকে) জীবনের পরম আশ্রয় বলে গ্রহণ করেছিলেন, তিনি কেবলমাত্র অতিমানব নন; কিন্তু আধ্যাত্মিক জগতেরও আশ্রয়, সমগ্র জীবকুলের পরমগতি—দেবমানব, সাক্ষাৎ নারায়ণ। তাঁরা এই শ্যামপুকুরেই উপলব্ধি করেছিলেন যে, ঠাকুরের কর্ম, তপস্যা, আহার-বিহার—এমনকি দেহের অসুখের রোগ যন্ত্রণার ভোগ পর্যন্ত সবই বিশ্বমানবের কল্যাণের নিমিত্ত। তাঁরা আরো অনুভব করলেন যে, পরম করুণাময় ঠাকুর তাঁদেরকে সেবাধিকার প্রদানপূর্বক তাঁদের ধন্য ও কৃতার্থ করবেন বলেই তিনি এখন শ্যামপুকুরে রোগগ্রস্তের ন্যায় অবস্থান করছেন। অনেক ভক্তদের দক্ষিণেশ্বর পর্যন্ত গিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণকে দর্শন ও সেবা করার অবসর ও সুযোগ নেই বলে, পরম দয়াল ঠাকুর তাঁদের প্রাণে দিব্য জীবনের উন্মেষ করার জন্যই তিনি এখন অসুখের অছিলায় শ্যামপুকুরে অবস্থান করছেন।
এই রঙের গামলার শ্যামপুকুরের ঘটনাগুলি বিস্তারিত বর্ণনার আগে আমরা কয়েকটি ঘটনা ও কয়েকজন ব্যক্তি যাঁরা শ্যামপুকুরের লীলার সঙ্গে জড়িত তাঁদের কথা উল্লেখ করব: শ্রীশ্রীঠাকুর শ্যামপুকুরে সশরীরে থেকে সুরেন মিত্রের বাড়িতে সূক্ষ্ম জ্যোতির্ময় শরীরে উপস্থিত হওয়া প্রভৃতি।
স্বামী সৎপ্রভানন্দের ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ও রঙের গামলা’ থেকে